স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন : দুুই বছরে শেষ হলো পদ্মাসেতুর ৫২ ভাগ নির্মাণ কাজ

| December 18, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন হতে শুরু করেছে। কাক্সিক্ষত পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। নির্মাণ শুরুর পর গত ২ বছরে স্বপ্নের পদ্মাসেতুর কাজ শেষ হয়েছে ৫২ ভাগ। এ সময়ে অনেক কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তারপরও সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী বছরের মধ্যে মূল সেতুর শতভাগ নির্মাণ কাজ শেষ হবে। এরপর আনুষঙ্গিক কাজের জন্য প্রয়োজন হবে আরও কয়েক মাস। তারপরই খুলে দেয়ার জন্য প্রস্তুত হবে দণি-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বহু প্রতীার পদ্মাসেতু।
বিশ্বব্যাংক বা অন্য কোনো উন্নয়ন সহযোগীর সহায়তা ছাড়া দেশীয় অর্থেই রূপ পাচ্ছে পদ্মাসেতু। দুই বছর আগে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকল্পের মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বৈদেশিক সহায়তার বৃত্ত থেকে বের হয়ে বহু কাক্সিত এমন বড় প্রকল্পের বাস্তব রূপ দেখে বিদেশিরাও বিস্মিত। তারা বলছেন, শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও সাহসিকতার ফলেই অবকাঠামো উন্নয়নের এমন সমতার প্রমাণ রাখতে পারছে বাংলাদেশ।
পদ্মা সেতু প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৪৯ শতাংশ। মূল সেতুর ৫২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিয়ারে (গুচ্ছ পিলার বা খুঁটি) প্রথম স্প্যানটি বসানো হয়েছিল জাজিরা প্রান্তে। বিদেশে থাকলেও ওই স্প্যান বসানোর দৃশ্য দেখে কেঁদেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের দ্বিতল কাঠামোর এ সেতুতে সব মিলিয়ে ৪১টি স্প্যান বসানো হবে। মূল সেতু ছাড়াও নদীশাসনের কাজ এগিয়ে চলছে। নদীশাসনের কাজ এগিয়েছে ৩৫ শতাংশ। মূল সেতু নির্মাণ করছে চীনের চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র“প অব কোম্পানি। প্রকল্পে নদীশাসনের কাজ করছে চীনের সিনোহাইড্রো কোম্পানি।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, জাজিরা প্রান্তে ১২ দশমিক ১১ কিলোমিটার ও মাওয়া প্রান্তে ১ দশমিক ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়কের কাজ শতভাগ শেষ হয়ে গেছে। জাজিরায় ভায়াডাক্টের ৯৮ শতাংশ পাইলিং শেষ হয়েছে। মাওয়া প্রান্তে শেষ হয়েছে ভায়াডাক্টের ১১ শতাংশ পাইলিং। প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
প্রকল্প সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য বলছে, প্রকল্পের ৪২টি পিয়ারের মধ্যে দুটির কাজ শেষ হয়েছে। ছয়টি পিয়ারের পাইলিং শেষ হয়েছে। চারটির পাইলিং শেষ হওয়ার পথে। ৪২টির মধ্যে ১৪টি পাইলের নকশা সংশোধন করতে হবে।
জানা গেছে, চীনের নির্দিষ্ট কারখানায় বর্তমানে ১৫টি স্প্যান তৈরি করা হচ্ছে। চীনে তৈরি স্প্যানের অংশগুলো জাহাজে করে মাওয়ার কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে আনা হচ্ছে। সেখানে খুঁটির ওপর বসানোর জন্য স্প্যান জোড়া দেয়া হচ্ছে। ৩৮, ৩৯ ও ৪০ নম্বর খুঁটির মধ্যে দুটি স্প্যান বসানোর প্রস্তুতি চলছে। দুটি স্প্যানই রঙ করা হয়েছে মাওয়ার ইয়ার্ডে। ৩৯ ও ৪০ নম্বর খুঁটিতে ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।
পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম স্বদেশ খবরকে জানান, প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৪৯ শতাংশ, মূল সেতু এগিয়েছে ৫২ শতাংশ, নদীশাসন ৩৫ শতাংশ। তিনি আরও জানান, চলতি ডিসেম্বরেই পদ্মা সেতুতে দ্বিতীয় স্প্যান বসবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দ্বিতীয় স্প্যানটি ৩৮ ও ৩৯ নম্বর পিয়ারের ওপর বসাতে বর্তমানে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সেইসঙ্গে সেতুর তৃতীয় স্প্যান নির্মাণের কাজও শেষ হয়েছে। তৃতীয় স্প্যানটি স্থাপনের জন্য দুই প্রান্তে ‘গ্যারোটিং’-এর কাজ চলছে। সামনের জানুয়ারি মাসে এটি ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিয়ারের ওপর বসানো হবে। পদ্মাসেতুর দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা স্বদেশ খবরকে জানান, প্রতিটি স্প্যান বসানোর আগে বিশেষজ্ঞ প্যানেল সবকিছু নিখুঁতভাবে যাচাই করছে, যাতে ন্যূনতম ত্র“টিও না থাকে।
মূল সেতু নির্মাণের পাশাপাশি নদীর দুই তীরে বাঁধ দিতে নদীশাসনের কাজও চলছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত নদীশাসনের কাজ শেষ হয়েছে ৩৫ ভাগ। এর আগে ২০১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ হয়েছিল ২৬ ভাগ। সূত্রমতে, মূল সেতুর কাজের চেয়ে নদীশাসনের কাজ কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে। নির্মাণকাজ শুরুর প্রথম বছরেই ৩৫ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সে ল্েয পৌঁছাতে লেগেছে দুই বছর। আর গত এক বছরে কাজ হয়েছে মাত্র ৯ ভাগ। ৮ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ১২ কিলোমিটার নদীশাসনের কাজ করছে চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো।
২০১৮ সালের নভেম্বরের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ পুরোপুরি শেষ করার ল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সেতু হলে দেশের দণি-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ ঢাকা থেকে সরাসরি সড়কপথে চলাচল করতে পারবে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন গত মহাজোট সরকারের আমলে ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল এই সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি হয়েছিল। কিন্তু ঋণের অর্থ ছাড় করার আগেই দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক বেঁকে বসে। তখন এই প্রকল্প আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না তা নিয়ে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল।
ওই সময়ে বড় অবকাঠামো বাস্তবায়নে এবং দেশের স্বার্থে নিজস্ব অর্থায়নই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য; আর তা অসম্ভবও নয় বলে মত দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সব দিক বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংসদে ও জনসভায় তিনি ঘোষণা দেন, ‘বিশ্বব্যাংকে ধরনা আর নয়, নিজেদের টাকায় হবে পদ্মা সেতু।’ এক পর্যায়ে সরকারই বিশ্বব্যাংককে না করে দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে নেমে পড়ে।
২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে পদ্মাসেতুর কাজে গতি আসে। যদিও এর আগে বিশ্বব্যাংকের নানা প্রক্রিয়া ও পরে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়। অবশ্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে ও সর্বশেষ কানাডার আদালতে বিশ্বব্যাংকের তোলা অভিযোগের ভিত্তি মেলেনি।
২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের নদীশাসন কাজের উদ্বোধন করেন। সেখান থেকে স্পিডবোটে করে তিনি মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পৌঁছে মূল সেতুর কাজের ফলক উন্মোচন করেন। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল।

Category: প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.