কলাম

ছাত্র রাজনীতি ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

ড. অরুণ কুমার গোস্বামী : মূলত উচ্চশিক্ষা স্তরের শিক্ষার্থীরা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর এই শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শিক্ষা ক্ষেত্রে মাধ্যমিক স্তরের পর থেকে পিএইচডি লেভেল পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার পর্যায়ভুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার কতজন উচ্চশিক্ষা স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার বয়সী? উচ্চশিক্ষা স্তরে ভর্তিযোগ্য বয়সী লোকসংখ্যার মধ্যে কতজন ভর্তি হয়ে থাকে? এই ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতজন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত? আর সর্বশেষ প্রশ্ন হচ্ছে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তদের মধ্যে কতজন ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত? এসব প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর হচ্ছে : ১. মোটজনসংখ্যর মধ্যে ১৫ থেকে ২৪ বছর যাদের বয়স তারাই উচ্চ স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার বয়সী। ২. মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী জনসংখ্যা হচ্ছে ৩ কোটি ৫ লাখ ৮ হাজার ৯৯৮ জন; অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার মধ্যে শতকরা ১৯ দশমিক ৫৩ ভাগের বয়স ১৫-২৪ বছর। ৩. বলা বাহুল্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিযোগ্য ১৫-২৪ বছর বয়সী লোকসংখ্যার মধ্যে শতকরা মাত্র ১৩ জন; অর্থাৎ ৩৯ লাখ ৬৬ হাজার ১৭০ জন বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেন। অবশিষ্ট ২ কোটি ৬৫ লাখ ৪২ হাজার ৮২৮ জন; অর্থাৎ শতকরা ৮৭ জন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হয়ে অন্য কিছু করে থাকে। অথবা তাদেরকে শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষায় অনাগ্রহী বা অসমর্থ্য অথবা উচ্চশিক্ষা বঞ্চিত অথবা উচ্চশিক্ষার অনুপযুক্ত হিসেবে গণ্য করতে হবে। অর্থাৎ মাধ্যমিক-পরবর্তী স্তর পর্যন্ত অথবা শিক্ষার কোনো স্তরেই যেতে পারে না। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৬ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক স্তরে মোট ভর্তির হার শতকরা ৩২ ভাগ, প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার শতভাগ, মাধ্যমিক স্তরে ৫৮ ভাগ। এই হিসাবের পাশে উচ্চ স্তরের ভর্তির হারের হিসাব (মাত্র ১৩ ভাগ) দাঁড় করালে হিসাবটা খুবই বেমানান মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় এই হার ২১ ভাগ, ভারতে ২৪ ভাগ, ভুটানে ১১ ভাগ, নেপালে ১৬ ভাগ, পাকিস্তানে ১০ ভাগ এবং আফগানিস্তানে মাত্র ৯ ভাগ। মাধ্যমিক-পরবর্তী উচ্চশিক্ষা স্তরে বেশিরভাগ সংখ্যক ভর্তি কিংবা বেকার থাকার সঙ্গে দেশের নির্দিষ্ট বয়সের জনগোষ্ঠীর বেআইনি কর্মকা-ে সম্পৃক্ত থাকার একটা সম্পর্ক আছে! যা হোক, উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী কী বেকার, না কোনো বৈধ পেশায় বা অবৈধ কোনো কর্মকা-ে সম্পৃক্ত তা জানা সম্ভব নয়। এ সম্পর্কে গবেষণার প্রয়োজন আছে।
উচ্চ স্তরে ভর্তিকৃত শতকরা মাত্র ১৩ জন; অর্থাৎ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারা প্রায় ৩৯ লাখ ৬৬ হাজার ১৭০ জনের একটি ক্ষুদ্র অংশ দেশের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দেশের ছাত্র রাজনীতিতে যেসব ছাত্র সংগঠন সক্রিয় আছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, যার প্রতিষ্ঠা ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, প্রতিষ্ঠা এপ্রিল ১৯৫২; বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, প্রতিষ্ঠা সাম্প্রতিক সময়ে। সামরিক একনায়ক কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পরে প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, প্রতিষ্ঠা ১ জানুয়ারি, ১৯৭৭; যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন ছাত্র শিবির, প্রতিষ্ঠা ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৭। বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, প্রতিষ্ঠা ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮০; বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র সেনা, ২১ জানুয়ারি, ১৯৮০; সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, প্রতিষ্ঠা ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৪; বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, প্রতিষ্ঠা ১০ জানুয়ারি, ১৯৮৫; ছাত্র গণমঞ্চ, প্রতিষ্ঠা ২৫ জানুয়ারি, ২০১২।
