কলাম

যে কারণে ক্ষমতাকে বিষ মনে করেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী

প্রফেসর ড. অরুণ কুমার গোস্বামী : উপমহাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন রাহুল গান্ধী। ২০১৩ সালে যখন সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন রাহুল গান্ধী সাংবাদিকদের কাছে তাঁর মা সোনিয়া গান্ধীর উদ্ধৃতি দিয়ে ‘ক্ষমতা’কে বিষ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘গত কাল (২০ জানুয়ারি ২০১৩) সকালে আমাকে সবাই অভিনন্দন জানালেন। রাতে মা (সোনিয়া গান্ধী) আমার ঘরে এসে কেঁদে ফেললেন। কারণ তিনি জানেন, ক্ষমতার মধ্যে আসলে বিষ।’ রাহুল তখন আরও বলেছিলেন, ‘ছোটবেলায় যে দুই পুলিশ আমাকে ব্যাডমিন্টন খেলা শিখিয়েছিলেন, তাঁরাই একদিন ঠাকুরমাকে (ইন্দিরা গান্ধী) খুন করলেন।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘সেদিন হাসপাতালে জীবনে প্রথম দেখেছিলাম, বাবা (রাজীব গান্ধী) কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। অথচ আমার দেখা সব থেকে সাহসী মানুষ ছিলেন তিনি। তবু তাকে কাঁদতে দেখলাম সেদিন।’ উল্লেখ্য, রাহুল গান্ধীর চাচা সঞ্জয় গান্ধী নিজে বিমান চালনার সময় দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন।
২০০৫ সাল থেকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে, কখনও ভাট্ট পারসলে কৃষকদের বাড়িতে ঢুকে, কখনও উত্তর প্রদেশের দলিত মহিলা কলাবতীর দাওয়ায় বসে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন তার ভিত্তিতে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেছেন। ২০১৩ সালে সহ-সভাপতি হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার আরো ৪ বছর পরে ২০১৭ সালে এসে ১৩২ বছরের পুরনো দলটির সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেন রাহুল গান্ধী । অর্থাৎ মতিলাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধীর পর বংশানুক্রমিকভাবে দেশসেবা তথা রাজনৈতিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও একনাগাড়ে সরাসরি একযুগেরও বেশি নিজেকে প্রশিক্ষিত করে তুলে প্রায় দেড়শ’ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেন রাহুল গান্ধী।
১৮৮৫ সালে কংগ্রেস যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তখন বর্তমানের স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া এবং ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তান এই তিনটি ভূ-রাজনৈতিক সত্তা ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে একক রাজনৈতিক সত্তা। স্বাভাবিকভাবেই কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনামলের (বর্তমান) বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তবর্গ জড়িত ছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত (বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের) সেন্দিয়া গ্রামের সন্তান অম্বিকা চরণ মজুমদার (১৮৫০-১৯২২) এবং ময়মনসিংহের আনন্দ কুমার বসু ছিলেন অবিভক্ত ভারতের কংগ্রেসের ডাকসাইটে নেতা। ফরিদপুরের অম্বিকাপুর, অম্বিকা ময়দান এবং রাজেন্দ্র কলেজ অম্বিকা চরণ মজুমদারের স্মৃতি বহন করছে। একইভাবে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজও ভারতীয় কংগ্রেসের একসময়ের নেতা আনন্দ মোহন বোসের স্মৃতি ধারণ করে আছে।
অম্বিকা চরণ মজুমদার ১৮৯৯ সালে বর্ধমানে অনুষ্ঠিত বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেছিলেন। এছাড়া ১৯১০ সালে কলকাতা সম্মেলনেও মি. মজুমদার সভাপতিত্ব করেছিলেন। তিনি কংগ্রেসের ৩১তম অধিবেশনেও সভাপতিত্ব করেছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯১৬ সালে অনুষ্ঠিত এই ৩১তম অধিবেশনেই কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যে ঐতিহাসিক লখ্নৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আনন্দ মোহন বোস (২৩ সেপ্টেম্বর ১৮৪৭-২০ আগস্ট ১৯০৬) ছিলেন একজন ব্যারিস্টার। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অতি পরিচিত জন, স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার অন্যতম একজন সদস্য ফনিভূষণ মজুমদার ছিলেন অম্বিকা চরণ মজুমদারের ভ্রাতুষ্পুত্র। অপর দিকে উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজত্বের সময় সবচেয়ে পুরাতন রাজনীতিবিদদের একজন ছিলেন আনন্দ মোহন বোস। