রাজনীতি

দলের অস্তিত্ব রক্ষায় নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপির

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে যে ভুল করেছে বিএনপি, তার খেসারত দিতে এবং দলের অস্তিত্ব রক্ষায় নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া স্পষ্ট করেই বলেছেন, যেকোনো মূল্যে বিএনপি নির্বাচনে যাবে এবং বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা যাবে না। খালেদা জিয়ার এ ধরনের মনোভাবে যা প্রকাশ পায়, তার সারমর্ম হলো সরকারকে যতটুকু সম্ভব চাপে রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে যাবে বিএনপি। সরকার ও বিএনপি নেতাদের কথাবার্তায় এ মুহূর্তে সেরকম আলামতই দেখা যাচ্ছে।
দলের অস্তিত্ব রক্ষার পাশাপাশি তৃণমূলের চাপে এবার বিএনপি যে নির্বাচনে যাবে তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে দলটির সাম্প্রতিক কর্মকা- দেখে। ইতোমধ্যে দলটি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করেছে। ইতঃপূর্বে তৈরি করা খসড়া তালিকায় স্থান পাওয়া ৯০০ জনের মধ্য থেকে ৩০০ জনের তালিকা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত ৩০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি দলটি। এ কাজে দায়িত্ব পাওয়া দলটির কয়েক নেতা হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আসনভিত্তিক প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করছেন। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা এতে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। তবে কোনো কোনো েেত্র ব্যতিক্রম ঘটছে। রাখা হয়েছে একদম নতুন মুখ। ইতোমধ্যে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়াদের আংশিক নাম পাওয়া গেছে।
চূড়ান্ত তালিকায় নতুনদের স্থান দেয়ার ব্যাপারে বিএনপির হাইকমান্ড কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিষয়গুলো হলো প্রার্থীর মৃত্যু, বার্ধক্য, নিখোঁজ, অজনপ্রিয়তা, দলীয় কর্মকা-ে নিষ্ক্রিয়তা, বহিষ্কার কিংবা দলের বাইরে অবস্থানগত কারণে উল্লেখযোগ্য আসনে পরিবর্তন আসছে। এসব আসনে নতুন প্রার্থী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তবে নতুনদের আপাতত চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হলেও তাদের প্রশ্নে আরো খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। নেতিবাচক কিছু পাওয়া গেলে চূড়ান্ত তালিকা থেকেও ছিটকে পড়তে পারেন অনেকে।
২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এবার এ আসনে সাংবাদিক নেতা ও দলের সহপ্রচার সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরীর নাম চূড়ান্ত তালিকায় স্থান দেয়া হয়েছে। একইভাবে ঢাকা-৭ আসনে নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টুর মৃত্যুজনিত কারণে তার স্ত্রী দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাসিমা আক্তার কল্পনার নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গাজীপুর-৪ আসনে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহর (অব.) মৃত্যুতে তার ছেলে শাহ রিয়াজুল হান্নানকে তালিকায় স্থান দেয়া হয়েছে। নাটোর-১ আসনে ফজলুর রহমান পটলের মৃত্যুতে তার স্ত্রী অধ্য কামরুন্নাহার শিরিনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে কুমিল্লা-২ আসনে এম কে আনোয়ার, পঞ্চগড়-২ আসনে মোজাহার হোসেন মারা যাওয়ায় এ দুই আসনে দলের যোগ্য প্রার্থী আপাতত মিলছে না। সিলেট-২ আসনে নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর স্ত্রী চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তাহসীনা রুশদী লুনা স্থান পেয়েছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে পঞ্চগড়-১ আসনে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের পাশাপাশি তার ছেলে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নওশাদ জমির ও যশোর-৩ আসনে তরিকুল ইসলামের সঙ্গে তার ছেলে দলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
