প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

বিজিবি দিবস-২০১৭ উপলে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : সীমান্ত রায় জাতির আস্থার ঠিকানা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ

এম নিজাম উদ্দিন : সদর দপ্তরে পতাকা উত্তোলন এবং সীমান্ত গৌরব এ মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে ২০ ডিসেম্বর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি দিবস পালিত হয়েছে। বিজিবি দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং সালাম ও অভিবাদন গ্রহণ করেন। এবারের বিজিবি দিবসে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা উন্নয়নের নিদর্শনস্বরূপ প্রথমবারের মতো ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তরী বাহিনীর প্রতিনিধি দল বিজিবি দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ভারতীয় সীমান্তরী বাহিনী বিএসএফ মহাপরিচালক শ্রী কৃষাণ কুমার শর্মার নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল এবং মিয়ানমারের সীমান্তরী বাহিনী বিজিপির কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মায়ইন্ট তোয়ের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল বিজিবি দিবসের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবারের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজিবিতে বীরত্বপূর্ণ ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য কর্মকর্তা ও সদস্যদের পদক প্রদান করেন। এবার ৪ ক্যাটাগরিতে পদক দেয়া হয় ৬০ বিজিবি সদস্যকে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পদক পেয়েছেন ১০ জন, রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক পেয়েছেন ২০ জন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পদক (সেবা) পেয়েছেন ১০ জন এবং রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক (সেবা) পেয়েছেন ২০ জন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পদকপ্রাপ্তরা নগদ এককালীন ১ লাখ টাকা পেয়েছেন ও মাসিক বেতনের সঙ্গে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে পাবেন। রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পদক (সেবা) প্রাপ্তরা নগদ এককালীন ৭৫ হাজার টাকা পেয়েছেন ও মাসিক বেতনের সঙ্গে ১ হাজার টাকা করে পাবেন। রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক (সেবা) প্রাপ্তরা নগদ এককালীন ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন ও মাসিক বেতনের সঙ্গে ১ হাজার টাকা করে পাবেন।
বিজিবি দিবসে ঢাকার বাইরে সকল রিজিয়ন, বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড কলেজ, সকল সেক্টর ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে মিলাদ ও বিশেষ দোয়া, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উপস্থিতিতে বিশেষ দরবার, বাহিনীর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা, প্রীতিভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
বিজিবি দিবস-২০১৭ উপলে আয়োজিত কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবিকে সীমান্ত রক্ষায় জাতির আস্থার ঠিকানা হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ‘বিজিবির সদস্য হিসেবে আপনাদের পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ, শৃঙ্খলাবোধ, মানবিকতা এবং সর্বোপরি পারস্পরিক সহানুভূতিশীলতাই এই বাহিনীর বন্ধন দৃঢ়তর করবে। কাজেই ভবিষ্যতে সবাই বাহিনীর নিজস্ব শৃঙ্খলার বিষয়টি ভালোভাবে জেনে নেবেন, চর্চা করবেন এবং দেশের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করবেন।’ বিজিবির সদস্য হিসেবে আপনাদের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা প্রশ্নাতীত। সীমান্ত রা, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রা এবং প্রাকৃতিক কিংবা সামাজিক যেকোনো দুর্যোগে বিজিবি জাতির আস্থার ঠিকানা। বিজিবির উন্নয়নে সরকারের সব রকম সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগ বিবেচনায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ একটি গৌরবোজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান। এই বাহিনী ২২২ বছরের ঐতিহ্যম-িত। ১৭৯৫ সালে রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন নামে প্রথম গড়ে তোলা হয় এই বাহিনী। সময়ের ব্যবধান ও ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে নানান নামে দায়িত্ব পালনের পর এখন সীমান্তরী বাহিনী হিসেবে কাজ করছে বিজিবি।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম প্রহরেই এই বাহিনীর সদস্যরা পাকসেনাদের প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পিলখানা থেকে তৎকালীন ইপিআরের বেতার কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়।
শেখ হাসিনা বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, জাতির পিতা ২৩ বছরের সংগ্রামে বাঙালি জাতিকে মুক্তির চেতনায় প্রস্তুত করে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। জাতির পিতার স্বাধীনতার ঘোষণা তৎকালীন ইপিআর প্রচার করায় পাকবাহিনীর হাতে প্রাণ দেন ইপিআর-এর সুবেদার মেজর শওকত আলী। ইপিআর-এর প্রায় সাড়ে ১২ হাজার বাঙালি সৈনিক সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং ৮১৭ জন শাহাদত বরণ করেন। এই বাহিনীর দু’জন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এবং শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ আমাদের গর্বের প্রতীক। ইপিআর-এর ৮ জন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম এবং ৭৭ জন বীর প্রতীক মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করে বিজিবির ইতিহাস সমৃদ্ধ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের সবাইকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ৮ জানুয়ারি পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)-এর প্রথম ব্যাচের শিা সমাপনী কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এ বাহিনীকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে নানামুখী কার্যক্রম হাতে নেয়। