প্রতিবেদন

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা-২০১৮ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসারে নতুন বাজার খুঁজতে রপ্তানিকারকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক : ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি থেকে মাসব্যাপী ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা (ডিআইটিএফ) শুরু হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও ২৩তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা-২০১৮ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মাসব্যাপী ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এ বছর ওষুধ শিল্পকে ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেন।
ওষুধ শিল্পকে ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প একটি উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প। দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ জোগান দিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকাসহ ১৯৩টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, ওষুধ শিল্পের উন্নতির ল্েয মুন্সীগঞ্জে এ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন পার্ক স্থাপনের কাজ শুরু করেছে সরকার। দেশে-বিদেশে ওষুধ শিল্পের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে আধুনিকায়ন করে এর সক্ষমতা বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশে তৈরি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে ব্যবসায়ীদের নতুন নতুন বাজার খোঁজার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সামনে আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের পণ্যের প্রসার ঘটাতে হবে। নতুন নতুন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানিও বাড়াতে হবে। আমাদের শুধু একদিকে তাকালে চলবে না। ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য নতুন দেশ, নতুন নতুন জায়গা খুঁজে বের করতে হবে, নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে এবং সেই সব বাজারে কোন ধরনের পণ্য রপ্তানি করা যায় সেটাও খুঁজে বের করতে হবে। তবেই আমাদের ব্যবসাবাণিজ্য এগিয়ে যাবে। দেশের রপ্তানি খাতকে সমৃদ্ধ করতেই এটি জরুরি। উৎপাদিত পণ্যের মান নিশ্চিত করা, ব্র্যান্ডিং করা এবং এগুলোকে আকর্ষণীয় করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এেেত্র সরকারের প থেকে যা যা সাহায্য-সহযোগিতা করার তা তাঁর সরকার করে যাচ্ছে এবং করবে। সবসময় মাথায় রাখতে হবে বর্তমান বিশ্ব অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। এই প্রতিযোগিতাময় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সেদিকে ল্য রেখেই তিনি ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের বলেন, শুধু নিজেদের আর্থিক সচ্ছলতা আনলেই হবে না। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ক্রয় মতাও বাড়াতে হবে। আপনাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে হলে মানুষের ক্রয় মতা বাড়ানো একান্তভাবেই প্রয়োজন।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব সুভাশীষ বোস, ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় ভট্টাচার্য অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং মেলায় অংশ গ্রহণকারী দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে দেশের বাণিজ্য খাতের অগ্রগতি নিয়ে একটি তথ্যচিত্র ‘উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ প্রদর্শিত হয়।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বহির্বিশ্বে বর্তমান সরকারের ব্যবসাবাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, আরও ১২টি দেশে নতুন দূতাবাস এবং ১৭টি মিশন খোলা হয়েছে। সেসব দেশের অ্যাম্বাসেডর, হাইকমিশনারদের ডেকে ওয়ার্কশপ করে ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার এবং দেশে বিনিয়োগ কিভাবে বাড়ানো যায় সেদিকে ল্য রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যবসার দ্বার আরও উন্মুক্ত হচ্ছে।
দেশের ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসারে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশীয় উদ্যোক্তাগণ তাদের নতুন পণ্য প্রদর্শনীর সুযোগ পান। আবার দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদার একটি চিত্রও তারা পেয়ে থাকেন। ফলে পণ্যের মানোন্নয়ন ও বহুমুখী করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। জাতির পিতাই স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি শিল্প-উৎপাদনের দিকে নজর দেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু পশ্চিমাদের ফেলে যাওয়া কলকারখানাগুলো জাতীয়করণ করেন। জাতির পিতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্র শাসনের সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৭ ভাগের ওপরে উঠে গিয়েছিল। অথচ ’৭৫-পরবর্তী সরকারগুলো সেসব কলকারখানা পানির দামে বিক্রি করে দিয়ে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে তাঁর সরকার বেসরকারি খাতের উন্নয়নে কাজ শুরু করে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁর সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল সরকার নিজে ব্যবসাবাণিজ্য করবে না কিন্তু সহায়কের ভূমিকা পালন করবে। এই উদ্যোগের ফলেই আজ দেশে বেসরকারি খাত ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বিশ্বের ৪৬তম বৃহত্তম অর্থনীতি। গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। এখন আমদানি ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ আয় থেকে মেটানো হচ্ছে। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক অধিকাংশ সূচকে বাংলাদেশ দণি এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে একই সঙ্গে উন্নয়ন ঘটানোর েেত্র বাংলাদেশ রীতিমতো বিস্ময়। ‘প্রাইস ওয়াটার হাউজ কুপার্স’ বলেছে নেক্সট ইলেভেনের প্রথমে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০৫০ সালে পশ্চিমা দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সিটি ইনভেস্টমেন্ট রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’ বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্রুত প্রবৃদ্ধির দিক থেকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশগুলোর তালিকায় প্রথমদিকে স্থান দিয়েছে। এভাবে আইএমএফ, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, জেপি মর্গনান চেজ, এবং মর্গান স্ট্যানলি বাংলাদেশকে অপার সম্ভাবনাময় দেশগুলোর তালিকায় প্রথম সারিতে যুক্ত করেছে। এটা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য অত্যন্ত বড় অর্জন। তিনি বলেন, বর্তমানে ১৯৯টি দেশে ৭৫০টি পণ্য রপ্তানি করা হচ্ছে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ল্য ধরা হয়েছে ৪১ বিলিয়ন ডলার। এই ল্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমাদের অবস্থান আরও সুসংহত হবে বলেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী আইসিটি খাতের বিশাল সম্ভাবনা কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশে এখন প্রায় ৮ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে এবং ১৬ কোটি মানুষের দেশে মোবাইল ফোনের ১৩ কোটি সিম সংযোগ রয়েছে। তিনি এ সময় দেশে মোবাইল ফোন সংযোজনকে উৎসাহিত করে বলেন, এসব পণ্যতো আমরা নিজেরাই উৎপাদন করতে পারি। এখন দেশে কিছু কিছু অ্যাসেম্বলিং হচ্ছে। এটাকে আমরা আরো গুরুত্ব দিতে পারি। প্রধানমন্ত্রী আইসিটি খাতের দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
চামড়া খাতের উন্নয়নে তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৭ সালে আমরা চামড়া খাতকে ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছিলাম। সেই সঙ্গে চামড়া শিল্পের উন্নয়নে আমরা ব্যাপক পদপে নিয়েছি। বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান ও নতুন বছর সবার জন্য আরও উন্নতি এবং প্রগতি নিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্যমেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।
উল্লেখ্য, এবারের বাণিজ্যমেলায় বিশ্বের ১৭টি দেশের ৪৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবি সূত্রে জানা যায়, থাইল্যান্ড, ইরান, তুরস্ক, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, নেপাল, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, হংকং, সিঙ্গাপুর, মরিশাস ও দণি কোরিয়াসহ ১৭টি দেশের ৪৩টি প্রতিষ্ঠান এবারের বাণিজ্যমেলায় অংশ নিয়েছে।