ফিচার

শিশুকে দেশাত্মবোধ শেখাবেন যেভাবে

স্বদেশ খবর ডেস্ক : কখনই কোনো পিতা-মাতা চায় না তাদের সন্তান বিপথগামী হোক। তবুও কখন যেন নিজের সন্তান হঠাৎ করে পথের বাইরে চলে যায়। এর সমাধান কী? বিখ্যাত আমেরিকান লেখক চাক পালাহনিউকের মতে, ‘তরুণ প্রজন্মকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রধান অস্ত্র হলো নিজের সংস্কৃতিকে ব্যবহার করা।’ সত্যিই তো! বর্তমান প্রজন্মের ক’জনকে আমরা আমাদের শাশ্বত, মৌলিক সংস্কৃতির স্বাদ দিতে পেরেছি? কয়জন নিজের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে জানে? বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের সংমিশ্রণের মাঝে যে শান্তি তার অনুভূতি কজন পেয়েছে? আফসোসের ব্যাপার হলো, এই সাংস্কৃতিক শিা দেয়ার প্রয়োজন অনেক পরিবার মনেই করে না।
একটি দেশের মূল পরিচয় পাওয়া যায় তার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে। তাই একটি শিশুকে যথাযথ মানুষ করে তোলার জন্য প্রথমে প্রয়োজন তাকে সাংস্কৃতিক শিায় শিতি করা। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সময়ে তাকে তার শিকড়ের সন্ধান দিন, নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে শেখান। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়ে অংশ নিন পহেলা বৈশাখ, ঈদ, পূজা-পার্বণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ইত্যাদিতে। তাকে নিয়ে দেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলো বেড়িয়ে আসুন। একই আকাশের নিচে একই ভূখ-ে হাজারো মত-ধর্ম-বর্ণের মানুষ কিভাবে ভালোবাসা দিয়ে সুখে শান্তিতে থাকতে পারে, সেই উদাহরণ দেখান। যে স্বাধীন দেশের নাগরিক আমরা, সেই দেশ যতটুকু মুসলমানের, ঠিক ততটুকুই হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধের। তারাও সমান ভালোবেসে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে, এখনো আগলে ধরে আছে দেশের স্বাধীনতা। সম্ভব হলে যেকোনো ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে সন্তানদের সম্পৃক্ত করুন। তাতে দেশ ও মানবতার প্রতি ঘৃণার বদলে ভালোবাসা জন্ম নেবে। দেশের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি এতটুকু ভালোবাসা দিয়ে যদি আমরা আমাদের শিশুদের হৃদয় ভরে দিতে পারি; তবে সেই শিশুদের বড় হয়ে বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা শূন্য। বলা হয়ে থাকে, শিশুরা কাদার মতো; যেমন ইচ্ছে গড়ে নেয়া যায়। সেই গড়ার কারিগর যদি আমরা হই, তবে ভবিষ্যৎ বিপথগামী প্রজন্মের দায়ভার কিন্তু আমাদের ওপরেই বর্তাবে। সময় থাকতে তাই শিশুর মানস-অন্দরমহল ভরে তুলুন সাংস্কৃতিক শিায়।
আজকের শিশুই আগামী দিনের কর্ণধার। দেশ গড়ার মতো মহান দায়িত্বও থাকবে তাদের হাতেই। এ জন্য শৈশব থেকেই শিশুকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে হবে। প্রতিদিন স্বাভাবিক জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই শিশুকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। শেখাতে পারেন দেশের ইতিহাস, আমাদের বীর সৈনিকদের কথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, মুক্তিযুুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসহ ঐতিহাসিক স্থান সম্পর্কে তাদের জানাতে পারেন। ছোটবেলা থেকে শিশুর মনে দেশপ্রেম জাগ্রত হলে ভবিষ্যতে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিবেদিত হতে সম হবে। আপনার শিশুকে নিয়ে ঘুরে আসুন স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। শুধু ঘুরে দেখা নয়, শিশুদের শেখান এসব স্থাপনার নির্মাণের ইতিহাস। স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তুলুন এসব জায়গা ঘুরে দেখার মাধ্যমে। পোশাকের মাধ্যমে ধারণ করুন দেশপ্রেমের এক অসাধারণ সুর। পোশাকের এই সুর ভাবতে শেখাবে স্বাধীনতা সম্পর্কে। একেকটি উৎসব একেকটি বার্তা বহন করে। আর পোশাক আমাদের সত্তাকে তুলে নিয়ে আসে প্রবলভাবে। তাই শিশুকে এবং আপনি নিজেও দেশীয় পোশাক পরুন।
শিশুরা বরাবরই বিনোদনপ্রিয়। দেশের সাথে, বর্ণমালার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার পদ্ধতি হয় যদি বিনোদনের মাধ্যমে, তাহলে শিা ও বিনোদন দুটোই হয়ে যায় একসাথে। সহজেই আমরা শিশুদের আমাদের কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সাথে পরিচিত করাতে পারি বিষয়গুলো তাদের সামনে গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করার মধ্য দিয়ে। পরবর্তী প্রজন্মকে দেশাত্মবোধ শেখানো খুবই প্রয়োজন। কারণ তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে দেশ ও জাতি। তাই তাদের জন্য সঠিক শিার ব্যবস্থা করাটা বড়দের দায়িত্ব।
আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে আমরা সন্তানদের ইংরেজিতে পারদর্শী করে তোলার ব্যাপারে যতটা গুরুত্ব দেই বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে শেখার ব্যাপারে ততটা গুরুত্ব দেই না। ফলে একদিকে যেমন তারা ইংরেজিতে তেমনভাবে দ হচ্ছে না, অন্য দিকে বাংলায়ও হয়ে পড়ছে দুর্বল। অনেক শিশু জাতীয় সঙ্গীতও সম্পূর্ণ শুদ্ধভাবে গাইতে জানে না। কিন্তু এসব েেত্র অভিভাবকদেরই সচেতন হতে হবে। তাদের শেখানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সিডি বা ভিডিওর মাধ্যমে শিশুকে শিখতে আগ্রহী করে তুলতে পারেন। বিনোদনের মধ্য শেখানোর সুযোগ করে দিলে শিশুরা সহজেই শিখতে পারবে।
একই সাথে শিশুদের আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সাথেও পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। পরিবারের সব সদস্যের এ কাজে সাহায্য করা প্রয়োজন। বাংলা গান, কবিতা, ছড়া, নাচ সব কিছুর প্রতি শিশুদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে শিকড়ের সাথে। নিজের দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে শিশুদের সম্পৃক্ত করুন শিশুকাল থেকেই। তাদের জানান আমাদের গৌরবময় ইতিহাস ও সংস্কৃতির কথা। মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। সেই সাথে নিজেদের জীবনযাত্রায়ও আনার চেষ্টা করুন আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। তবেই শিশু ছোটবেলা থেকেই নিজের দেশ ও ভাষাকে ভালোবাসতে শিখবে। শিশুর মধ্যে জেগে উঠবে দেশাত্মবোধ।