প্রতিবেদন

ষোড়শ সংশোধনী পুনর্বহাল চেয়ে রাষ্ট্রপরে রিভিউ

নিজস্ব প্রতিবেদক : সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ পিটিশন দাখিল করেছে সরকার। রায়ে সংসদ কর্তৃক বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পুনর্বহাল এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান বাতিল চাওয়া হয়েছে। এছাড়া পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা রাষ্ট্র ও সমাজ, রাজনীতিতে ‘আমি ও আমিত্ব’-এর সংস্কৃতি, গণতন্ত্র, নির্বাচন কমিশন, সংসদ ও বিচার বিভাগ নিয়ে যেসব পর্যবেণ দিয়েছিলেন তা এখতিয়ার বহির্ভূত, মূল মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে বাতিল চাওয়া হয়েছে। ২৪ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় ৯৪টি আইনগত যুক্তি তুলে ধরে এ রিভিউ পিটিশন দাখিল করা হয়। এছাড়া ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পে দেয়া রায়ে যেসব পর্যবেণ বিচারপতিরা তুলে ধরেছেন তা-ও প্রত্যাহার চাওয়া হয়েছে।
রিভিউ দাখিলের পর নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আপিল বিভাগের রায়ে যেসব অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য ও পর্যালোচনা এসেছে, তা বাতিল চাওয়া হয়েছে। এছাড়া উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের পূর্বেই ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে, যা অপরিপক্ব বলে মনে হয়েছে। এ কারণে রিভিউ আবেদনে ওই রায় বাতিল চেয়েছি। তিনি বলেন, আশা করি ৯৪টি আইনগত যুক্তি বিবেচনায় নিয়ে আপিল বিভাগ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণ করে ষোড়শ সংশোধনী পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দেবে।
উল্লেখ্য, উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে গত ৩ জুলাই রায় দেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ৭ বিচারপতির বেঞ্চ। পুনর্বহাল করা হয় সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়া সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান। গত পহেলা আগস্ট ৭৯৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে আপিল বিভাগ। রায় প্রকাশের পর পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি সিনহার পর্যবেণ নিয়ে সমালোচনায় সরব হয় সরকারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এমনকি সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সংসদে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং তার কিছু পর্যবেণের বিষয়ে আইনি পদপে নিতে একটি প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের প্রায় ৫ মাস পর তার পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ পিটিশন দাখিল করল সরকার। দাখিলকৃত পিটিশনটি ৯০৮ পৃষ্ঠার।
বিচারপতি সিনহা রায়ে বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে আমরা যে অলঙ্ঘনীয় ঐক্য গড়ে তুলেছিলাম তা শত্রুরা নস্যাৎ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। আজ আমরা একটি মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে বাস করি। অথচ আজ ঔদ্ধত্য এবং অজ্ঞতাকে আমরা প্রশ্রয় দিয়ে চলেছি। কোনো একজন ব্যক্তি দ্বারা কোনো একটি দেশ বা জাতি তৈরি হয়নি। আমরা যদি সত্যিই জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় বাঁচতে চাই, তাহলে এই আমিত্বের আসক্তি এবং আত্মঘাতী উচ্চাভিলাষ থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। এই আমিত্ব হলো কেবল এক ব্যক্তি বা একজন মানুষ সবকিছুই করতে পারেন এমন ভাবনা। আমাদের অবশ্যই এই নোংরা ‘আমাদের লোক’ মতবাদ পরিহার করতে হবে। পরিত্যাগ করতে হবে এই আত্মঘাতী ‘আমি একাই সব’ দৃষ্টিভঙ্গি। এই পর্যবেণ বাতিল চেয়ে রিভিউতে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের একটি অংশ তুলে ধরেছে রাষ্ট্রপ। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার ল্েয ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখ-তা রার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান। এখানে এটা স্পষ্ট যে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা (বাঙালির) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই আদালত রায়ের পর্যবেণে একটি বহুবাচনিক শব্দ ব্যবহার করে ভুল করেছে। আদালতের ওই পর্যবেণ ভিত্তিহীন ও অপ্রত্যাশিত। এটি আমাদের রাজনীতিবিদদের প্রতি একটি অপবাদ, যা এই মামলার বিবেচ্য বিষয় ছিল না। এটা পুনর্বিবেচনা/বাতিলের দাবি রাখে।
আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়, আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সংসদ শিশু অবস্থায় রয়ে গেছে। জনগণ এ দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। এই পর্যবেণ বাতিলের আবেদন জানিয়ে রিভিউতে বলা হয়েছে, এই পর্যবেণ সঠিক নয়। এটা আদালতের বিচার্য বিষয় ছিল না। রাষ্ট্রের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের এ ধরনের মন্তব্য অপ্রত্যাশিত। একইসঙ্গে এটা বিচারিক রীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এছাড়া ‘সংসদীয় গণতন্ত্র অপরিপক্ব। যদি সংসদের হাতে বিচারকদের অপসারণ মতা দেয়া হয় তবে তা হবে আত্মঘাতী’Ñ আপিল বিভাগের এমন পর্যবেণ শুধু অবমাননাকরই নয়, বিচারিক এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে দেয়া হয়েছে বলে রিভিউতে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপ বলছে, রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ অন্য একটি অঙ্গের বিরুদ্ধে এরূপ মন্তব্য করতে পারে না। রায়ে এ ধরনের মন্তব্য করে আদালত ভুল করেছে, যা পুনর্বিবেচনাযোগ্য।
রিভিউতে বলা হয়েছে রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে শৃঙ্খলা নিশ্চিত ও সরকারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ আনয়ন করা হয়। জাতীয় রাজনীতি থেকে দুর্নীতি দূর করতে ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যাতে বিনষ্ট না হয় সেটাই ছিলো এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য। কিন্তু সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদের এই মর্মবাণী অনুধাবন না করেই আপিল বিভাগ বলেছে, এই অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের বেদনাহত এবং অসঙ্গতভাবে তাদের অধিকারকে শৃঙ্খলিত করেছে। তাই সংসদের কোনো ইস্যুতেই তারা দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নিতে পারেন না। আদালতের এই পর্যবেণ ভুল এ কারণে তা বাতিলযোগ্য।
রিভিউতে বলা হয়েছে, ষোড়শ সংশোধনী আনয়নের পর সংবিধানের ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে বিচারকদের অপসারণের জন্য একটি আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছিলো। কিন্তু ওই আইনটি প্রণয়নের পূর্বেই হাইকোর্টে রিট করা হয়। রিটের শুনানিতে রাষ্ট্রপ থেকে যুক্তি দেয়া হয়েছিলো যে এই আইন করার আগেই যে রিট করা হয়েছে তা অপরিপক্ব। কিন্তু হাইকোর্ট এ যুক্তি খারিজ করে দিয়ে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছে। পরবর্তীকালে ওই রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ। এ কারণে রাষ্ট্রপ মনে করে, অপরিপক্ব রিটের ভিত্তিতে দেয়া রায় সংশোধনযোগ্য। কারণ বিষয়টি এমন নয় যে সংসদ সদস্যরা হাত তুললেই বিচারপতি অপসারিত হবেন। অভিযোগের তদন্ত ও বিচারপতিরা আত্মপ সমর্থনের সুযোগ পাবেন।