খেলা

যোগ্যতার মানদ-ে সাফ চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশের মেয়েরা

ক্রীড়া প্রতিবেদক : নতুন সাজে সেজেছিল কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম। জাতীয় পতাকা হাতে পরিপূর্ণ ছিল দর্শক গ্যালারি। ভুভুজেলার সঙ্গে হাজার-হাজার দর্শকের সমস্বরে চিৎকারে ২৪ ডিসেম্বর যেন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছিল দেশের ফুটবলে। তাদের হতাশ করেননি তহুরা-মার্জিয়ারা। মেয়েদের সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরেই চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। প্রতিযোগিতায় ফেভারিট হিসেবে খেলতে নামা ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে ট্রফি ঘরে তুলে নিয়েছে স্বাগতিকরা। জয়ের নায়ক ডিফেন্ডার শামসুন্নাহার। তার একমাত্র গোলে বাংলাদেশ জিতেছে ফাইনাল। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছ থেকে সোনালি ট্রফি হাতে নেন মারিয়ারা। বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সাফ ফুটবলে সেরা হওয়ার আভাস খেলা শুরু থেকে দিয়েছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। প্রথম থেকে আক্রমণাত্মক খেলতে থাকে তারা। আধিপত্য বিস্তার করে প্রতিপরে ওপর চড়াও হয়েছে। তবে আক্রমণে এগিয়ে থেকেও এবার ১ গোলের বেশি আসেনি। প্রতিপ ভারতের রণভাগ আগের চেয়ে শক্ত করে খেলায় তহুরা-মনিকারা একাধিক গোল বের করে আনতে পারেননি।
প্রথম মিনিটেই মার্জিয়ার ক্রসে গোলরকের হাত ফসকে বল বের হলে তহুরার শট জালে জড়ায়। গ্যালারি উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লেও সেটা বেশিণ থাকেনি। কারণ ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করেন ভুটানের রেফারি চকি ওম। তবে ভেঙে পড়েনি স্বাগতিকরা। সুযোগ পায় কয়েকবার। ৬ মিনিটে মার্জিয়ার বাঁ প্রান্ত থেকে কর্নারে আনুচিং মোগিনির হেড গোলবারের উপর দিয়ে যায়। ১৬ মিনিটে ডান প্রান্তের ক্রসে আনুচিংয়ের হেড চলে যায় পোস্টের বাইরে। আনুচিং ২২ মিনিটে গোলরককে একা পেয়েও তার গায়ে মেরে সুযোগ নষ্ট করেন। তহুরা ভারতের দুজনকে কাটিয়ে বাঁ দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে যান, কিন্তু ৩২ মিনিটে তার নেয়া ওই কোনাকুনি শট শেষ পর্যন্ত ঠিকানা খুঁজে পায়নি। সাইড বার ঘেঁষে বল চলে যায় বাইরে।
এত সুযোগ নষ্ট করা বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত উদযাপনে মাতে ৪১ মিনিটে। ডান দিক দিয়ে আক্রমণে উঠে শামসুন্নাহারের বাড়ানো বলে আনুচিংয়ের শট গোলরক মনিকা দেবীর পায়ে লেগে ফেরে। ফিরতি শটে ডিবক্সে থেকেই টোকা দিয়ে ল্যভেদ করেন শামসুন্নাহার।
বিরতির পর বল নিয়ন্ত্রণে নেয় বাংলাদেশ। কখনো উইং দিয়ে, আবার কখনো কর্নার থেকে গোল ব্যবধান বাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। কিন্তু সফল হতে পারেনি। ৪৬ মিনিটে মার্জিয়ার কর্নারে আনুচিংয়ের হেড গোলবারের উপর দিয়ে যায়। ৫৭ মিনিটে আবারও আনুচিং ব্যর্থ হন ল্যভেদ করতে, ভারতীয় গোলরক মনিকা বাঁ হাত দিয়ে ঠেলে বল বাইরে পাঠান।
ব্যবধান দ্বিগুণ করার দারুণ সুযোগ আবার পায় বাংলাদেশ। ৬১ মিনিটে মার্জিয়া-আনুচিং থেকে তহুরা বল পান, সামনে কেবল ছিলেন গোলরক। কিন্তু সঠিক সময়ে ল্েয শট নিতে পারেননি তিনি।
বাংলাদেশের মুহুর্মুহু আক্রমণে ভারতের রণভাগ ও গোলরক ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে প্রতিপরে সুস্মিতা-বন্যারা অনেক চেষ্টা করেও স্বাগতিক গোলরক মাহমুদা আক্তারকে কঠিন পরীায় ফেলতে পারেননি।
