৮১ মিলিয়ন ডলার রিজার্ভ চুরির বিষয়ে দায় এড়াতে চাইছে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক

| December 18, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) যে অভিযোগ করেছে, সেটি নাকচ করে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, রিজাল ব্যাংককে বলির পাঁঠা বানানোর কোনো চেষ্টা হচ্ছে না, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার কোনো যোগ্যতা নেই। ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
এর আগে ৯ ডিসেম্বর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত রাজধানীতে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলার পরিকল্পনা নিয়েছে। পৃথিবী থেকে রিজাল ব্যাংকটাকেই বিদায় করতে হবে। তবে এর পেছনে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
অর্থমন্ত্রীর এ মন্তব্যের পর আরসিবিসি জানায়, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় নিজেদের গাফিলতির দায় এড়াতে তথ্য গোপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক আরসিবিসিকে বলির পাঁঠা বানাতে চাচ্ছে। ব্যাংকটি এও অভিযোগ করে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকই দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকটির এ ধরনের অভিযোগের খবর দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। ওই প্রতিবেদনে আরসিবিসির হেড অব লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স জর্জ ডেলা কুয়েস্তার বরাতে বলা হয়, আইনত যেসব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব, তার সবই ফিলিপাইনের সিনেট এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দিয়েছে আরসিবিসি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সম্ভব সব কিছুই লুকিয়েছে।
ব্যাংক খাতে হ্যাকিংয়ের সবচেয়ে বড় এই ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার যে তদন্ত করেছিল, তার প্রতিবেদন দেখতে চেয়েছিল ফিলিপাইন সরকার। কিন্তু অর্থমন্ত্রী মুহিত তখন বলেছিলেন, ফিলিপাইন চাইলেও ওই প্রতিবেদন তাদের দেয়া হবে না। আরসিবিসি আগেও বলেছিল, এ ঘটনায় তাদের কোনো দায় নেই, বাংলাদেশ ব্যাংকই দায়ী। সর্বশেষ বিবৃতিতেও তারা একই সুরে কথা বলেছে। ওই ঘটনায় অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের দায় আছে। স্বচ্ছতার বিষয়ে তাদের যে আপত্তি, তথ্য চেপে রাখার যে চেষ্টা, তা সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে লড়াইকে তিগ্রস্ত করছে। আরসিবিসি বাংলাদেশ ব্যাংকের গাফিলতির শিকার।
২০১৬ সালের ফেব্র“য়ারির শুরুতে সুইফট মেসেজিং সিস্টেমের মাধ্যমে ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রতি বাংলাদেশের ১ বিলিয়ন ডলার সরিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়। এর মধ্যে ৫টি মেসেজে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার যায় ফিলিপাইনের আরসিবিসিতে। আর আরেক আদেশে শ্রীলংকায় পাঠানো হয় ২০ লাখ ডলার। শ্রীলংকায় পাঠানো অর্থ ওই অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া শেষ পর্যন্ত আটকানো গেলেও ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকে যাওয়া অর্থের বেশিরভাগটাই স্থানীয় মুদ্রায় বদল হয়ে জুয়ার টেবিল ঘুরে চলে যায় নাগালের বাইরে। ওই টাকার মধ্যে এক ক্যাসিনো মালিকের ফেরত দেয়া দেড় কোটি ডলার বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দিয়েছে ফিলিপাইন। এ ঘটনায় রিজাল ব্যাংককে ২০ কোটি ডলার জরিমানাও করেছে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জরিমানার অর্থ পরিশোধ করলেও বাংলাদেশকে বাকি অর্থ ফেরতে কোনো দায় নিতে রাজি নয় ব্যাংকটি। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা নভেম্বর মাসে এক কনফারেন্স কলে রিজাল ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার পরিকল্পনা নিয়ে নিউইয়র্ক ফেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন, যেখানে ব্যাংকিং লেনদেনের আন্তর্জাতিক মেসেজিং নেটওয়ার্ক সুইফটের দুজন প্রতিনিধিও ছিলেন। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধারের জন্য আগামী মার্চ-এপ্রিল নাগাদ নিউইয়র্কে একটি দেওয়ানি মামলা করার প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়েছে। বাংলাদেশ আশা করছে, ফেডারেল রিজার্ভ ও সুইফট কর্তৃপও সেখানে বাদি হবে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত রিজার্ভ চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরসিবিসিকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে চান বলে জানানোর পর ফিলিপাইনের ব্যাংকটি অভিযোগ করেছে ঢাকার আর্থিক কর্তৃপ তাদের গাফিলতি আড়ালের চেষ্টা করছে।
১২ ডিসেম্বর আরসিবিসির আইন বিষয়ক প্রধান জর্জ ডেলা কুয়েস্তা এক বিবৃতিতে বলেন, ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সিনেটের কাছে আইনি সব বিষয় তুলে ধরেছে আরসিবিসি। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অনেক কিছুই চেপে গেছে। এই চুরির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের লোকজনই জড়িত রয়েছে। রিজার্ভ চুরিতে দুর্বলতা ঢাকতে রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ওপর দোষ চাপাচ্ছে বাংলাদেশ।
কুয়েস্তা বলেন, এই চুরির সঙ্গে যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব লোকই জড়িত সেহেতু আমরা কেন সেই টাকা পরিশোধ করবো? তার ব্যাংক আরসিবিসিকে বলির পাঁঠা না বানাতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি।
এদিকে শুরু থেকেই আরসিবিসি স্বীকার করেছে তাদের কিছু অসৎ কর্মী এতে জড়িত। ফিলিপাইনের আইনজীবীরা এর মধ্যে সাবেক আরসিবিসি ব্যাংক ম্যানেজার ও ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে জড়িত ৪ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ এনে মামলা করেছে। কিন্তু তাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাদের অ্যাকাউন্টগুলো ভুয়া নামে ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত ওই ৪ ব্যক্তি বিশ্বের যেকোনো জায়গার হতে পারে।
গত বছরের ফেব্র“য়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য লুকিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে আরসিবিসি। ওই সময় নিউইয়র্ক ফেডারেল ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেয় অজ্ঞাত হ্যাকাররা। সুইফট পেমেন্ট সিস্টেমে ভুয়া নির্দেশ ব্যবহার করে তারা এই অর্থ চুরি করে। এই অর্থ ম্যানিলাভিত্তিক রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের পর ফিলিপাইনের ক্যাসিনোতে যায়। প্রায় দুই বছর পরও দায়ীদের চিহ্নিত করা যায়নি। ম্যানিলার এক ক্যাসিনো অপারেটরের কাছ থেকে বাংলাদেশ মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার উদ্ধার করেছে। এছাড়া, বাংলাদেশের টাকা চুরি হলেও এর পেছনে কোনো বাংলাদেশির জড়িত থাকার প্রমাণ না পাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন কোয়েস্তা। এ ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটার আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে এর পেছনে জড়িতদের খুঁজে বের করারও পরামর্শ দেন তিনি।

Category: অর্থনীতি

About admin: View author profile.

Comments are closed.