বলা বাহুল্য, অনেক কারণে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দেশের বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন। অতএব ছাত্রলীগের কর্মকা- দ্বারা দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা অনেকাংশেই প্রভাবিত। যদিও ডাকসুসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার কারণে ছাত্রদের মধ্য থেকে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনেকাংশেই ব্যাহত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকার রাস্তায় র‌্যালি বের করেনি। কারণ ওইদিন সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস ছিল। রাস্তায় র‌্যালি বের হলে তাতে জনদুর্ভোগ আরো বাড়বে। তাই ছাত্রলীগ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি একটি শুভ এবং সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস হওয়ায় রাজধানীবাসীর ভোগান্তি এড়াতে র‌্যালি ৬ জানুয়ারি করা হয়েছে। এ সম্পর্কে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন জানান, ‘৪ জানুয়ারি ছিল তাদের সংগঠনের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। রেওয়াজ অনুযায়ী তারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রাজধানীবাসীর ভোগান্তির বিষয়টি মাথায় রেখে র‌্যালি সাপ্তাহিক ছুটির দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ছাত্রলীগের এই উদ্যোগে নিঃসন্দেহে জনমুখী।
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিকে কখনো কখনো প্রতিক্রিয়ামূলক, সংঘাতমূলক এবং সহিংস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে যে ছাত্র রাজনীতি রাজনৈতিক দলগুলোর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে থাকে এবং ছাত্র সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর অংশ। অতীত সরকারের আমলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক সংঘাত এবং উপদলীয় কোন্দলের ফলে অনেক হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে। এর ফলে একাডেমিক পরিবেশও সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সব গোলমাল বাধাগ্রস্ত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিষ্ঠান অনাকাক্সিক্ষতভাবে বন্ধ ঘোষণা করা ছাড়া অন্য বিকল্প কোনো উপায় থাকে না। সেহেতু সময়মতো কাসগুলো শেষ হয় না এবং সেশনজট চলতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে দেশের বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ কর্তৃক এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক।
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রলীগ প্রাচীনতম ছাত্র সংগঠন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে এই সংগঠনটির নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয় ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগই বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত করে তুলেছিল। জাতীয় স্তরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি দেশের ছাত্রদের, বিশেষত উচ্চশিক্ষা স্তরের ছাত্রদের কর্মকা- ও সংস্কৃতিকে বেষ্টিত করে থাকে। ছাত্র সক্রিয়তাবাদ/এক্টিভিজম হচ্ছে রাজনীতি, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক অথবা সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ছাত্রদের কর্মকা-। যদিও সচরাচর স্কুল, কারিক্যুলাম এবং শিক্ষাগত তহবিল জোগান দেয়া, ছাত্রগোষ্ঠী প্রভৃতি রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহে ছাত্র সংগঠনগুলোর বিরাট প্রভাব আছে।
