প্রতিবেদন

নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় জাতিসংঘে প্রস্তাব পাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
মিয়ানমারে নির্যাতিত-নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের সুরা প্রশ্নে উত্থাপিত একটি প্রস্তাব জাতিসংঘে পাস হয়েছে। ওই প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক অভিযান বন্ধের পাশাপাশি রোহিঙ্গা নির্যাতন তদন্তে বিশেষ দূত নিয়োগে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। ২৪ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হয়।
ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসির উত্থাপিত প্রস্তাবের পে ভোট পড়ে ১২২টি। বিপে ভোট দেয় ১০টি দেশ। এই তালিকায় রয়েছে চীন, রাশিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, বেলারুশ, সিরিয়া ও জিম্বাবুয়ে। আর ভোটদানে বিরত ছিল ২৪টি দেশ। প্রস্তাবটিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও তাদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং রাখাইনে ত্রাণকর্মীদের অবাধে প্রবেশাধিকার দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুটেরেজের প্রতি মিয়ানমারে বিশেষ দূত নিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। সাধারণ পরিষদের বাজেট কমিটি মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশেষ দূতের জন্য বরাদ্দের ব্যাপারে সবুজ সংকেত দেয়ার পর প্রস্তাবে এ বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। যদিও রাখাইনে হত্যাযজ্ঞ তদন্তের ব্যাপারে সবসময় অসহযোগিতা করে আসছে মিয়ানমার। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তা ইয়াংহি লিকে মিয়ানমারে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়। ওই কর্মকর্তার আগামী ২০ জানুয়ারি মিয়ানমার যাওয়ার কথা ছিল। ২০ ডিসেম্বর মিয়ানমার ওই কর্মকর্তার সফরের অনুমোদন বাতিল করে।
প্রসঙ্গত মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হত্যা-নির্যাতন থেকে বাঁচতে গত আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ৬ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এখনো সেই স্রোত অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, রাখাইনের মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে এখনো নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গা শরণার্থীর স্রোতের পরিস্থিতি বিবেচনা করে জাতিসংঘ বলেছে, রাখাইনে জাতিগত নিধন বন্ধ না হলে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসা শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি উপলব্ধি করে বাংলাদেশও রাখাইনে গণহত্যা বন্ধ করার মাধ্যমে শরণার্থীর স্রোত থামানোর জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও সংগঠনের কাছে প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরছে। এতে বিশ্ব জনমত ও সহানুভূতি বাংলাদেশ ঠিকই আদায় করতে পেরেছে। কিন্তু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী দুই সদস্য দেশ চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা বন্ধ বা কোনো নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব আনা যায়নি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন স্বার্থে চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশ ও বিশ্বসম্প্রদায়কে পাশ কাটিয়ে জাতিসংঘে বার বার মিয়ানমারের সাফাই গেয়ে মানবাধিকারের বিপে অবস্থান নিয়ে বর্বর জাতিগত নিধনকেই বৈধতা দিচ্ছে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থেই (প্রধানত অস্ত্র বিক্রি ও খনিজ সম্পদে বিপুল বিনিয়োগ) বাংলাদেশের বন্ধু হয়েও রাশিয়া ও চীন জাতিসংঘে প্রকাশ্যে মিয়ানমারের প নিয়েছে। এই দুই দেশের প্রকাশ্য আশকারায় মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং ফ্রান্সসহ বিশ্বের অন্যান্য অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের অনুরোধ কানেই তুলছে না।
