প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

পুলিশ সপ্তাহ-২০১৮ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : জবাবদিহিতার আওতায় থেকে পুলিশকে জনবান্ধব হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালনের আহ্বান


এম নিজাম উদ্দিন : ৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে পুলিশ সপ্তাহ ২০১৮ শেষ হয় ১২ জানুয়ারি। পুলিশ সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্স রাজারবাগে পুলিশ সপ্তাহ-২০১৮ উদযাপন উপলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহিতার আওতায় থেকে জনবান্ধব হয়ে আইনশৃঙ্খলা রার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সপ্তাহ-২০১৮ উপলে মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন এবং একটি খোলা জিপে করে প্যারেড পরিদর্শন করেন। সুপারিনটেন্ডেন্ট অব পুলিশ মহসিন হোসেন প্যারেড পরিচালনা করেন। ‘জঙ্গিবাদ মাদকের প্রতিকার, বাংলাদেশ পুলিশের অঙ্গীকার’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে এবারের পুলিশ সপ্তাহ উদযাপিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ জানুয়ারি রাজারবাগ প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক এবং স্বরাষ্ট্র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন তাঁকে স্বাগত জানান। মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদ সদস্য এবং সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ১৮২ জনকে ৪টি ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (সাহসিকতা), রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (সাহসিকতা), বাংলাদেশ পুলিশ পদক (সেবা) ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (সেবা) প্রদান করেন। এর মধ্যে মরণোত্তর বাংলাদেশ পুলিশ পদক সাহসিকতার জন্য সিলেটের আঁতিয়া মহলে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ, ইন্সপেক্টর মো. মনিরুল ইসলাম এবং ইন্সপেক্টর কায়সরের পে তাদের সহধর্মিণীগণ প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে এই পদক গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ সদস্যদের নিজেদেরকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলে আইনশৃঙ্খলা রার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পুলিশকে আমি সবসময় আইনের রকের ভূমিকায় দেখতে চাই। দেশের প্রচলিত আইন, সততা ও নৈতিক মূল্যবোধই হবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পথনির্দেশক। আপনাদের মনে রাখতে হবে সফলতার জন্য আপনারা যেমন পুরস্কৃত হবেন, তেমনি প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহিও করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এ দেশের মাটিতে জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধীদের স্থান হবে না। আমরা জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ বিস্তার রোধে তৃণমূল পর্যায়ে পরিবার, নারী, যুবসমাজ, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি। একজন সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। পুলিশ সদস্যদের নিজেদেরকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলে আইনশৃঙ্খলা রার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ যত সমৃদ্ধ হবে, দেশকে আমরা ততো উন্নত করে করে তুলতে সম হবো। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমরা বাংলাদেশকে ুধা-দারিদ্র্যমুক্তভাবে গড়ে তুলব। কারো কাছে হাত পেতে নয়, মাথা নত করে নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি হিসেবে আমরা মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে চলতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশা করি, প্রতিটি পুলিশ সদস্য অসহায় ও বিপন্ন মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করবেন এবং সাহায্যের হাত বাড়াবেন। জাতির পিতা আপনাদের বলেছেন, আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ। জনগণের প্রতি আপনাদের কর্তব্য অপরিসীম। তাই আপনাদের নিজেদেরকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, ইতোমধ্যে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে ‘আইজিপি কমপ্লেইন সেল’ স্থাপন করা হয়েছে, যা পুলিশ সদস্যদের পেশাগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
মিয়ানমার থেকে আগত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসনে পুলিশের দতার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিককে আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদানে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। এসময় বাংলাদেশ পুলিশের দতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের তথ্যও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে নতুন পদ সৃজন এবং পুলিশের জনবল বৃদ্ধিতে তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, পুলিশের আবাসন, রেশন, চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি, প্রশিণ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় যানবাহন ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহের বিষয়টিও আমাদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। পুলিশের জন্য স্টাফ কলেজও আওয়ামী লীগ সরকারই করেছে। পুলিশের সার্জেন্ট পদে নারী সদস্য নিয়োগসহ সুযোগ-সুবিধা এবং পদমর্যাদা বৃদ্ধিতে তাঁর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগও প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত ও জোরদারের ল্েয আমাদের সরকার বিশেষায়িত ‘গার্ড অ্যান্ড প্রটেকশন পুলিশ’ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সেই সঙ্গে সারাদেশে মেট্রোপলিটন সিটিগুলোতে বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো বাড়ানোসহ নতুন থানা ও ইউনিট গঠন অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ পদক ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদকে ভূষিতদেরকেও তাঁর ভাষণে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ পদক আপনাদের কাজের স্বীকৃতির পাশাপাশি আপনাদেরকে ভবিষ্যতে আরও পেশাদারিত্ব এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করবেÑ এটাই আমার প্রত্যাশা।