অজনপ্রিয়তার কারণে বরিশাল-১ আসনে ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহানের পরিবর্তে সাবেক সংসদ সদস্য জহিরউদ্দিন স্বপনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। ময়মনসিংহ-৪ আসনে দেলোয়ার হোসেন দুলু, ফরিদপুর-৩ আসনে চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, সুনামগঞ্জ-১ আসনে নজির হোসেন, নরসিংদী-৪ আসনে সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, যশোর-৬ আসনে মফিকুল হাসান তৃপ্তি, ঢাকা-১৮ আসনে মেজর কামরুল ইসলামের (অব.) মনোনয়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। নিষ্ক্রিয়তার কারণে খুলনা-৪ আসনে শাহ শরিফ কামাল তাজের পরিবর্তে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল স্থান পেয়েছেন।
একই অবস্থা সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে। এখানে মেজর মঞ্জুর কাদেরের (অব.) পরিবর্তে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সহসভাপতি রকিবুল করিম খান পাপ্পুর ভাগ্য খুলেছে। ঝালকাঠি-১ আসনে ব্যারিস্টার শাজাহান ওমর অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এভাবে সারাদেশে বিএনপি শতাধিক আসনে দলের প্রার্থী পরিবর্তন চূড়ান্ত করেছে। যাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে মাঠ গোছানোর সবুজ সংকেত পেয়েছেন দলীয় হাইকমান্ডের তরফ থেকে। বাকিদের দ্রুতই মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশনা দেয়া হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে আগামী নির্বাচনে জামায়াতসহ জোট শরিকদের কোন কোন আসনে ছাড় দেয়া হবে তারও একটা খসড়া তালিকা করছে বিএনপি। তবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে সংশ্লিষ্ট দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে। সূত্র জানিয়েছে, এবার জামায়াতের আসন নিশ্চিতভাবেই কমছে। কারণ যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ায় ও জেলে থাকায় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের আসনে এবার প্রার্থী সংকটে রয়েছে দলটি। এসব আসনের ব্যাপারে নতুন করে ভাবছে বিএনপি নেতৃত্ব। তাছাড়া বাস্তবতার নিরিখে কয়েকটি আসনে এবার জামায়াতের ভোটের বাজার নাজুক। শীর্ষ নেতারা যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাজা পাওয়ায় ভাবমূর্তি সংকটেও রয়েছে দলটি। এসব বিবেচনায় ২০০৮ সালের তুলনায় কম আসনে জামায়াতকে ছাড় দেয়ার কথা এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে বিএনপি। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ স্বদেশ খবরকে বলেন, প্রতিটি নির্বাচনে মনোনয়ন পরিবর্তন দলের রুটিন ওয়ার্কের অংশ। আগামী নির্বাচনেও তেমনটা হতে পারে। দলের প্রার্থী তালিকা তৈরি করাও একটি রুটিন ওয়ার্ক। সামনে যেহেতু নির্বাচন রয়েছে সে কারণে তালিকা নিয়ে কাজ চলা স্বাভাবিক। তবে দলের মনোনয়ন বোর্ডই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত মতার অধিকারী। যার প্রধান দলীয় চেয়ারপারসন নিজে। চূড়ান্ত মনোনয়ন চেয়ারপারসনের সম্মতিতেই হবে।
তবে বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, চূড়ান্ত মনোনয়ন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্মতিতে হলেও প্রায় প্রতিটি আসনেই মনোনয়ন প্রশ্নে খালেদা জিয়া গুরুত্ব দেবেন তাঁর লন্ডনপ্রবাসী পুত্র বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা এ বিষয়টি ভালো করে বোঝেন বলেই খালেদা জিয়ার পাশাপাশি তারা লন্ডনেও দৌড়ঝাঁপ দিচ্ছেন। বিএনপির ওই সূত্রটি জানিয়েছে, বিএনপির ৩০০ আসনের মধ্যে অন্তত ২০০ আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত হবে লন্ডন থেকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি নেতাদের লন্ডনমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।