রাজনীতি

ডিসিসি উত্তরের নির্বাচন : নৌকা ও ধানের শীষের লড়াইয়ে জমজমাট ঢাকা সিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। মেয়র পদে উপনির্বাচন আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের ৩০ নভেন্বর নির্বাচিত মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর মেয়র পদটি শূন্য হয়। আসন্ন উপনির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হতে মনোনয়ন জমা দেয়ার শেষ সময় ১৮ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ২১ ও ২২ জানুয়ারি। প্রত্যাহারের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯ জানুয়ারি। ৮ জানুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা ঢাকা উত্তরের মেয়র পদে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। মেয়রের পাশাপাশি ঢাকা উত্তর ও দণি সিটি করপোরেশনে নতুন যুক্ত ৩৬টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ১২টি সংরতি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা করা হয়। তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই ও ভোটের দিন একই রাখা হয়েছে। প্রথমবারের মতো এ নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীরা লড়বেন দলীয় মনোনয়নে, দলীয় প্রতীকে।
উল্লেখ্য, এবারই প্রথম ঢাকায় দলীয় প্রতীকে কোনো স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হচ্ছে। সেক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনকে ঘিরে দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দলÑ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় প্রার্থী অর্থাৎ নৌকা ও ধানের শীষের ব্যাপক শো-ডাউন হবে বলে মনে করা হচ্ছে। মূলত ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা ছেয়ে যাবে নৌকা আর ধানের শীষের ব্যানার- ফেস্টুনে। এই শো-ডাউনের জন্য উন্মুখ উভয় দলই। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এ নির্বাচনকেও সিরিয়াসলি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আর এতে করে উজ্জীবিত হয়ে উঠছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী এবং সমর্থকরা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের টেস্ট কেস হিসেবে নিচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। অনেকেরই মতে, ঢাকা উত্তর থেকে যে মার্কা জয়লাভ করবে, সে মার্কার দলই পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করবে। এমনকি নানামুখী চাপের কারণে নির্বাচন কমিশনও এ নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
জানা গেছে, এ নির্বাচনে ঢাকা উত্তর ও দেিণর একটি করে ভোটকেন্দ্রে ইভিএম যন্ত্রের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত রয়েছে। উত্তরের মেয়র পদে উপনির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ইসির যুগ্ম সচিব আবুল কাসেম ও ১২ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার রয়েছেন। দেিণর ১৮ ওয়ার্ডের জন্য রিটার্নিং অফিসার ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রকিবউদ্দিন ম-ল ও ৬ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
ঢাকা উত্তরের নতুন মেয়র এবং ৩৬টি নতুন ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের মেয়াদ হবে সিটি করপোরেশনের মেয়াদ থাকা পর্যন্ত। ঢাকা উত্তরের েেত্র এই মেয়াদ হবে ২০২০ সালের ১৩ মে পর্যন্ত। দেিণ ২০২০ সালের ১৬ মে পর্যন্ত।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পুরনো ৩৬টির সঙ্গে নতুন ১৮টি ওয়ার্ড যোগ হওয়ায় মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪টিতে। দণি সিটির ওয়ার্ডসংখ্যা ৫৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকার দুই সিটিতে ভোট হয়।
ঢাকা উত্তরের ৫৪ ওয়ার্ডে ভোটার ২৯ লাখ ৪৮ হাজার ৫১০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৫ লাখ ২২ হাজার ৭২৬ ও নারী ১৪ লাখ ২৫ হাজার ৭৮৪। কেন্দ্র ১ হাজার ৩৪৯, ভোটক ৭ হাজার ৫১৬। উত্তরের ১৮ ওয়ার্ডে ভোটার ৫ লাখ ৭১ হাজার ৬৮৪ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭৯ হাজার ৩৫ ও নারী ভোটার ২ লাখ ৮২ হাজার ৬৪৯ জন। অন্যদিকে ঢাকা দেিণর ১৮ ওয়ার্ডে ভোটার ৪ লাখ ৭৭ হাজার ৫১০ জন। পুরুষ ২ লাখ ৪৫ হাজার ৪১৬ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৪ জন। ভোটকেন্দ্র ২৩৩ ও ভোটক ১ হাজার ২৪০টি।
গত বছরের ৩০ নভেম্বর আনিসুল হক মারা যাওয়ার পর ১ ডিসেম্বর মেয়র পদটি শূন্য ঘোষণা করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। সে েেত্র ৯০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২৮ ফেব্র“য়ারির মধ্যে এ উপনির্বাচন করতে হচ্ছে ইসিকে। অন্যান্য দল অংশগ্রহণ করলেও এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যেই মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তাই অনেকেই দুই দলের মনোনয়ন পেতে নানাভাবে চেষ্টা-তদবির করছেন।
আনিসুল হকের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া নির্বাচনে মতাসীন আওয়ামী লীগ প্রয়াত আনিসুল হকের মতো আরেক ব্যবসায়ী নেতা আতিকুল ইসলামকে প্রার্থী করার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড। বোর্ডের সিদ্ধান্তের পরই প্রার্থী ঘোষণা এবং প্রতীক বরাদ্দ করবে দলটি। জানা গেছে, বড় কোনো চমক না থাকলে আতিকুল ইসলামই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন। এদিকে তাবিথ আউয়ালকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন উপনির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের মেয়রপ্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। ৮ জানুয়ারি রাতে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মেয়রপ্রার্থী চূড়ান্তের পর ঢাকা উত্তর ও দণি সিটি করপোরেশনের সঙ্গে নতুন যুক্ত হওয়া ৩৬টি ওয়ার্ডে বিএনপির কাউন্সিলরপ্রার্থী চূড়ান্ত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাজ করছেন। জানা গেছে আলোচনার ভিত্তিতে কয়েকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরপ্রার্থী জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতকে ছেড়ে দেয়া হতে পারে।
বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট এ নির্বাচনকে নিরপে সরকারের দাবি আদায়ের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে দেখছে। তারা মনে করছে, এই উপনির্বাচনে মতাসীনরা যদি অনিয়ম করে বা বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করেÑ উভয় ইস্যুকেই তারা পুঁজি করবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই জোটের মেয়রপ্রার্থীর পে প্রচারে নামবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
অপরদিকে নির্বাচনি আচরণবিধির কারণে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো মন্ত্রী নির্বাচনি প্রচারণায় নামতে পারবেন না বলে স্বাভাবিকভাবেই প্রচারণার দিক দিয়ে সরকারদলীয় প্রার্থী কিছুটা পিছিয়ে থাকবেন। তবে বিগত ৯ বছর যাবৎ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঢাকাকেন্দ্রিক বিশাল উন্নয়ন কর্মকা-ের সুফল সরকার দলীয় প্রার্থীর ঘরেই যাবে। এ বিবেচনায় সরকার দলীয় প্রার্থীরা বিরোধী দলীয় প্রার্থীর তুলনায় বেশি সুবিধা পাবে। সে যা-ই হোক, সামগ্রিক বিবেচনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপনির্বাচনকে ঘিরে নৌকা ও ধানের শীষের যে জমজমাট লড়াই হচ্ছে তা নিশ্চিত করে এখনই বলে দেয়া যায়।