রাজনীতি

যেকোনো সময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : অল্প কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন, আগাম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলেও তাতে অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তিনি জানিয়েছিলেন, তার দল যেকোনো সময় নির্বাচনে অংশ নিতে তৈরি। আগামী মাসেও যদি নির্বাচন হয় আওয়ামী লীগ তাতে অংশগ্রহণে প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু ওবায়দুল কাদেরের আগাম নির্বাচনের আশা ভেস্তে যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্যে। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সভায় সভাপতি শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাযথ সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। আগাম নির্বাচন যে হচ্ছে না তা স্পষ্ট হয়ে যায় প্রধানমন্ত্রীর আরেক মন্তব্যে। তিনি বলেন, দেশে এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি যে আগাম নির্বাচন দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে আগাম নির্বাচনের উত্তাপ কমে গেলেও চলতি বছরের শেষ নাগাদ যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে এবং তাতে বিএনপি অংশ নিচ্ছেÑ এ বিষয়টি মাথায় নিয়ে সতর্কতার সাথেই এবার নির্বাচনি প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে আওয়ামী লীগ। এসবের ফলশ্রুতিতে দেশজুড়ে নির্বাচনি মহাকর্মযজ্ঞে নামছে আওয়ামী লীগ। আগামী ২৫ জানুয়ারি কক্সবাজারের মাতারবাড়ী সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর তিনি ৩০ জানুয়ারি সিলেট ও ৮ ফেব্র“য়ারি বরিশাল সফরে যাবেন। এছাড়া রংপুরসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলা সফরে যাওয়ারও প্রস্তুতি রয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতির। সবগুলো সফরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনি প্রচারণাকেই গুরুত্ব দেবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার মতো দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফরকে নির্বাচনকেন্দ্রিক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফরকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক ৭ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া স্বদেশ খবরকে জানিয়েছেন, দলের নেতাকর্মীরা আগামী সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই তাদের এলাকায় জনসভা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন। এেেত্র প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক সময়ে যেসব এলাকায় যাননি, সেসব এলাকা সফরের ব্যাপারে ইতিবাচক আগ্রহ দেখিয়েছেন। এজন্য এখন থেকে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে যেসব জেলা ও উপজেলা সফরে যাবেন, সেসব এলাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে জনসভা আয়োজনের প্রস্তুতি থাকবে। প্রধানমন্ত্রী সেই জনসভায় ভাষণ দেবেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্বাচনমুখী এবং দলকে আরও চাঙা করার জন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান বিপ্লব বড়–য়া।
নির্বাচনকেন্দ্রিক চিন্ত-ভাবনা থেকেই দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফরসূচিতে কিছুটা রদবদল আনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ১২ জানুয়ারি থেকে দলের সভাপতিম-লীর সদস্যদের নেতৃত্বে এই সাংগঠনিক সফর শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিশ্ব ইজতেমার কারণে ওই তারিখে সাংগঠনিক সফর শুরু হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের তরফে জানানো হয়েছে, চলতি মাস থেকেই সারাদেশে সাংগঠনিক সফর কর্মসূচি শুরু হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক তার দলের নির্বাচনি প্রস্তুতি নিয়ে বলতে গিয়ে স্বদেশ খবরকে জানান, সারাদেশে ব্যাপক নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করছে আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফরের মধ্য দিয়ে এ প্রস্তুতিতে আরও নতুন মাত্রা যোগ হবে। তিনি আরও জানান, সফর কর্মসূচি চলাকালে তৃণমূল পর্যায়ে দলকে আরও শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক ভুলত্র“টিগুলো সমাধানের চেষ্টা করবেন। বিশেষ করে দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সর্বশেষ অবস্থা জানার উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে আবদুর রাজ্জাক বলেন, সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি আসনের দলীয় এমপিদের অহেতুক সমালোচনা করছেন। এতে প্রত্য ও পরোভাবে দল এবং সরকার তিগ্রস্ত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় নেতারা সফরকালে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করবেন।
এদিকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্ভাব্য সাংগঠনিক সফরকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন দলের শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন নীতিনির্ধারক। তারা বলেছেন, এ সফরকে কেন্দ্র করে সাতটি বিষয়ে দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এনিয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বিশদ আলোচনা হয়েছে। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনে একই এলাকায় দফায় দফায় সাংগঠনিক সফর করার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন এবং সব সফরেই সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- জনগণের সামনে তুলে ধরার নির্দেশনা দেন।
দলীয় প্রধানের দিকনির্দেশনাগুলো কার্যকর করবেন সাংগঠনিক সফরে যাওয়া কেন্দ্রীয় নেতারা। আর এরই মধ্য দিয়ে দলের তৃণমূল পর্যায়ে সর্বশেষ সাংগঠনিক অবস্থা জানা যাবে বলেও নেতারা মনে করছেন। সেইসঙ্গে দলের মনোনয়ন নিয়ে বিভিন্ন আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যকার বিরোধও মিটিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। সাংগঠনিক এ সফর শেষ হওয়ার পর প্রতিটি টিমের প্রধানরা তৃণমূল পর্যায়ে দলের সর্বশেষ অবস্থান তুলে ধরে লিখিত প্রতিবেদন দেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় ৭টি বিষয় রয়েছে। সেগুলো হলো দলীয় এমপিদের জনপ্রিয়তা যাচাই, দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের কার্যক্রম পর্যবেণ, দলীয় এমপিদের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিরোধের চিত্র, দলীয় এমপিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে জড়িত নেতাদের তালিকা, দলের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিবাদের ঘটনা, দলের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রম ঠিকমতো কার্যকর হচ্ছে কি না এবং প্রতিপ রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা পরখ করা।
স্পষ্টতই বোঝা যায়, বাংলাদেশের মাঠের রাজনীতির অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ শেখ হাসিনা নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা থেকেই ৭টি দিকনির্দেশনা ঠিক করেছেন। শেখ হাসিনার এই ৭টি দিকনির্দেশনা দলের কেন্দ্রীয় নেতারা মাঠের রাজনীতিতে প্রয়োগ করতে পারলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনে যে প্রার্থী দেবে তারা জয়ী হওয়ার ব্যাপারে হবেন সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের মতো বড় রাজনৈতিক দলের সব সময়েই যেকোনো সময়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রাথমিক প্রস্তুতি থাকতে হয়। জাতীয় নির্বাচনের আর ১ বছরও বাকি নেই। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের প্রস্তুতিও খারাপ নয়। তবে দলটির প্রধান সমস্যা হচ্ছে সরকারে থাকায় প্রায় প্রতিটি আসনেই আওয়ামী লীগ তথা নৌকার প্রার্থী একাধিক। সব প্রার্থীই দল বা সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের কথা বলার চেয়ে ভোটারের কাছে নিজের কথাই বলছেন বেশি। তারপরও দলীয় বিরোধ নিরসন করা গেলে এবারও আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন।