আন্তর্জাতিক

কাশ্মির ইস্যুতে পাক-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
কাশ্মির সীমান্তে পাকিস্তান বাহিনীর গুলিতে এক কর্মকর্তাসহ ৩ ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ২ জন। ২৩ ডিসেম্বর রাজৌরি জেলার কেরি সেক্টরে এই হামলার ঘটনা ঘটে।
এক সেনা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা পিটিআই জানায়, কেরি সেক্টরের টোপা বারাত গালায় সীমান্তরেখা বরাবর ভারতীয় সেনা চৌকি ল্য করে গুলি চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এতে মেজর মহারকার প্রফুল্ল আম্বাদাস (৩২), ল্যান্স নায়েক গুরমায়েল সিং (৩৪) এবং সিপাহি পরজাত সিং (৩০) আহত হন। পরে তাদের তিনজনেরই মৃত্যু হয়। আহত দুইজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, নিহত সেনারা সকলেই ১২০ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের। সেনাসূত্র জানায়, ভারতীয় সেনারাও পাল্টা হামলা চালায়। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বছর সীমান্তে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২৪টিতে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৪৪৯।
কাশ্মিরের লাইন অব কন্ট্রোল বিশ্বের অন্যতম সুরতি সীমান্ত রেখা হিসেবে পরিচিত। কয়েক মাস শান্ত থাকার পর সম্প্রতি নতুন করে আবারো উত্তেজনার সূত্রপাতকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের পরাষ্ট্রনীতিতে আলোচনার ঝড় উঠেছে। দুই দেশের পরাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো দুই দেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ভারত-পাকিন্তান উভয়ই শক্তিশালী রাষ্ট্র। স্বাধীনতার পূর্বে হিন্দু প্রভাবাধীন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস পাকিস্তানিদের মনে যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছিল স্বাধীনতার পরও পাকিস্তানিদের মধ্যে সেটা বহাল রয়েছে। ভারতও পরবর্তীতে এই সন্দেহ বিদ্বেষ কখনো দূর করার চেষ্টা করেনি। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ককে আরো তিক্ত করে তুলেছে। ১৯৪৭ সালে যখন দেশ ভাগ হয় তখন মুসলমানরা ভারত ত্যাগ করে আর হিন্দু শিখরা পাকিস্তান ত্যাগ করে। এসময় ব্যাপক রক্তপাত এবং আর্থিক য়তি ঘটে। এছাড়াও অর্থ-সম্পদ ভাগ বাটোয়ারা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিরোধ দেখা যায়। তবে এই দুই দেশের সবচেয়ে জটিল ইস্যু হলো কাশ্মির সমস্যা। ১৯৪৭-১৯৪৮ সালের দিকে এই দুই দেশের মাঝে কাশ্মির নিয়ে উত্তেজনার সৃষ্টিতে জাতিসংঘ মধ্যস্থতা করে। এই মধ্যস্থতা ভারত মেনে না নিলে ১৯৬৫ সালে যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি বর্তমান রাশিয়া তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে সে যুদ্ধের নিষ্পত্তি ঘটাতে সম হলেও ১৯৭১ সালে আবার তারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এ সুযোগে তৎকালীন সোভিয়েত সমাজ আফগানদের ওপর হস্তপে করলে পাকিস্তান আফগানদের সহযোগিতা করে। আর এ সুযোগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সাথে একটি ভালো সম্পর্কের ভিত্তিতে ভারতকে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণে সহযোগিতা করে। পাকিস্তান একই সুযোগে চীনের সহযোগিতায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সম হয়। ১৯৭২ সালে পাক-ভারত সমস্যা সমাধান কল্পে সিমলা চুক্তি হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় যে ভারত পাকিস্তানের মাঝে বিদ্যমান সমস্যাগুলো তারা দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান করবে। কারগিল সীমান্ত নিয়েও দুই দেশের সম্পর্ক দিনে দিনে অবনতির দিকে চলে যায়। ২০০২ সালে কাশ্মির নিয়ে পাক-ভারতের