এ নিয়ে ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েদের শিরোপা হলো তিনটি। দুটিই এসেছে এএফসি আঞ্চলিক পর্ব থেকে। ২০১৫ সালে নেপালে ও ২০১৬ সালে তাজিকিস্তানে অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মেয়েরা। এবার তৃতীয় শিরোপা তারা জিতলো সাফের মতো আসরে। স্বাগতিকরা আধিপত্য দেখিয়ে এসেছে এতদূর। এর আগে সাফে রানার্সআপ হয়েছিল গোলাম রব্বানী ছোটনের দল।
সাফের মূল আসরে এই ভারতের কাছে হেরে গত বছর শিলিগুড়িতে শিরোপা জেতা হয়নি বাংলাদেশ জাতীয় দলের। এবার সেই হারের প্রতিশোধ নিলো কিশোরীরা। অপরাজিত থেকে হলো চ্যাম্পিয়ন। লিগে নেপালকে ৬-০, ভুটান ও ভারতকে ৩-০ গোলে হারানোর পর ফাইনালে ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে মেয়েদের সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরেই চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশের মেয়েরা। বাংলাদেশের মেয়েদের এমন একটি সাফল্যের পর সারাদেশেই বয়ে যায় খুশির জোয়ার। ১৬ কোটি মানুষ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে উদযাপন করেছে কিশোরী ফুটবলারদের এ বিজয়ানন্দ।
অসাধারণ এ সাফল্যে যখন সারাদেশ গা ভাসিয়েছে তখন এ থেকে দূরে থাকবেন কেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বড় দুই তারকা মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং সাকিব আল হাসান। নিজেদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে তাই তারা অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছেন বাংলার বাঘিনীদের।
মাশরাফি তার ফেসবুক পেজে বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় অভিনন্দন বার্তা লিখেছেন। সেখানে খুব অল্প কথায় কিশোরী ফুটবলারদের জীবন-সংগ্রামের কাহিনি খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। বাংলায় তিনি লিখেছেন,‘ভারতকে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশ। কত বাধা পাড়ি দিয়ে এসে নিজেকে একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তৈরি করা যায়, তা এ বিজয়ী মেয়েদের জীবনগল্পের প্রতিটি প্যারাতে লেখা।’
সাকিব আল হাসানও দুই ভাষাতেই অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের কিশোরী ফুটবলারদের। অভিনন্দন বার্তায় তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের মেয়েদের অসাধারণ এক শিরোপা অর্জন! মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল দলকে জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন।’
মেয়েদের উল্লাসের ছবি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন মুশফিকুর রহীমও। খুব অল্প কথায় তিনি লিখেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। মেয়েরা, দুর্দান্ত এক সাফল্য, তোমাদের জন্য আমরা গর্বিত।’ ক্রিকেটার নাসির হোসেন তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘হে অপরাজেয় মেয়েরা। সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে তোমরা হয়েছ অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। শুধু তাই নয়, একটি গোলও হজম করতে হয়নি তোমাদের। এ জন্য তোমাদের প্রাণঢালা অভিনন্দন।’
এ প্রসঙ্গে আলাপকালে ফুটবলপ্রেমী সুমি আকন্দ স্বদেশ খবরকে বলেন, যোগ্যতার মানদ-েই সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরেই চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ।