প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

ফেনীর মহিপালে ৬ লেন ফাইওভারের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : আধুনিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত হলো নতুন মাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৬ লেন ফাইওভার যুক্ত হয়েছে। রাজধানী বা বন্দরনগরীর বাইরে একটি জেলাশহরে দেশের প্রথম ও একমাত্র ৬ লেনের ফাইওভার চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে আবারো প্রমাণিত হলো বর্তমান সরকার রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশে একটি আধুনিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। ফেনীর মহিপালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কারিগরি নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে নির্মিত ৬ লেনের ফাইওভার রাজধানী ও বন্দরনগরীর কানেকটিভিটিকে আরো সহজ করেছে। এই ফাইওভারের নিচ দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইন। ফাইওভার হওয়ার আগে ট্রেন চলাচলের কারণে দিন-রাত মিলে অসংখ্যবার সড়ক পরিবহনের গতি থেমে যেত। ফলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে বা আসতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অন্তত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় বেশি লাগত। ৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ৬ লেনের এই ফাইওভারটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে যাত্রীসাধারণ সড়কপথে মাত্র সাড়ে ৫ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে বা আসতে পারছে। পণ্যবাহী লরি, কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাক ৬ থেকে ৮ ঘণ্টায় রাজধানী থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে পৌঁছে যাচ্ছে।
ফাইওভারটি উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী আন্তঃজেলা পরিবহন যাত্রীদের কাছে মহিপাল একসময় একটি দুঃখের স্থান ছিল উল্লেখ করে বলেন, এই এলাকার যানজটে সকলকেই ভোগান্তি পোহাতে হত। সেই ভোগান্তি লাঘবের জন্যই এই ফাইওভারটি করা হয়েছে।
এই ফাইওভারটি ফেনী হয়ে ঢাকা, কুমিল্লা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, পার্বত্য জেলাসমূহ, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, বরিশাল, ফরিদপুর, সিলেট অঞ্চলে যাতায়াতকারী বিভিন্ন যানবাহন নিয়মিত যানজটের কবল থেকে মুক্তি পাবে, স্বস্তি পাবেন যাত্রীরাও।
যদিও ৬ লেনের এই ফাইওভারের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ৩০ জুন। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রকৌশলীদের সম্পৃক্ততার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফাইওভারটির নির্মাণ কাজ শেষ হয় এবং যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে।
ফেনীর মহিপাল ফাইওভার ছয় লেনের হলেও সেতুর নিচের দুই পাশে আরো ৪টি সার্ভিস লেন চালু থাকছে। সে হিসাবে উপরে-নিচে মিলিয়ে মোট লেন সংখ্যা ১০টি। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ১৮১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল। এর মূল দৈর্ঘ্য ৬৬০ মিটার, প্রস্থ ২৪ দশমিক ৬২ মিটার, সার্ভিস রোডের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৩৭০ মিটার, সার্ভিস রোডের প্রস্থ ৭ দশমিক ৫ মিটার, সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৬০ মিটার, ১১টি স্প্যান, ফুটপাতের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২১০ মিটার, পিসি গার্ডার ১৩২টি।
৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ফেনীর মহিপালের ৬ লেন ফাইওভার উদ্বোধনকালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক শুভেচ্ছা বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের বলেন, ৬ লেনের এই ফাইওভারটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হওয়ায় এর নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়ের ছয় মাস আগেই সম্পন্ন হয়েছে। এজন্য সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডকে ধন্যবাদ জানান।
এদিকে ৬ লেনের এই ফাইওভারটি নির্মিত হওয়ায় উচ্ছ্বসিত ফেনীবাসীও। ফেনী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজ আহম্মদ চৌধুরী জানান, মহিপালে ৬ লেনের ফাইওভারটি বর্তমান সরকারের একটি যুগান্তকারী কাজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশব্যাপী যে উন্নয়নমূলক কর্মকা- চালাচ্ছেন এটি তার অন্যতম কাজ। ফেনীবাসী তার এই কাজে দারুণ খুশি, তারা উন্নয়নের এই নেত্রীকে অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। আজিজ আহম্মদ চৌধুরী আরো বলেন, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে আমরা ফেনীর মানুষই মনে করি, তিনিও ফেনীকে তেমনই ভালোবাসেন, তাই বারবার ছুটে আসেন ফেনীর উন্নয়নে। ফাইওভার নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের আন্তরিকতা কথা তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি বলেন, মহিপালের প্রবেশপথ চাঁড়িপুর রাস্তার মাথা থেকে মহাসড়কের ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ অফিস পর্যন্ত নির্মিত এই ফাইওভারটির কাজের মান বেশ উন্নত। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়কের সংযোগস্থল মহিপালে বৃহৎ এ ফাইওভার চালু হওয়ার পরে মহাসড়কে যানজট অনেকাংশে কমে গেছে। এতে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, ফেনীর ব্যবসাবাণিজ্যেও উন্নয়নের দ্বার খুলেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম অনুষ্ঠানে ভিডিও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে ৬ লেন ফাইওভার প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আরো ২টি প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এর একটি হলো ‘নোয়াখালী খাল খনন প্রকল্প’ এবং অন্যটি হলো ‘র‌্যাপিড পাস’ কার্যক্রম। র‌্যাপিড পাস কার্যক্রমটি উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিআরটিসি কর্মকর্তা এবং যাত্রীদের সঙ্গেও কথা বলেন।