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তিনি একজন সিনিয়র নেতা ছিলেন। আনন্দ মোহন বোস বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমানের স্বাধীন বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার) জয়সিদ্ধি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি কেশব চন্দ্র সেনের সান্নিধ্যে এসে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৮৫ সালের ২৮-৩১ ডিসেম্বর বোম্বাই শহরে। এই অধিবেশনের উদ্যোক্তা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম। ভারতীয়দের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কিত ধারণা তুলে ধরে হিউম ১৮৮৩ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের নিকট একটি খোলা চিঠি লিখেন। এর লক্ষ্য ছিল শিক্ষিত ভারতীয়দের জন্য সরকারে একটি বড় অংশীদারিত্ব লাভ করা এবং তাদের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে বেসামরিক ও রাজনৈতিক সংলাপের একটি প্লাটফরম তৈরি করা। হিউম এই উদ্যোগটি গ্রহণ করেছিলেন এবং ১৮৮৫ সালের মার্চ মাসে তিনি এই মর্মে একটি নোটিশ দিয়েছিলেন যে ওই বছরের ডিসেম্বরে পুনে শহরে ভারতীয় জাতীয় ইউনিয়ন-এর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেখানে কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটায় এই অধিবেশনের স্থান পরিবর্তন করে বোম্বাই শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
১৮৮৩ সালে বোম্বাই শহরে আহূত এই সভাটি হিউম আহ্বান করেছিলেন তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের অনুমতি নিয়ে। উমেশ চন্দ্র ব্যানার্জি কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি হয়েছিলেন। প্রথম অধিবেশনে ৭২ জন ডেলিগেট উপস্থিত হয়েছিলেন। প্রতিটি প্রদেশের প্রতিনিধিত্বসহ এই অধিবেশনে ৫৪ জন হিন্দু এবং মাত্র দুইজন মুসলিম; অবশিষ্টরা ছিলেন পার্সি ও জৈন পটভূমির। উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিবর্গের মধ্যে ছিলেন বোম্বাই প্রেসিডেন্সি অ্যাসোসিয়েশন থেকে স্কটিশ আইসিএস অফিসার উইলিয়াম ওয়েড্ডারবার্ন, দাদাভাই নওরোজি, ফিরোজশাহ মেহতা; পুনে সার্বজনীন সভা থেকে গণেশ বাসুদেব যোশি; সমাজ সংস্কারক গোপাল গণেশ আগারকার; বিচারপতি কেটি তেলাঙ্গ, এনজি চন্ডাভারকার, দিশ ওয়াচা, বেহরামি মালাবারই, সাংবাদিক ও কর্মী গুটি কেশব পিল্লাই, এবং মাদ্রাজ মহাজন সভা থেকে পি রাঙ্গাইয়া নাইডু।
দাদাভাই নওরোজি ১৮৮৬ সালে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি ১৮৯২-১৮৯৫ পর্যন্ত ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্সের সদস্য হয়েছিলেন। এসময় কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয় যেসব ব্যক্তিবর্গ ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিন চন্দ্র পাল, লালালাজপাত রায়, গোপাল কৃষ্ণ গোখ্লে এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। জিন্নাহ পরে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
১৯০৫ সালে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে কংগ্রেস একটি গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল, যা পরে স্বদেশী আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে আসেন। এসময় গোপাল কৃষ্ণ গোখ্লে এবং অন্যান্য উদার মনোভাবাপন্ন নেতাদের সহযোগিতায় তিনি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে কংগ্রেস ক্রমান্বয়ে গান্ধীর সঙ্গে সংযুক্ত হতে থাকে এবং তিনি কংগ্রেসের আনঅফিসিয়াল আধ্যাত্মিক নেতা ও আইকন হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯২০ সালে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী খিলাফত আন্দোলনের সঙ্গে একটি জোট গঠন করেছিলেন। এই জোটের লক্ষ্য ছিল তুরস্কের অটোম্যান খিলাফত রক্ষা করা এবং বিক্ষোভের হাতিয়ার হিসেবে বেসামরিক আইন অমান্য বা সত্যাগ্রহের মাধ্যমে ভারতীয়দের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করা। তবে ১৯২৩ সালে চৌড়ি চৌড়ায় কয়েকজন পুলিশের মৃত্যুর পর গান্ধী বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেন। আর এর প্রতিবাদে কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা যেমন চিত্তরঞ্জন দাশ, অ্যানি বেসান্ত এবং মোতিলাল নেহরু প্রমুখ পদত্যাগ করেন এবং স্বরাজ পার্টি গঠন করেন। এভাবে খিলাফত আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায় এবং কংগ্রেস ভাগ হয়ে যায়।