বক্তৃতার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, কারা অভ্যন্তরে নিহত জাতীয় চারনেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং সম্ভ্রমহারা ২ লাখ মা-বোনকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে জাতির পিতার উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনাকারী পুলিশ সদস্যদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তারপর ধ্বংসাত্মক কর্মকা- দমনে পুলিশের দতার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৩ সালে গণতন্ত্রবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, জনবিচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বিএনপি-জামায়াত ও তাদের সহচররা হরতাল-অবরোধের নামে নৈরাজ্য এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছিল। ২০১৪ ও ২০১৫ সালেও দেখেছি তাদের সেই ধ্বংসযজ্ঞের রূপ। আমি মনে করি, পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সেই অবস্থার মোকাবিলা করেছিল। এ কাজ করতে গিয়ে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ২৭ জন পুলিশ সদস্য জীবন বিসর্জন দিয়েছে। তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে সাহসিকতা ও সেবামূলক কাজের জন্য ১৮২ জনকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) এবং রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) পরিয়ে দেন। পদক পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এত বিপুলসংখ্যক পুলিশ পদক অতীতে কোনো বছর দেয়া হয়নি। এবার আপনারা অত্যন্ত দতার সঙ্গে স্ব স্ব স্থানে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে জঙ্গি দমনে। সে কারণেই এ পদক প্রদান। প্রধানমন্ত্রী অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তাদের প্রতিটি কাজে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথাও বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দতার সঙ্গে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে সম হয়েছি। ২০১৬ সালে গুলশান ও শোলাকিয়ার জঙ্গি হামলার পর বাংলাদেশ পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততায় জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক শক্তি ভেঙে দিতে সম হয়েছে। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ৬ জন পুলিশ, ১ জন র‌্যাব ও ১ জন ফায়ার সার্ভিস সদস্য নিহত হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগ দেশবাসী শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।
জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদকে দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নে ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ চিহ্নিত করে তিনি বলেন, সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। ইসলাম শান্তির ধর্ম। মানুষ হত্যা করে বেহেশতে যাওয়া যাবে না। দেশের সর্বস্তরের নাগরিকদের জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশের মাটিতে জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধীদের স্থান হবে না। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে পুলিশের সমতা বাড়ানোর ল্েয ‘পুলিশের অ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট’ গঠন করার কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি, নবগঠিত অ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূল এবং মদদদাতাদের আইনের আওতায় আনতে কার্যকর ভূমিকা অব্যাহত রাখবে। এসময় প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি পরিবারকে তাদের সন্তানদের খোঁজখবর রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে পুলিশ বাহিনীতে অন্যান্য বাহিনীর মতো মেডিকেল কোর গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দরবারে (পুলিশ কল্যাণ প্যারেড) প্রধানমন্ত্রী এ পরামর্শ দেন। পুলিশ সপ্তাহ-২০১৮ উদ্বোধন শেষে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে নবনির্মিত পুলিশ অডিটোরিয়ামে এ দরবার অনুষ্ঠিত হয়। এক ঘণ্টাব্যাপী এ অনুষ্ঠানে কনস্টেবল থেকে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ৫ জন সদস্য ৫টি বিষয় উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী এসব প্রশ্নের জবাব দেন। দরবারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক। তবে মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও স্বরাষ্ট্র সচিব উপস্থিত থাকলেও তারা কোনো বক্তব্য রাখেননি। পুলিশ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাঘে ছুঁলে এক ঘা, পুলিশের ছুঁলে দশ ঘাÑ প্রচলিত এ ধারণা পরিবর্তন করে পুলিশকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।