জাপানের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা-জাইকার আর্থিক সহায়তায় ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি-ডিটিসিএ র‌্যাপিড পাস প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আমরা যে ব্যবস্থা করেছি সেটা হচ্ছে র‌্যাপিড পাস। এরজন্য বাসে উঠে আর টাকা বের করতে হবে না। কার্ডটা থাকলেই হবে। ভবিষ্যতে এই কার্ডের মাধ্যমে জনগণ তাদের বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসসহ নানা ইউটিলিটি বিল দিতে পারবেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ভবিষ্যতে উন্নত দেশের মতো ভ্রমণ, শপিংসহ নানা সুযোগ সুবিধা জনগণ যেন কার্ডের মাধ্যমে পেতে পারে সে ব্যবস্থাও করা হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটিতে সহযোগিতার জন্য এবং বাংলাদেশে পরিচালিত সকল প্রকল্পের জন্য জাপান সরকার এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত জাপান সরকারের প্রতিনিধিকে ধন্যবাদ জানান। প্রথমবারের মতো ই-টিকিটিংয়ের মাধ্যমে এ দিন যাত্রা শুরু করা বিআরটিসির মতিঝিল টু নবীনগরগামী যাত্রীদের সঙ্গে এসময় প্রধানমন্ত্রী মত বিনিময় করেন। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সেনাবাহিনী প্রধান জেলারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক এবং জাপান সরকারের প্রতিনিধি মাসাতো ওয়াতানাবে এসময় গণভবনে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
৩২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘নোয়াখালী খাল খনন প্রকল্প’ উদ্বোধন করে শেখ হাসিনা বলেন, নোয়াখালীবাসীর ‘দুঃখ’ নোয়াখালী খাল। সেই ‘দুঃখ’ মোচন হতে যাচ্ছে।
জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় নোয়াখালী খাল খননের কাজ তদারকি করবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নোয়াখালী খাল ও সংযুক্ত খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই এখানকার অনেক এলাকা ডুবে যায়। জলাবদ্ধতা লেগেই থাকে। ফসলি জমি জোয়ারের পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। আর এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নোয়াখালী জেলা সদর, সুবর্ণচর, সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও বেগমগঞ্জের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে। কৃষির উৎপাদন বাড়বে। নদীভাঙন রোধ হবে। ফসলিজমি জোয়ারের ক্ষতি থেকে রা পাবে। সর্বোপরি মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে।
নোয়াখালী-৪ আসনের (সদর-সুবর্ণচর) সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘২০০৮ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়ে এ সমস্যা সমাধান করার অঙ্গীকার করি। সেই থেকে আমাদের নেতা ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমাধানের চেষ্টা করে যাই। অবশেষে আমাদের সেই দুঃখ মোচন হচ্ছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নোয়াখালীবাসী কৃতজ্ঞ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের আওতায় নোয়াখালী খাল, বরোপিট খাল, আলগীর খাল ও বামনী নদী পুনঃখননের পাশাপাশি শাখা খালগুলো যেমন দেবীপুর খাল, দত্তের খাল, রমজান বিবি খাল, কালামুন্সি খাল, গাবুয়া খাল, চৌমুহনী খাল, সায়েরা খাল, চাপরাশির খাল, বাদামতলী খাল, বাড়া খাল, বাঞ্ছারাম খাল, মহিষমরা খাল, কবিরহাট খাল, ভানুবিবির খাল ও ছাগলমারা খাল পুনঃখনন করা হবে। এছাড়া বামনী নদীতে কোজার ও রেগুলেটর নির্মাণ করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের আওতায় জেলার প্রধান প্রধান খাল খননের পাশাপাশি প্রায় ১৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকার ২৩টি খাল পুনঃখনন, প্রকল্প এলাকায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ রোধে বামনী নদীর চরলেংটায় ১৯ ভেন্ট ও ২ ভেন্ট রেগুলেটর, ১১.৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এবং ১০টি নদীর তীর সংরণ ও ছোট ফেনী নদীর ওপর ক্রসড্যাম নির্মাণ করা হবে। আর এটি বাস্তবায়িত হলে ১৬ হাজার হেক্টর জমি চাষযোগ্য হবে। ফলে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন করা যাবে। জেলার জলাবদ্ধতা দূর হবে, সন্দ্বীপ চ্যানেলের ভাঙনরোধ করে জনসাধারণের বাড়িঘর, স্কুল, মসজিদ, সাইকোন শেল্টার, আবাদি জমি, ফসল ও জানমাল রা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সামুদ্রিক জোয়ার জলোচ্ছ্বাসের হাত হতে এলাকার জনগণ রা পাবে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নোয়াখালী সফরে এলে স্থানীয় হাউজিং মাঠের জনসভায় দলমত নির্বিশেষে সবাই তাঁর কাছে নোয়াখালী জেলাধীন বিভিন্ন খাল খনন করে জেলার জলাবদ্ধতা দূর করার জোর দাবি জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী খাল খননসহ আনুষঙ্গিক কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নোয়াখালী জেলার জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে প্রয়োজনীয় পদপে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় নোয়াখালীবাসীর দুঃখ মোচনের কাজ শুরু হয়েছে এ বছরের ৪ জানুয়ারি থেকে।