কংগ্রেসে গান্ধীর জনপ্রিয়তা এবং বিপ্লবের অবলম্বন হিসেবে সত্যাগ্রহ’কে বেছে নেয়ার বিষয়টি যেসব কংগ্রেস নেতা সমর্থন করেছিলেন তাঁরা হলেন সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল, পন্ডিত জওয়াহরলাল নেহরু, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ. খান মোহাম্মদ আব্বাস খান, খান আবদুল গাফ্ফার খান, চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী, ড. অনুগ্রহ নারায়ণ সিনহা, জয়প্রকাশ নারায়ণ, জিভৎরাম কৃপালনি এবং মওলানা আবুল কালাম আজাদ। এর ফলে বিদ্যমান জাতীয়তাবাদ, গান্ধীর জনপ্রিয়তা এবং বর্ণভেদ প্রথা ও অস্পৃশ্যতা, দারিদ্র্য এবং ধর্মীয় ও জাতিগোষ্ঠীগত বিভেদ নির্মূল করার লক্ষ্যে কংগ্রেস একটি শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয়। আর যদিও এই সংগঠনটির সদস্যরা বেশিরভাগই হিন্দু কিন্তু অন্যান্য ধর্মাবলম্বী, অর্থনৈতিক শ্রেণি ও জাতিগোষ্ঠী ও ভাষাগোষ্ঠীর মধ্য থেকে এই দলে প্রভাবশালী অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থক ছিলেন।
১৯২৯ সালে জওয়াহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে লাহোরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ বা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনকে কংগ্রেসের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এভাবে ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি ‘পূর্ণ স্বরাজ দিবস’ ঘোষিত হয়। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন পাস হওয়ার পর তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতে ১৯৩৬-১৯৩৭ সালে ১১টি প্রদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এগুলো ছিল মাদ্রাজ, সেন্ট্রাল প্রদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, যুক্ত প্রদেশ, বোম্বে প্রেসিডেন্সি, আসাম, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বেঙ্গল, পাঞ্জাব এবং সিন্ধু। এসব নির্বাচনে অংশগ্রহণের পর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বেঙ্গল, পাঞ্জাব এবং সিন্ধু ছাড়া অবশিষ্ট ৮টি প্রদেশে জয়লাভ করেন। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কোনো প্রদেশেই সরকার গঠন করতে পারেনি। ভারতীয় জনগণের সঙ্গে আলোচনা না করেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতও যুদ্ধমান এই মর্মে ভাইসরয় লর্ড লিনলিথ্গো কর্তৃক ঘোষণা দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেসের মন্ত্রিবর্গ ১৯৩৯ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পদত্যাগ করেছিলেন। এই সময়েই সুভাষ চন্দ্র বোস ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বাছাই করার ব্যাপারে প্রতিবাদ করে ১৯৩৯ সালে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৪৭ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারত ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান নামে দু’টি আলাদা রাষ্ট্র ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস একনাগাড়ে ভারতের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন ছিল কংগ্রেস। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ভারতর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল জওয়াহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। নেহরুর মৃত্যুর পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর নেতৃত্বে কংগ্রেস দলীয় সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এসময় লাল বাহাদুর শাস্ত্রী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরের মন্ত্রী। আর লালবাহাদুর শাস্ত্রী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে ভারত জয় লাভ করেছিল। দুর্ভাগ্যবশত ১৯৬৬ সালের ১১ জানুয়ারি তাশখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরের একদিন পরে লালবাহাদুর শাস্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি।