অস্থিরতার সময় দুই দেশের মধ্যে হতাহতের ঘটনায় অনেক নিরীহ কাশ্মিরি নিহত হয়, যার পরিপ্রেেিত কাশ্মিরের জনগণ আজও এই দিনটিকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে। দুই দেশের এই অভ্যন্তরীণ সমস্যা সে সময় ব্রিটেনের হস্তেেপ সাময়িক সমাধান হলেও পরবর্তীতে সমস্যা আরো দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৩ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি চুক্তির মাধ্যমে অনেক দিন থেকে এই দুই দেশের মধ্য শান্তিপূর্ণ অবস্থান ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ২০১৭ সালের ৬ ও ৮ জানুয়ারিতে কাশ্মির সীমান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে দুই দেশের মধ্য আবারও নতুন সমস্যার সূত্রপাত হয়, যার রেশ বছরের শেষে এসেও দেখা গেল।
জম্বু এবং আজাদ কাশ্মির এই দুটির মাঝখানে অবস্থিত লাইন অব কন্ট্রোল। লাইন অব কন্ট্রোলের দুই পার্শ্বে কোটি কোটি মানুষ বসবাস করছে। এই কোটি প্রাণকে ুধা আর দারিদ্র্যের মধ্য রেখে দুই দেশের শাসকগোষ্ঠী একপ কাশ্মিরকে নিজেদের দখলে রেখে অন্যপ দখলের পাঁয়তারায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে গত ৭ দশক ধরে। পাক-ভারতের মধ্যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ এতই প্রবল যে, তারা পরস্পরকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য শখানেক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে রেখেছে। এক একটি অস্ত্র তৈরিতে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয়েছে, তা দিয়ে দুটি দেশের অসংখ্য দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের দুর্দশা দূর করা সম্ভব অতি সহজেই। বর্তমান বিশ্বে ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ছাড়া আর কোনো দেশ পাওয়া যাবে না, যারা ভারত-পাকিস্তানের মতো পরস্পরকে ঘৃণা করে। অথচ কাশ্মির সমস্যা না থাকলে এই দুটি দেশ হতো বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বন্ধুভাবাপন্ন, যারা যেকোনো সমস্যায় একে অপরকে সাহায্য করত। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় উপমহাদেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে বিশ্লেষকগণ কাশ্মির সংকটকে দায়ী করছেন।
বর্তমানে কাশ্মির প্রশ্নে ভারত বিভাজন রেখা মেনে নিতে রাজি হলেও কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী জনগণ আর পাকিস্তান রাজি নয়। পাকিস্তান রাজি না থাকলেও কোনো তি ছিল না যদি ভারত তাদের অধিকারী কাশ্মিরের গৃহযুদ্ধ বন্ধ করতে পারত। তবে যদি ভারতীয় কাশ্মিরের জনগণকে ভারত সরকার খুশি রাখতে পারত তাহলে কাশ্মির সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধানের সম্ভাবনা ছিল। কাশ্মিরকে যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে গৃহযুদ্ধের অবসান অসম্ভব। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণে সেটা করতেও অম। তবে কাশ্মির সমস্যা সমাধানের যতগুলো পথ রয়েছে তারমধ্যে পর্যাপ্ত স্বায়ত্তশাসনই ভারতীয় শাসকদের জন্য সহনীয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কাশ্মির সমস্যা সমাধান যে একবারেই অসম্ভব তা নয়। ত্রুটি হলো দুটি দেশের রাজনৈতিক অপরিপক্বতা। বর্তমানে পাকিস্তান আবার ফিরে গেছে সেনাশাসনের পর পূর্বের অবস্থায়। যদিও ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ বলা হয়, কিন্তু সে গণতন্ত্রও শুধু নির্বাচনের মাঝেই সীমাবদ্ধ, তার কার্যকারী কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। কাশ্মির ছাড়াও নানা বিচ্ছিন্নতাবাদী সমস্যায় জর্জরিত ভারতের পে তাই কাশ্মিরের ওপর বড় ছাড় দেয়া সম্ভব নয়। ভারত ও পাকিস্তান যতদিন এই ছাড় না দেবে, ততদিন কাশ্মির সমস্যা থেকেই যাবে।