আধুনিক ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গের আন্দোলন বিষয়, আকৃতি এবং সফলতার দিক দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। ছাত্রদের কিছু কিছু প্রতিবাদ একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে; অন্যান্যগুলো যুদ্ধ কিংবা ঔপনিবেশিক স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ছাত্র সক্রিয়তাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই পুরনো। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্যারিস এবং বোলোগনার ছাত্রদের যৌথ কর্মকা- পরিচালিত হয়েছিল প্রধানত টাউন (শহর) ও গাউন (পোশাক) নিয়ে। ১২২৯ সালে কয়েকজন ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ধর্মঘট আহ্বান করেছিল। ছাত্রদের এই আন্দোলন প্রায় দুই বছরেরও বেশিকাল চলতে থাকার প্রেক্ষাপটে মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশকিছু সংস্কার করা হয়েছিল। এই ঘটনা গির্জা, ধর্মনিরপেক্ষ নেতা এবং উদীয়মান শিক্ষার্থী শ্রেণির মধ্যে শহর বা টাউন এবং গাউন সম্পর্কিত কর্তৃত্বের সংগ্রাম প্রদর্শন করে এবং প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর স্থানীয় গির্জার কর্তৃত্ব হ্রাস করে।
ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হওয়ার সময় থেকেই ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা চিন্তা করা শুরু করেছিলেন। আর তখনই তিনি ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে শৈশব থেকেই শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে সাংগঠনিক স্পৃহা ও দক্ষতা লক্ষ্য করা যায়। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে জানা যায় ‘ছোটকাল’ থেকেই তিনি সেসময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র পড়তেন। এসব পত্রিকা হচ্ছে আনন্দবাজার, বসুমতী, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাত। বঙ্গবন্ধুর বাবা কলকাতা থেকে প্রকাশিত এসব সংবাদপত্র টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে নিয়মিত রাখতেন। এছাড়া স্কুলে ছেলেদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কর্মকা- পরিচালনা করতেন।
যদিও ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন বর্ষ হিসেবে ১৯৪৮ সাল স্বীকৃত কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে জানা যাচ্ছে ১৯৩৮ সালে সে সময়ের বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা ও শ্রমমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী যখন গোপালগঞ্জে আসেন তখন শেখ মুজিব ছিলেন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের ছাত্র। সফরের একপর্যায়ে ‘হক সাহেব পাবলিক হল দেখতে গেলেন। আর শহীদ সাহেব (গেলেন) মিশন স্কুল দেখতে।’ (পৃঃ ১১) মিশন স্কুলে সংবর্ধনার দায়িত্ব ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর। সোহরাওয়ার্দী তখন জানতে চেয়েছিলেন গোপালগঞ্জে মুসলিম লীগ করা হয়েছে কি না। জবাবে মুজিব বলেছিলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান নাই। …ছাত্রলীগও নাই।’ এ থেকে বোঝা যাচ্ছে সেই ১৯৩৮ সালেই ছাত্রলীগ নামে একটি ছাত্র সংগঠনের অস্তিত্ব ছিল, যদিও গোপালগঞ্জ বা অন্যান্য জায়গায় এই সংগঠনের কোনো শাখা গড়ে ওঠেনি তখন পর্যন্ত। এটি ছিল মুসলিম লীগের সাথে সম্পৃক্ত।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র আরেক স্থানে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘একটা ঘটনার দিন তারিখ আমার মনে নেই, ১৯৪১ সালের মধ্যেই হবে, ফরিদপুর ছাত্রলীগের জেলা কনফারেন্স, শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারা হলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, ইব্রাহিম খাঁ সাহেব। সে সভা আমাদের করতে দিল না, ১৪৪ ধারা জারি করল। কনফারেন্স করলাম হুমায়ুন কবির সাহেবের বাড়িতে। কাজী নজরুল ইসলাম সাহেব গান শোনালেন। আমরা বললাম, এই কনফারেন্সে রাজনৈতিক আলোচনা হবে না। শিক্ষা ও ছাত্রদের কর্তব্য সম্বন্ধে বক্তৃতা হবে। ছাত্রদের মধ্যেও দুইটা দল হয়ে গেল। ১৯৪২ সালে আমি ফরিদপুর যেয়ে ছাত্রদের দলাদলি শেষ করে ফেলতে সক্ষম হলাম।… তখন মোহন মিয়া সাহেব ও সালাম খান সাহেব জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন।’ (পৃঃ ১৬)
বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘এই সময় থেকে মুসলিম লীগের মধ্যে দুইটা দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। একটা প্রগতিবাদী দল, আর একটা প্রতিক্রিয়াশীল। শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা মুসলিম লীগকে জনগণের লীগে পরিণত করতে চাই, জনগণের প্রতিষ্ঠান করতে চাই। জমিদার, জোতদার ও খান বাহাদুরের দলেরাই লীগকে পকেটে করে রেখেছিল।’ (পৃঃ ১৭) ফলশ্রুতিতে ১৯৪৭ সালের দিকে মুসলিম ছাত্রলীগও দুই দলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। একদল পরিচিত হত শহীদ সাহেব ও হাশিম সাহেবের দল বলে, আরেক দল পরিচিত হত খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব এবং মওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের দল বলে। (পৃঃ ৩১)
