প্রতিবেদন

সেবার মানোন্নয়নে রেলের বহরে নতুন যুক্ত হচ্ছে ২০ ইঞ্জিন ও ১৫০ কোচ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো ও যাত্রী সুবিধা বাড়াতে দণি কোরিয়া থেকে ২০টি মিটার গেজ রেলইঞ্জিন ও ১৫০টি মিটার গেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কে অনুষ্ঠিত সভায় এ তিনটিসহ মোট ১৬ প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে একনেক। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ১০ কোটি টাকা। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা। সভা শেষে প্রকল্পগুলো সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১১ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা থেকে ৩০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৩ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। মন্ত্রী জানান, এখন থেকে নতুন রাস্তা তৈরির চেয়ে বন্যায় তিগ্রস্ত রাস্তাগুলোকে আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাছাড়া রাস্তা মেরামত বা সংস্কারের সময় মান বজায় রাখতে এলজিইডিকে বিশেষভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
রেলের বহরে নতুন বগি ও ইঞ্জিন সংযোজন বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়েতে ১৮৬টি মিটার গেজ ও ৯৬টি ব্রড গেজসহ মোট ২৮২টি লোকোমোটিভ রয়েছে। মেকানিক্যাল কোড ও ডিজাইন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী লোকোমোটিভগুলোর অর্থনৈতিক মেয়াদ ২০ বছর। যার মধ্যে ১৬৮টি লোকোমোটিভের বয়স ৩০ বছর অতিক্রম করেছে। এছাড়া রেলওয়েতে ১ হাজার ১৬৫টি যাত্রীবাহী মিটার গেজ ক্যারেজ (বগি) রয়েছে। যাত্রীবাহী ক্যারেজের অর্থনৈতিক মেয়াদ ৩৫ বছর। যার মধ্যে ৪৫৬টি যাত্রীবাহী কোচের বয়স ৩৫ বছর অতিক্রম করেছে এবং ১৩৫টির মেয়াদ ৩১ থেকে ৩৪ বছর। যাত্রী চাহিদার কারণে মেরামতের মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ যাত্রীবাহী কোচগুলো ব্যবহার করা হলেও তা আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন আরামদায়ক ও নিরাপদ নয়। তাই ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০টি মিটার গেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ এবং ১৫০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ সংগ্রহ’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। ২০২০ সালের জুনের মধ্যে এসব ইঞ্জিন ও বগি রেলের বহরে সংযুক্ত হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য সর্বশেষ ১ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকার প্রকল্পের বাইরে সারাদেশে ট্রেন যোগাযোগে আড়াই লাখ কোটি টাকার কর্মযজ্ঞ চলছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। যুগান্তকারী এই পদপে কার্যকর হলেই কয়েকটি স্থান ছাড়া প্রায় সারাদেশেই ট্রেনে যাতায়াত সম্ভব হবে। চারটি স্তরে প্রতিটি ৫ বছর মেয়াদি এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। মোট ২৩৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে চলছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এতে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এর মধ্যে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ও পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ, সারাদেশে ডুয়েল গেজ রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ, বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে রেল সেতু নির্মাণ, যমুনা নদীর উপর বাহাদুরাবাদ-ফুলছড়ি এলাকায় আরেকটি রেল সেতু নির্মাণ এবং পদ্মা নদীর উপর আরও একটি রেল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে ২০ বছর মেয়াদি এই মাস্টারপ্ল্যানে।
এ প্রসঙ্গে রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক স্বদেশ খবরকে জানান, প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রতি অর্থবছরে রেল যোগাযোগের উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছেন। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ৪টি ধাপে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহা-উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এই মাস্টারপ্ল্যান সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে সারাদেশে ট্রেনে যাত্রীসেবার মান যেমন বাড়বে তেমনি পণ্য পরিবহনেও অধিক সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০ বছর মেয়াদি এই মাস্টারপ্ল্যান রেলের সেবার মানোন্নয়নে যুগান্তকারী পদপে হিসেবে চিহ্নিত হবে। বর্তমান সরকারের আমলে গত সেশনে যেমন রেলের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের গতিধারায় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছিলেন, তেমনিভাবে আগামী নির্বাচনে বর্তমান সরকার পুনরায় নির্বাচিত হলে রেলের উন্নয়নের গতিধারা আরও ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পাবে। রেলের উন্নয়নে এ মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় মোট ২৩৫টি প্রকল্প রয়েছে। বৈদেশিক সাহায্য ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর এই প্রথম কোনো স্টিল অবকাঠামোর বৃহত্তম রেল সেতু নির্মাণ করল রেল কর্তৃপ। মেঘনা নদীর ওপর তৈরি করা এই দ্বিতীয় ভৈরব সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৮৪ মিটার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিস্তা নদীর ওপর ২১৮ মিটার দৈর্ঘ্যরে তিতাস সেতু। এ দুটি স্টিল কাঠামোর সেতু ও সংযোগ রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৫৯ দশমিক ২০ কোটি টাকা। ২০২০ সালে আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন প্রকল্পের কাজ শেষ হলেই ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে আরও দুই ঘণ্টা সাশ্রয় হবে এবং পুরোদমে এসব সেতুর ফলপ্রসূতা পাওয়া যাবে। গত ৯ নভেম্বর শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই সেতু দুটি উদ্বোধন করেন। ইরকন-এফকনস জেভি এবং গ্যানন এফএলসিএফ কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এই সেতুর ফাউন্ডেশন নির্মাণ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল কনস্ট্রাকশন ইকুইপমেন্ট এই সেতুর ফাউন্ডেশন নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে। এ রুটে ৮৪টি ট্রেন চলাচলে আরও কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে এমন আশা করছেন কর্তৃপ।
নতুন এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইন নির্মাণ, ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনা নদীর ওপর বাহাদুরাবাদ-ফুলছড়ি রুটে আরেকটি রেল সেতু নির্মাণ, ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা নদীর ওপর আরেকটি রেল সেতু নির্মাণ, ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে রেল সেতু নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বৈদ্যুতিক রেলপথ চালু, খুলনা-পার্বতীপুরে ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ, আখাউড়া-সিলেটের মধ্যে ৭ হাজার কোটি টাকায় ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প এই যুগান্তকারী মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এছাড়াও রাজধানীর চারপাশে এলিভেটেড সার্কুলার রেলপথ নির্মাণ, জয়দেবপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ডাবল লাইন রেলপথ, বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ, সান্তাহার-বগুড়া-কাউনিয়া রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প।