প্রতিবেদন

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সচল ৩৭ মামলা : শঙ্কিত বিএনপির নেতাকর্মীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : বর্তমানে পুরান ঢাকার বকশীবাজারের অস্থায়ী এজলাসে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২টি মামলার শুনানি চলছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সপ্তাহে অন্তত ২ দিন তাকে এই আদালতে হাজিরা দিতে হয়। সম্প্রতি আরও ১৪টি মামলা শুনানির জন্য স্থানান্তর করা হয়েছে এই অস্থায়ী আদালতেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বকশীবাজারের অস্থায়ী আদালতে এই মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে কার্যত সপ্তাহজুড়েই মামলা ও বিচার সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। মামলা ও বিচার সংক্রান্ত কাজেই যদি খালেদা জিয়ার সবসময় ব্যয় হয় তাহলে বিএনপির রাজনীতির কী হবে, খালেদা জিয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কি না, খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি নাÑ এসব ভেবে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা।
আদালত সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি মামলা ঝুলছে। এর মধ্যে ওয়ান-ইলেভেনে সেনাশাসিত সরকারের সময়ে দায়ের করা হয়েছে ৪টি মামলা। বাকিগুলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের দুই মেয়াদে করা। যে ১৪টি মামলা স্থানান্তর করা হচ্ছে তার মধ্যে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতে ৯টি, বিশেষ জজ আদালতে ৩টি ও ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে এসব মিথ্যা মামলার কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনার মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে নির্বাচন ও রাজনীতিতে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করা এবং আদালতকেন্দ্রিক ব্যস্ততার জন্য খালেদা জিয়াকে আন্দোলন ও রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং বিচার কাজের সুবিধার্থেই একই আদালতে মামলাগুলো স্থানান্তর করা হয়েছে।’ অবশ্য অনেকেই বলছেন এর সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। আর এক্ষেত্রে আইনমন্ত্রী বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক কারণে নয় বরং উভয় পরে সিকিউরিটির ব্যাপারটি চিন্তা করেই এটা করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, ‘সরকার কী কারণে মামলাগুলো অস্থায়ী আদালতে স্থানান্তর করেছে সেটা এখনই বোঝা যাবে না। যদি দেখা যায় আগামী দুই-তিন সপ্তাহ খুব ঘন ঘন মামলার শুনানির তারিখ পড়ছে তাহলে বুঝতে হবে, বিএনপির দাবিই (খালেদা জিয়াকে আদালতে ব্যস্ত রেখে সরকার ফায়দা লুটতে চাচ্ছে) সঠিক। আর যদি স্বাভাবিকভাবেই মামলার তারিখ নির্ধারণ হয় তাহলে কোনো সমস্যা থাকবে না। মামলা স্থানান্তরের আসল কারণ জানতে আরও দুই-এক সপ্তাহ অপো করতে হবে।’
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনকে নির্বাচন ও রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এ কারণেই তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রতি সপ্তাহেই অন্তত দুই-তিনবার আদালতে হাজিরার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
৪ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার ১৪টি মামলা বিশেষ আদালতে স্থানান্তর করে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্থান সংকুলান না হওয়া ও নিরাপত্তার কারণে খালেদা জিয়ার মামলাগুলো বিশেষ এ স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে দারুস সালামের নাশকতার ৮ মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, নাইকো দুর্নীতি মামলা, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা, যাত্রাবাড়ী থানার বিশেষ মতা আইনে মামলা ও মানহানির ২ মামলা।
আদালতের নথি সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার ৫টি, রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যা (হুকুমের আসামি), ইতিহাস বিকৃতি করা, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি, ভুয়া জন্মদিন পালনসহ বিভিন্ন অভিযোগে দেশের আদালতে ৩২টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ, বিশেষ জজ ও মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে রয়েছে ১৮টি মামলা। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা আগে থেকেই বকশীবাজারের অস্থায়ী আদালতে পাঠানো হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার পে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় শিগগিরই যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলে এই মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ঠিক করবেন বিচারক।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই মামলাগুলো অস্থায়ী আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হয়রানি করাই সরকারের আসল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, আইন সবার জন্য সমান হলেও খালেদা জিয়ার মামলাগুলোকে সরকার রাজনৈতিকভাবে দেখছে। অস্থায়ী আদালতে সব মামলার শুনানি শুরু হলে সারা সপ্তাহই সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে মামলা ও বিচারসংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি দিন ধার্য রয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৩-এর আদালতে মামলাটির অভিযোগ গঠন সংক্রান্ত শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। তাছাড়া নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ১৫ জানুয়ারি দিন ধার্য আছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৯-এর আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ১৮ ফেব্র“য়ারি দিন ধার্য রয়েছে।
২০১৫ সালের প্রথম দিকে বিএনপির হরতাল-অবরোধ চলাকালে রাজধানীর দারুস সালাম থানায় নাশকতার অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৮টি মামলা হয়েছে। মামলায় খালেদাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লার আদালতে আগামী ৫ ফেব্র“য়ারি মামলাগুলোর অভিযোগ গঠন সংক্রান্ত শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি রাতে যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় গ্লোরি পরিবহনের একটি বাসে পেট্রলবোমা ছোড়ার ঘটনায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করে পুলিশ। এরপর খালেদা জিয়াসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করে পুলিশ। ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে ২৫ জানুয়ারি এ মামলায় অভিযোগ গঠন সংক্রান্ত শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। এছাড়া মানহানির দুই মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম খুরশীদ আলমের আদালতে আগামী ২১ জানুয়ারি শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।