শহীদ পরিবারের দাবি : শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হোক

| December 18, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় দেশের বুদ্ধিজীবীদের। এই বুদ্ধিজীবীরা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি সত্য, তবে প্রত্যেকেই পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে গেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পরও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি শহীদ বুদ্ধিজীবীরা। তাদের পরিবারগুলো বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে। তাদের দাবি বরাবরই উপেতি। প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবসে তাদের আত্মত্যাগের বীরত্বগাথা উচ্চারিত হলেও আজো পূরণ হয়নি শহীদ পরিবারগুলোর দাবি। কী কারণে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা এ স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত সেটাও বোধগম্য নয় তাদের সুযোগ্য উত্তরসূরিদের কাছে। শহীদের মর্যাদায় তাদের আজও গেজেটভুক্ত করা হয়নি। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসটি মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হলেও তাদের পরিবারগুলো আজও চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের উত্তরসূরিরা আজ চরম ুব্ধ, লজ্জিত ও বেদনাহত। তাদের মর্যাদা দূরের কথা, উল্টো তাদের সুযোগ্য সন্তানদের প্রমাণ দিতে হচ্ছে সত্যিই তাদের পিতা শহীদ হয়েছিলেন কি না।
শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক রাশেদুল হাসানের কন্যা বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতজ্ঞ রোকেয়া নাসরীন মিলির মুখের ভাষায়, কী বলব? মাঝে মাঝে এমন সব অবিশ্বাস্য ও বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, যা খুবই লজ্জাকর; ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়। এখন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে মুখোমুখি হতে হয় অবান্তর প্রশ্নের। সম্প্রতি আব্বার শহীদ সংক্রান্ত কিছু তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে জানতে চাইলে এক কর্তার প্রশ্ন, ‘আপনার পিতা যে শহীদ হয়েছেন, তার ডেথ সার্টিফিকেট কোথায়?’ এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমি কোথায় পাব ডেথ সার্টিফিকেট? কোনো গেজেটে তা লেখা নেই। শুধু ১৪ ডিসেম্বর এলে জাতি তাদের বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করে। এছাড়া তো আর কোনো স্বীকৃতি নেই। সেজন্যই তো স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর মন্ত্রণালয়ের কেরানির কাছে শুনতে হয় ডেথ সার্টিফিকেটের কথা। তখন মনে হয় আমরা কোন জগতে বাস করছি। এটাই কি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পরিবারের প্রাপ্য?
এ ােভ শুধু মিলির নয়, শহীদ অন্যান্য বুদ্ধিজীবীর পরিবারের অবস্থা আরও করুণ। মিলির ভাষায়, ‘আব্বা শহীদ হওয়ার পর মায়ের আদর্শ আর প্রচেষ্টায় আমি লেখাপড়া শিখে একটা অবস্থায় পৌঁছতে পেরেছি। কারোর দয়ায় নয়, নিজের যোগ্যতায় সম্মানজনক অবস্থায় আছি। কিন্তু চেয়ে দেখুন শহীদ মর্তুজা আর শহীদ আনোয়ার পাশার পরিবার কতটা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আনোয়ার পাশা হলের টয়লেটের কাছে ছোট্ট দুটো রুমে কিভাবে ন্যক্কারজনক অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। আনোয়ার চাচা শহীদ হওয়ার পর উনার বড় ছেলে মাজহারুল আফতাব সেই যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন, আজও তিনি সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারেননি। অপর ছেলে রবিউল আফতাব বিমানের প্রকৌশলী। চাচি অসুস্থ। এই কি ছিল তাদের প্রাপ্য? তাদের অবদান কি একজন মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে কোনো অংশে কম? বিজয়ের ঊষালগ্নে পাকসেনারা তাদের ঘরে ঢুকে নাম ডেকে ডেকে চিহ্নিত করেছে। কারণ ঘাতকরা তাদের চিনত না। তাদের নাম জিজ্ঞাসা করতেই তারা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিতেই ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। তারা যদি শুধু নামটা অস্বীকার করার মতো মিথ্যার আশ্রয়ও নিতেন তাহলেও তো বেঁচে যেতেন। কিন্তু তারা এতটুকু অনৈতিকতার আশ্রয়ও নেননি।
শহীদ বুদ্ধিজীবীর পরিবারগুলোর প থেকে স্বাধীনতার পর থেকেই দাবি করা হচ্ছে তাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার। কিন্তু সে দাবি বরাবরই উপেতি। অথচ এ পর্যন্ত অনেক বেতারকর্মী, ভাষাসৈনিক ও খেলোয়াড়সহ অন্য পেশাজীবীকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। শুধু বাকি শহীদ বুদ্ধিজীবীরা। একই প্রশ্ন রেখেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক, রাইফেল রুটি আওরাত উপন্যাসের লেখক ও শিাবিদ আনোয়ার পাশার ছেলে রবিউল আফতাব। তার প্রশ্ন ‘যদি ঘরে বসে পাক সেনার নির্যাতনের শিকার মা বোনরা বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পেতে পারেন, যদি অন্য পেশাজীবীদের বিশেষ ভূমিকার জন্য মুক্তিযোদ্ধার গেজেটভুক্ত করা হতে পারে, তবে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা কেন একই মর্যাদা পাবেন না। কেন তাদের মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রকৌশল পদে কর্মরত রবিউল আফতাব ােভ আর হতাশার সুরে বলেছেন, ‘আমাদের দিন তো চলেই গেছে। গত চার দশক কিভাবে কেটেছে, আমাদের পরিবারের সেটা আর নতুন করে কাউকে জানানোর মানসিকতা নেই। কি পেয়েছি কি পাইনি সে আফসোস নেই। শুধু একটাই দুঃখ কেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হবে না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কী নিয়ে বাঁচবে? তারা কি অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার উত্তরসূরিদের মতো সুযোগ-সুবিধা পাবে? যদি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হতো, তাহলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তারা সেই অধিকার ভোগ করতে পাারত।

Category: কলাম

About admin: View author profile.

Comments are closed.