প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম : পারস্পরিক স্বার্থ ও উন্নয়ন অভিযাত্রায় একযোগে কাজ করবে তুরস্ক-বাংলাদেশ

হাফিজ আহমেদ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম ১৯ ডিসেম্বর দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন অভিযাত্রায় একযোগে কাজ করা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছেন। দুই নেতা মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ ভূমিতে ফেরত পাঠানোসহ দ্বিপীয় ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিষয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার এবং পরস্পরকে সমর্থন করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) এক দ্বিপীয় বৈঠক শেষে পৃথক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, শিামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রমুখ। তুরস্কের পে ছিলেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও তুর্কি-বাংলাদেশ যৌথ কমিশনের কো-চেয়ার বেকির বোজাগ ও বাংলাদেশে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত ডেভরিম ওজতুর্ক প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় তুরস্ক পাশে থাকবে। তিনি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের প্রতি অব্যাহত সমর্থনের জন্য তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানকে ধন্যবাদ জানান।
তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম বলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে খুবই সুদৃঢ় ও ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্কের গণতন্ত্র ও সরকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনের কথা তুরস্ক ভুলে যায়নি।
শেখ হাসিনা বলেন, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দ্বিপীয় ও অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ইস্যুতে খুবই ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। ‘আমরা মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ ভূমিতে ফেরত পাঠানোসহ দ্বিপীয় ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিষয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার এবং পরস্পরকে সমর্থন করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরা, শিা, পর্যটন ও যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ েেত্র দুই দেশের সহযোগিতা সংহত করার ব্যাপারেও তিনি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দুই দেশের মধ্যে স্বারিত সমঝোতা স্মারকগুলো ুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), শিল্প উৎপাদন, স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন, সামর্থ্য বিনির্মাণ, জ্ঞান বিনিময় ও দতা উন্নয়নের েেত্র সহযোগিতা জোরদারে সহায়ক হবে। শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের জন্য বিনালি ইলদিরিমকে ধন্যবাদ জানান।
২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার জন্য বর্তমান সরকারের ল্েযর প্রশংসা করে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই উন্নয়নের অংশীদার হতে তার দেশ প্রস্তুত রয়েছে। তুর্কি প্রধানমন্ত্রী সংকট কাটিয়ে না ওঠা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘকে বাংলাদেশের পাশে থাকার আহ্বান জানান। তিনি মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তায় বাংলাদেশের প্রতি তুরস্কের অব্যাহত সমর্থনের আশ্বাস দেন। তিনি জেরুজালেম ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং এই ইস্যুত ওআইসির বিশেষ সম্মেলনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির উপস্থিতির ভূয়সী প্রশংসা করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম-এর মধ্যে দ্বিপীয় আলোচনার পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে বলা হয়, অত্যন্ত আন্তরিক ও উষ্ণ পরিবেশে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকের আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দ্বিপীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী গার্মেন্টস পণ্যে অতিরিক্ত শুল্কসহ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাধা প্রত্যাহারে তুর্কি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান। দেশে ফেরার পরে এ বিষয়টি দেখবেন বলে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, তুরস্কের বিনিয়োগকারীরা বিশেষ অর্থনৈতিক জোনে বিনিয়োগে সম্মত হলে তাদের জন্য ভূমি বরাদ্দ দিতে বাংলাদেশ সরকার প্রস্তুত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশি কিছু পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা এবং দুই দেশের মধ্যে স্বারের অপোয় থাকা অবাধ বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
জবাবে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী আগামী বছরের এপ্রিলে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিতব্য দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের বৈঠকে এই ইস্যুতে আলোচনায় সম্মতি ব্যক্ত করেন। বৈঠকে তুরস্ক-বাংলাদেশ আন্তঃপার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়।
শেখ হাসিনা তুর্কি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন যে, মানবিক বিবেচনায় মিয়ানমারের ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে এবং প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক বিনষ্ট না করেই বাংলাদেশ এই ইস্যুর সমাধান চায়। এ প্রসঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরাতে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপীয় চুক্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি এই ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর অব্যাহত চাপ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রধানমন্ত্রী ভাষাণচরে রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় গৃহ ও হাসপাতাল নির্মাণে তুর্কি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান।
এর আগে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকা ও আঙ্কারা দুইটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বার করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপীয় আলোচনা শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়। সমঝোতা স্মারকের একটি হচ্ছে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা প্রদান এবং অপরটি হচ্ছে ুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারে সহযোগিতা বৃদ্ধি। ুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়ন সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে স্বার করেন এসএমই ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম ও কেওএসজিইবির (তুরস্কের ুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়ন সংস্থা) প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. গভাহির উজকার্ট। অন্যদিকে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ সহযোগিতা বিষয়ক স্মারকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের মহাপরিচালক সরদার আবুল কালাম ও তুরস্কের স্ট্যান্ডার্ড ইনস্টিটিউশনের প্রেসিডেন্ট সেবাহিট্টিন কোরকনাজ স্বার করেন।