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের’ নাম বদলিয়ে ‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ করা হয়েছিল। শাহ আজিজুর রহমান এই সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে বহাল ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘ঢাকায় কাউন্সিল না করে অন্য কোথাও তাঁরা সম্মেলন করলেন গোপনে। কার্যকরী কমিটির সদস্য প্রায় অধিকাংশই ছাত্র ছিলেন না, ছাত্র রাজনীতি তারা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালে এই সংগঠনের নির্বাচন হয়েছিল, আর হয় নাই।’ বঙ্গবন্ধু এবং আরও অনেকে এই কমিটি মানেননি। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তারা শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বের ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু নিজে ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটি ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন সম্পর্কে ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। যাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু এসময় আলাপ-আলোচনা করেছিলেন তারা হলেন আজিজ মোহাম্মদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আব্দুল হামিদ চৌধুরী, দবিরুল ইসলাম, নইমউদ্দিন, মোল্লা জালালউদ্দিন, আব্দুর রহমান চৌধুরী, আব্দুল মতিন খান চৌধুরী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আরও অনেক ছাত্র নেতা তখন একটি ছাত্র সংগঠন করার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন।
এরপর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ফজলুল হক মুসলিম হলের অ্যাসেম্বলি হলে এক সভা ডাকা হয়েছিল। একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলার জন্য সেখানে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। যার নাম দেয়া হল ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। এখানে নইমউদ্দিনকে কনভেনর করা হয়েছিল। যদিও অলি আহাদ এর সদস্য হতে আপত্তি করেছিলেন। কারণ হিসেবে বলেছিলেন ‘তিনি আর সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান করবেন না।’ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নাম দিলে তিনি থাকতে পারেন। বঙ্গবন্ধু তখন অলি আহাদকে বুঝাতে চেষ্টা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যে তখনও সময় আসেনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দেশের আবহাওয়া চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলেন। নামে কিছুই আসে যায় না। আদর্শ যদি ঠিক থাকে, তবে নাম পরিবর্তন করতে বেশি সময় লাগবে না। ‘কয়েক মাস হল পাকিস্তান পেয়েছি। যে আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তান পেয়েছি, সেই মানসিক অবস্থা থেকে জনগণ ও শিক্ষিত সমাজের মত পরিবর্তন করতে সময় লাগবে।’ (পৃঃ ৮৯)
এভাবে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পরে বঙ্গবন্ধু এই সংগঠনটির অফিস করেছিলেন ১৫০ নম্বর মোগলটুলী। ‘মুসলিম লীগ নেতারা চেষ্টা করেছিলেন এই অফিসটা দখল করতে, কিন্তু শওকত মিয়ার জন্য পারেন নাই।’ ‘ছাত্রলীগ গঠন করার পর বিরাট সাড়া পাওয়া গিয়েছিল ছাত্রদের মধ্যে। এক মাসের ভিতর বঙ্গবন্ধু প্রায় সকল জেলায় কমিটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যদিও নইমউদ্দিন ছিলেন কনভেনর, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকেই সবকিছু তখন করতে হত। তিনি একদল সহকর্মী পেয়েছিলেন, যারা সত্যিকার নিঃস্বার্থ কর্মী ছিলেন। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সরকার প্রকাশ্যে শাহ আজিজুর রহমানের ‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগকে’ সাহায্য করত। আর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের’ বিরুদ্ধে গোয়েন্দা লাগিয়ে দিত।