বলা বাহুল্য, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস দলীয় সরকার ক্ষমতাসীন ছিল। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ছাড়াও অন্যান্য সব দল এবং ভারতের জনসাধারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছিল। ১৯৭৭ সালে জনতা দলের কোয়ালিশনের কাছে কংগ্রেস পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস পুনরায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল। এভাবে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন থাকার পর পুনরায় কংগ্রেস পরাজিত হয়েছিল। ১৯৯১, ২০০৪ এবং ২০০৯ সালে ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স-ইউপিএ কোয়ালিশনের প্রধান হয়ে কংগ্রেস পুনরায় সরকার গঠন করেছিল। কংগ্রেসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী) এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দল।
শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর মোরারজি দেশাইয়ের পরিবর্তে কংগ্রেস নেতারা ইন্দিরা গান্ধীকে নেতা নির্বাচিত করেন। ১৯৬৯ সালে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট এস নিজালিনগাপ্পা কর্তৃক ইন্দিরা গান্ধী দল থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর ইন্দিরা গান্ধী নিজেই কংগ্রেস গঠন করেন। এতে অধিকাংশ কংগ্রেস দলীয় এমপি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস জয়লাভ করে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৫২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন জারিকৃত জরুরি অবস্থা ঘোষণা, এলাহাবাদ হাইকোর্ট কর্তৃক কারচুপির অভিযোগে ১৯৭৫ সালের ১২ জুন ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল ঘোষণা, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, ইন্দিরা গান্ধীর জ্যেষ্ঠ পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর নেতৃত্বে ক্ষমতার অপব্যবহার, ১৯৭৭ সালের ২৩ মার্চ জরুরি অবস্থা সমাপ্তি, ওই মাসের পার্লামেন্টারি নির্বাচনে জনতা পার্টির কাছে কংগ্রেসের পরাজয় এবং ১৯৭৮ সালের নভেম্বরে ইন্দিরা গান্ধী তার হারানো পার্লামেন্টারি আসন পুনরুদ্ধার করেন।
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর দুই দেহরক্ষী সতওয়ান্ত সিং ও বিয়ান্ত সিং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করেছিল। আর ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধী কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসীন হন। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত রাজীব গান্ধী নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৯১ সালের ২১ মে রাজীব গান্ধী আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী কর্তৃক নিহত হন। ১৯৯১ সালের জুন মাসে পি ভি নরসীমা রাও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে রাও পদত্যাগ করেন। এরপর ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের পদ থেকেও রাও পদত্যাগ করেন। এরপর সীতারাম কেসরী কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হন।
রাজীব গান্ধীর বিধাব স্ত্রী ইতালীয় বংশোদ্ভূত সোনিয়া গান্ধী ১৯৯৮ সালে কংগ্রেসের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। এসময় মহারাষ্ট্রের শারদ পাওয়ারের নেতৃত্বে একটি গোষ্ঠী কংগ্রেস থেকে বের হয়ে আলাদা দল গঠন করেন। সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে ২০০৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ইউপিএ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভ করে। ২০১৩ সালে জয়পুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে রাহুল গান্ধীকে সহ-সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল। একনাগাড়ে ১৯ বছর সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন শেষে সোনিয়া গান্ধী তাঁর পুত্র ৪৭ বছর বয়সী রাহুল গান্ধীর নিকট সভাপতির দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন গত ১১ ডিসেম্বর।
ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে রাহুল গান্ধী হলেন কংগ্রেসের ১৬তম প্রেসিডেন্ট এবং নেহরু-গান্ধী ধারার ষষ্ঠতম প্রেসিডেন্ট। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য অন্যান্য সিনিয়র রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও রাহুল গান্ধীকে অভিনন্দিত করেছেন।