অর্থনীতি

একীভূত হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক
ইদানীং ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর জনমনে আস্থাহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং নানা কারণে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে; যা সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ সংকট তৈরি করতে পারে। তাই ব্যাংকিং সেক্টরের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ করে জনমনে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এরই অংশ হিসেবে অব্যাহত লোকসানের প্রেেিত রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের চার ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ব্যাংকগুলো হলো বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), বেসিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এ চারটি ব্যাংক একীভূত করার লক্ষ্যে একটি সারসংপে প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রথমে এটি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে পাঠানো হবে। অর্থমন্ত্রী সম্মতি দিলে পরে তা অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের পর সিদ্ধান্ত কার্যকরের জন্য তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ বছরে এ চার ব্যাংকের পেছনে সরকার প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এর মধ্যে শুধু বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মেটাতে ৫ বছরে সরকারি কোষাগার থেকে দেয়া হয়েছে ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে বিকেবি আর রাকাবের পেছনে সরকার লোকসান দিয়েছে ৪১৮ কোটি টাকা। বিডিবিএল বর্তমানে লোকসানে নেই।
সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংক একীভূত করার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। তাই বাংলাদেশ ব্যাংককে বলা হয়েছে আগামী এক বছরের মধ্যে যেন একীভূতকরণ আইনের একটি কাঠামো দাঁড় করানো হয়। এরপরই সরকারি ব্যাংকের একীভূতকরণের কাজ শুরু করা হতে পারে। এ বিষয়ে অনেক ব্যাংকার বলছেন, সরকারি ব্যাংকের মালিক সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন ও নীতি অনুসারে একীভূত করায় আইনি কোনো বাধা নেই। তবে একীভূত হলেও এসব ব্যাংকের সমস্যা সমাধান হবে না।
তাদের মতে, ব্যাংকগুলোর সমস্যা নন-পারফরমিং লোন এবং ঋণ দিলে ঋণ আদায় হয় না। এজন্য সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো প্রাইভেট সেক্টরে ছেড়ে দিতে পারে। তাছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের েেত্র সরকার তথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতা ও তদারকি আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
অর্থ বিভাগের একটি সূত্র জানায়, গত ২৬ আগস্ট ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠনের বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের করা বৈঠকে ১১৩টি সুপারিশ এসেছে। এসব সুপারিশের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে একীভূতকরণ। সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে এক দফা বৈঠকও করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। শিগগিরই আবার পর্যালোচনা বৈঠক করে এসব সুপারিশ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জন্য সারসংপে চূড়ান্ত করবে। ইতোমধ্যে এর খসড়া অর্থমন্ত্রীকে দেখানো হয়েছে। তিনি সেখানে কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন আনার পরামর্শ দিয়েছেন। এটি চূড়ান্ত হলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সুপারিশের মধ্যে একটিতে বলা হয়েছে, সোনালী ব্যাংকের ১ হাজার ২১৩টি শাখা পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে না। সেখানে বিডিবিএলের ৪২টি এবং বেসিক ব্যাংকের ৬৮টি শাখার জন্য আলাদা এমডি, ডিএমডির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা ভেবে দেখা দরকার। তাছাড়া সোনালী ব্যাংকের মতো একটি বড় ব্যাংক থাকা সত্ত্বেও এসব ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব ব্যাংককে অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করলে একদিকে যেমন এদের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে সরকারের খরচও কমবে। শুধু তাই নয়, সরকার যে প্রতি বছর এসব ব্যাংকের পেছনে লোকসান দিচ্ছে তা-ও বন্ধ হবে। তবে ব্যাংকগুলো কোন প্রক্রিয়ায় একীভূত হবে, এসব প্রতিষ্ঠানের জনবল ও মূলধন কিভাবে একীভূত করা হবে সে বিষয়ে নীতিমালা প্রয়োজন। আর এসব নিয়ে দ্রুত কাজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।