বছরকয়েক আগে দারিদ্র্যপীড়িত মিয়ানমার সামরিক শাসনের কবলে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশ এবং ইইউসহ কয়েকটি দেশ ও সংগঠনের অবরোধের মুখে পড়ে। একই সময়ে দেশটির চীন সীমান্ত সংলগ্ন পূর্বাঞ্চলে প্রায় ৩০টি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীর সশস্ত্র আন্দোলন দমন করতে নাস্তানাবুদ হচ্ছিল দেশটির সামরিক সরকার। ঠিক এমন সময়ে বড় ভাইয়ের ছায়া দিতে হাত বাড়ায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীন। পরবর্তী সময়ে মিয়ানমারে একের পর এক বড় বড় বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তি সহায়তা, অস্ত্র বিক্রয়, সামরিক বাহিনীর প্রশিণ ইত্যাদি প্রদান করতে থাকে চীন। ফলে চার দশক ধরে চলা আন্তর্জাতিক অবরোধের থোরাই কেয়ার করতে শুরু করে মিয়ানমার।
মিয়ানমারে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। বলা হয় এর পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সবগুলো পশ্চিমা দেশের মোট বিনিয়োগের দ্বিগুণেরও বেশি। তবে মিয়ানমারে চীনের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ কৌশলগত কারণে গোপন রাখা হয়। শুধু গোলযোগপূর্ণ রাখাইনের সিটওয়ে শহরের শয়ে গ্যাস েেত্রর গ্যাস সঞ্চালন (শয়ে থেকে কুনমিং হয়ে চীনের গোঞ্জেহ প্রদেশ) পাইপ লাইন নির্মাণ ও তার নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করেছে ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার। আর মিয়ানমারে চীনের এসব বিনিয়োগের সার্বিক দায়িত্বে রয়েছেন স্বয়ং মিয়ানমারের সেনাপ্রধান। জানা যায়, সব মিলিয়ে রাখাইনেই ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার প্রকল্প নিয়েছে চীন।
অপরদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে ভøাদিমির পুতিন দেশটির শাসনভার গ্রহণ করার পর তার দেশকে মতার দিক দিয়ে সোভিয়েত যুগে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবেই রাশিয়া মিয়ানমারমুখী হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১৫ সালে মিয়ানমারের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক অবরোধ উঠে গেলে দেশটিতে বিনিয়োগ ও অস্ত্র বিক্রির উদ্যোগ নেয় রাশিয়া। ওই বছরই ৩০ বছর ধরে মিয়ানমারের অস্ত্র বাজারে চীনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে ভাগ বসায় রাশিয়া। সামরিক বাহিনী আধুনিকীকরণে দেশটি রাশিয়া থেকে মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান, দূরপাল্লার মিসাইল, গানশিপ, হেলিকপ্টার, গান সিস্টেম, এন্টিট্যাংক ইত্যাদি ক্রয় করেছে।
রাশিয়া শুধু মিয়ানমারের অস্ত্রের বাজারের দিকেই নজর দিয়েছে এমন নয়, বরং অর্থসহায়তা (বিনিয়োগ) ও প্রযুক্তি রপ্তানির দিকেও মনোযোগ দিয়েছে। এ ল্েয রাশিয়া মিয়ানমারে দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির চুক্তি করে ২০১৩ সালে, যার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এছাড়া দেশটির বিপুল খনিজ সম্পদ (বিশেষ করে তেল ও গ্যাস) আহরণে রাশিয়া ইতোমধ্যে মিয়ানমারে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া রাশিয়ার সরকার মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে উচ্চতর প্রশিণ দিচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। ফলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করার প্রতিযোগিতায় রাশিয়া কিছুতেই পিছিয়ে যাচ্ছে না।
ফলে অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণে রাশিয়া ও চীন যতদিন মিয়ানমারের পাশে থাকবে, ততদিন রোহিঙ্গাদের নিয়ে সীমাহীন সমস্যায় থাকবে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছেÑ সে চুক্তিকেও বাস্তবায়িত হতে দেবে না এই দুই দেশ। কারণ রাশিয়া ও চীন উভয়েই চায় মুসলমানমুক্ত আরাকানে বিনিয়োগ করতে। দেশ দুটির চাওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়েই মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালিয়ে প্রায় সব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে বিতাড়িত করেছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশের পাশে থাকলেও রাশিয়া ও চীনের কারণেই সংস্থাটি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চরম কোনো ব্যবস্থায় যেতে পারছে না।