পাকিস্তান হওয়ার পর থেকে মুসলিম লীগের যারা ভারতে থেকে গিয়েছিলেন তারা ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ নামে দল চালাচ্ছিলেন। অপর দিকে পাকিস্তান অংশে যারা চলে এসেছিল তারা দলটির নাম দিয়েছিল ‘পাকিস্তান মুসলিম লীগ’। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল। সে কারণে তিনি আর মুসলিম লীগের সভাপতি থাকতে পারেননি। এসময় চৌধুরী খালিকুজ্জামান সাহেবকে পাকিস্তান মুসলিম লীগের ‘ভার’ দেয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘তিনি (অর্থাৎ চৌধুরী খালিকুজ্জামান) পাকিস্তান মুসলিম লীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এডহক কমিটি গঠন করেছিলেন। তবে তিনি পাঞ্জাব মুসলিম লীগ ভাঙ্গেন নাই, সিন্ধু প্রদেশের মুসলিম লীগ ভাঙ্গেন নাই, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মুসলিম লীগের কমিটিও ভাঙ্গেন নাই। শুধু ভাঙ্গলেন, বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘বাংলাদেশের’ মুসলিম লীগ। লক্ষণীয় বিষয় একথাটি উল্লেখ করার সময়ও বঙ্গবন্ধু তাঁর বইতে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘বাংলাদেশ’ বলছেন। তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ মুসলিম লীগের কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার কারণ এখানে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সমর্থক বেশি ছিল। তাই এখানে নতুন করে লীগ কমিটি গঠিত হয়েছিল নাজিমুদ্দীন সাহেবের সমর্থকদের নিয়ে। মুসলিম লীগের সরকার সমর্থিত এই গোষ্ঠীটির ‘চিফ অর্গানাইজার’ করা হয়েছিল মওলানা আকরাম খাঁ’কে। এসময় বঙ্গবন্ধু ১১২ জন কাউন্সিল সদস্যের স্বাক্ষর নিয়ে (মুসলিম লীগের) রিক্যুইজিশন সভা আহ্বান করেছিলেন। রিক্যুইজিশন সভা আহ্বানের স্বাক্ষর বঙ্গবন্ধু নিজে সংগ্রহ করেছিলেন। যারা এই সভায় স্বাক্ষর করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মোহাম্মদ আলী, তোফাজ্জল আলী, বাক্তার মালেক, আব্দুস সালাম খান, এম এ সবুর, আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দিন, শামসুল হক, আনোয়ারা খাতুন, খয়রাত হোসেন প্রমুখ। এর পরে মুসলিম লীগ থেকে বঙ্গবন্ধুসহ সোহরাওয়ার্দী সমর্থকদের বিতাড়িত করে দেয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, এসময় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবিও ক্রমান্বয়ে জোরালো হচ্ছিল। স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যাদের ওপর সরকার যথারীতি নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিল তারা ‘বাংলার’ পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছিলেন। আর এর পুরোধা ছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু’। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পরের বছর এবং ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক চেতনা ধারণ করে আওয়ামী (মুসলিম) লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসময় বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছিল। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধুকে এই দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিল। এরপর থেকে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার প্রাণের সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ ব্যাপক জনভিত্তি লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির মর্যাদা, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও আহ্বানে মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
প্রগতির চাকা কখনও পেছনের দিকে ঘোরে না। দৃষ্টিভঙ্গিগত এবং ঘটনা-দুর্ঘটনা-রক্তপাত-শোক পরম্পরার ভিন্নতার কারণে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ‘প্রগতি’ রূপান্তরিত হয়ে স্থায়ীভাবে ‘পশ্চাৎ’ গতি ধারণ করেছে। বাঙালিদের বাঁচার দাবি আদায়ের সংগ্রামে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সংযুক্ত করার প্রয়োজনে এবং সময়ের পরিক্রমায় তাই দেখা যায় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়। এভাবে ছাত্রলীগ থেকেও নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচিতি সংবলিত শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছিল। আর এই সংগঠনগুলোর মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি রূপান্তরিত অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্রলীগ’ এবং রূপান্তরিত অসাম্প্রদায়িক ‘রাজনৈতিক সংগঠন’ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটে।
লেখক : চেয়ারম্যান
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ও পরিচালক
সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়