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আমরা সরকার গঠনের ১ মাস ১৯ দিনের মাথায় ২৫ ও ২৬ ফেব্র“য়ারি বিডিআর-এ অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে। যা দ্রুত সমাধান করে আমরা নতুন আইন করি। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পুনর্গঠন করি। এসময় তৎকালীন বিডিআর-এর ট্র্যাজিক ঘটনায় শহীদ ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাসহ সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাসী কর্মকা- প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনসাধারণের জান-মাল রায় বিজিবির সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকারও প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসরদের পরিকল্পিত টানা অবরোধে গাড়ি ভাঙচুর এবং চলন্ত গাড়িতে পেট্রোল বোমায় জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যাসহ দেশ অচল করে দেয়ার ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল। আপনারা অকান্ত পরিশ্রম করে তা বানচালে সম হন। সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সমস্যা, মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা, রামুর বৌদ্ধ পল্লীর নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন, পার্বত্য এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং ছিটমহলবাসীকে পুনর্বাসনে আপনাদের পদপে বিজিবির সুনাম ও মর্যাদাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।
এর আগে শেখ হাসিনা বিজিবি সদরদপ্তরে এলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মো. মোস্তফা কামাল এবং বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী বিজিবি সদরদপ্তরের বীর-উত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে বিজিবি দিবস উপলে আয়োজিত মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং সালাম গ্রহণ করেন। এসময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্যারেড কমান্ডার এবং বিজিবির উপমহাপরিচালক মো. জুলফিকার আলী।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, তিনবাহিনী প্রধানগণ, বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ এবং পদস্থ সামরিক ও বেসমারিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বিজিবির উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন পদপে তুলে ধরে বলেন, ভারত এবং মিয়ানমারের মতো সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ অংশেও সর্বমোট ৩ হাজার ১৬৭ কিলোমিটার রিং রোড নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মিয়ানমারে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবির নতুন রিজিয়ন গঠনসহ অতিরিক্ত ২৫ প্লাটুন জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। দ্রুত টহলের ল্েয প্রতিটি বিওপিতে ৪টি মোটর সাইকেলের প্রাধিকার নির্ধারিত হয়েছে। এভাবে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৪০০ মোটর সাইকেল সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া অধিক দূরত্বের বিওপির মধ্যবর্তী স্থানে ১২৮টি বর্ডার সেন্ট্রি পোস্ট (বিএসপি) নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় নারী সংক্রান্ত বিষয়ে দেখাশুনা এবং নারীর মতায়নের জন্য বিজিবিতে নারী সৈনিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।
পরে প্রধানমন্ত্রী বীর-উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে বিজিবি দিবস উপলে আয়োজিত বিশেষ দরবারে ভাষণ দেন। দরবারে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে দেশের সম্পদ কেউ যেন নিজস্ব বিলাসিতার জন্য ব্যবহার করতে বা অন্যদেশে চোরাচালান করতে না পারে। এগুলো জাতির উন্নয়নেই ব্যবহার করতে হবে। রাজনীতিবিদ এবং দেশপ্রেমিক হিসেবে এটি আমাদের দায়িত্ব।’ তিনি বলেন, বিজিবি সদস্যদের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। এসময় প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ আরো আগেই একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতো। বহু রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমরা যুদ্ধ করেই এই দেশ স্বাধীন করেছি; কাজেই কেন আমরা দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে পারব না।
বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন দরবারে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত বর্তমান সরকারের সময়ে বিজিবির প্রভূত উন্নয়ন সাধনের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান। বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ‘আপনার সময়ে বিজিবি সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করায় সেগুলো তাদের মানসিক মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।’
পরে প্রধানমন্ত্রী দরবারে দু’জন বিজিবি সদস্যের প্রশ্নেরও জবাব দেন। বিজিবি মহাপরিচালক এসময় প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট এবং চিত্রকর্ম উপহার দেন।
দরবার শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী বিজিবি দিবস-২০১৭ উপলে কেক কাটেন এবং সীমান্ত পোস্ট থেকে আগত বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।