আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আরব লিগের আহ্বান : পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিন

স্বদেশ খবর ডেস্ক : পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে আরব লিগ। ৬ জানুয়ারি আরব লিগের ৬টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় জর্ডানের রাজধানী আম্মানে। বৈঠকে আরব লিগ এই ইস্যুতে জাতিসংঘে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জর্ডানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মিসর, মরক্কো, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পরপরই গত ৯ ডিসেম্বর জরুরি বৈঠকে বসেছিল আরব লিগ। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং তা বাতিল করার আহ্বান জানানো হয়। ৬ জানুয়ারির বৈঠকে আগের জরুরি বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো এগিয়ে নিতে আলোচনা হয়। আলোচনায় জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদি বলেন, ১৯৬৭ সালের প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানীর স্বীকৃতি দিতে আমরা প্রয়োজনে জাতিসংঘে যাবো এবং একটি প্রস্তাব পাসের উদ্যোগ নেবো। সাফাদি জানান, চলতি মাসের শেষের দিকে আরব লিগের মন্ত্রী পর্যায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ বৈঠক হবে।
জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন বিশ্ব নেতারা। এমনকি মার্কিন মিত্র অনেক দেশও এই ঘোষণায় সমর্থন দেয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ওআইসিসহ বিশ্বের বেশিরভাগ জোট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। গত ২১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস হয়। ১২৮টি দেশই তুরস্কের প্রস্তাবের পে সমর্থন দেয়। এর আগে নিরাপত্তা পরিষদেও ১৪টি সদস্য দেশ ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিপে মত দেয়। তবে স্থায়ী সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেয়ায় মিসরের প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি।
এর আগে মিসরের রাজধানী কায়রোতে আরব লিগের বৈঠকে সংস্থার ২২টি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানায় এই বলে যে, জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী করার যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে তা যেন প্রত্যাহার করা হয়। আরব লিগ নেতারা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ঘোষণা দিয়েছেন তা আন্তর্জাতিক আইনের ভয়াবহ লঙ্ঘন। এর কোনো আইনি তাৎপর্য নেই এবং এটি অকার্যকর। ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুজালেমকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী করতে চায়। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই জেরুজালেমের মর্যাদা নির্ধারিত হতে হবে, দীর্ঘদিন ধরে এটাই যুক্তরাষ্ট্রের অনুসৃত নীতি ছিল। অপরদিকে পুরো জেরুজালেমকেই নিজেদের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছিল ইসরাইল। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি বিসর্জন দিয়ে ইসরাইলের ওই দাবিকেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। মার্কিন সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করার জন্য আরব লিগ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব তোলার চেষ্টা করবে বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
আরব লিগের নেতারা পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানান। বৈঠকে লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিব্রান ব্যাসিল, ইসরাইলের তেলআবিব শহর থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বিবেচনার জন্য আরব দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
এর আগে পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সম্মত হয় মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম জোট অরগানাইজেশন অফ ইসলামিক কো-অপারেশন-ওআইসি। ওআইসির আগে পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম জোটের এই শীর্ষ সম্মেলনে সংস্থার বেশিরভাগ সদস্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদও এতে যোগ দিয়েছিলেন এবং পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সম্মেলনে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেন, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকবে না। তার দেশের মানুষ শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকুক তা চায় না। পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। মাহমুদ আব্বাস আরো বলেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে ইসরাইলকে তার সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বৈধতা দেয়া হবে। অর্থাৎ এতদিন ধরে দুর্নীতি, অবরোধ, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়া, সহিংসতা, হত্যাসহ যেসব অপরাধ তারা করেছে, তার সব কিছুর বৈধতা পেয়ে যাবে।
এদিকে ৫৭টি দেশের জোটের সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসোগলু। আরব লিগ মনে করে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত পুরো বিশ্বকে এমন এক সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঠেলে দেবে, যেখান থেকে উদ্ধারের কোনো উপায় থাকবে না।
জেরুজালেম প্রশ্নে সম্প্রতি ওআইসি’র জরুরি বৈঠকটি ডেকেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যেকোনো মুসলিম দেশকে জেরুজালেম ইস্যুতে আপস করা চলবে না। ইসরাইলিদের জেরুজালেম নিয়ে এমন কূটকৌশল ব্যর্থ করতে মুসলিম বিশ্বের আন্তরিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা এবং এ সংক্রান্ত সব ধরনের সিদ্ধান্তের কঠোর বিরোধিতা করতে হবে মুসলিম দেশগুলোকে। এছাড়া ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ন্যায্য আন্দোলনকে সফল করতে এবং দখলদার ইসরাইলকে শায়েস্তা করতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শক্তিশালী সামরিক জোট গড়ারও সিদ্ধান্ত হয় ওই বৈঠক থেকে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসেফ বিন আহমদ আল-ওসাইমিন। এসময় তিনি মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের সে ইস্যুতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ওআইসি আমেরিকার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করছে এবং তাদের এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানাচ্ছে। ওআইসি মহাসচিব বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পদপে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের উত্তেজনার দিকে উসকে দেয়া হয়েছে। এটা এ অঞ্চলে এবং বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করবে।
গত বছরের ৬ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করেন ট্রাম্প। এর এক সপ্তাহের মাথায় ওআইসির প থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয়া হয়।