কলাম

স্বাধীনতার ৪৬ বছরে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ থেকে ৪৬ বছর আগে ১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে নতুন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ। পাকিস্তানের আগ্রাসী থাবা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নের পথে এগোতে থাকে দেশটি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির প্রধান ল্য ছিল অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো। গত ৪৬ বছরে ধীরে হলেও দেশটি অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ লাখো মানুষ। প্রায় প্রতিটি ঘরেই তখন শোকের মাতম। একই সঙ্গে রাস্তাঘাট, রেলপথসহ অবকাঠামো নষ্ট হয়ে সে এক ধ্বংসস্তূপের বাংলাদেশ। ব্যাংক ও শিল্প খাতেরও একই অবস্থা। অর্থাৎ সবকিছু পেছনে ফেলে নতুন করে শুরু করার প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। এমনই এক চ্যালেঞ্জ সামনে। বাংলাদেশ কতটা মোকাবিলা করতে পেরেছে সেই চ্যালেঞ্জ?
পর্যালোচনায় দেখা যায়, দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ১৯৯৬ সালের প্রথম মেয়াদ এবং ২০০৯ সাল থেকে একটানা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশের সকল স্তরে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। তাছাড়া দেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল প্রকল্প, পায়রা সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ একাধিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে, বেড়েছে মাথাপিছু জাতীয় আয়। এদিকে দ্রব্যমূল্য কিছুটা বাড়লেও মানুষের ক্রয় ক্ষমতাও বেড়েছে বহুগুণ। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের ধারাবাহিকতার কারণে দেশের সার্বিক উন্নয়নও টেকসই হয়েছে। উন্নয়নের সকল সূচকে বাংলাদেশ এখন কেবলই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ও প্রশংসিত। শেখ হাসিনার সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী ইস্যু, বিশ্ব জলবায়ু, রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিন ইস্যুসহ সমসাময়িক আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের এখন উজ্জ্বল ও সক্রিয় ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি তুলনা তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশকে শোষণ-নিপীড়নে নিষ্পেষিত করতে চেয়েছিল যে দেশটি, এখন অনেক কিছুতে তার চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। গত ৪৬ বছরের অগ্রগতিতে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ এখন পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ১ হাজার ৫৩৮ ডলার। সেখানে পাকিস্তানের তা ১ হাজার ৪৭০ ডলার।
স্বাধীনতার পর বিগত ৪৬ বছরে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তিগুলো পাল্টেছে। ক্রমে শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশ হয়েছে, যা অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। স্বাধীনতার সময় জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল প্রায় ৫৯ শতাংশ। আর শিল্পের অবদান ছিল ৬ থেকে ৭ শতাংশ। বর্তমানে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান প্রায় ২৯ শতাংশ। জিডিপির তিনটি খাতের মধ্যে কৃষি খাতের অবদান তৃতীয় স্থানে। সেবা খাতের অবদান শীর্ষে। স্বাধীনতার সময় পাকিস্তানে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ২০ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যমতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ১৭ লাখ। এটি এখন বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। এদিকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নিজেদের আদমশুমারির ফলাফল প্রকাশ করে পাকিস্তান। এতে দেখা যায়, বর্তমানে পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২০ কোটি ৭৮ লাখ। বিশ্বের পঞ্চম জনবহুল দেশ এখন পাকিস্তান। ব্রাজিলকে অতিক্রম করেছে দেশটি। আর এ কারণেই মাথাপিছু জিডিপির হার কমেছে পাকিস্তানের।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। দেশের অর্থনীতির ইতিহাসে এই প্রথম এত উচ্চমাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হলো, যা ছিল নির্ধারিত ল্যমাত্রার চেয়েও বেশি।
তবে স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে দীর্ঘ ২৫ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি বাড়েনি। এর মধ্যে ১৯৭৩-৭৪ থেকে ১৯৭৯-৮০ সময়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র গড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের ১০ বছর জিডিপি বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ হারে। এরপর থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে গেছে ৬ শতাংশ। বর্তমানে জিডিপির আকার ২৪ হাজার ৯৬৮ কোটি ডলার। জিডিপির আকার ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়াতে স্বাধীনতার পর ৩৪ বছর লেগেছে।
উন্নতি হয়েছে মাথাপিছু জাতীয় আয়েও। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৬৭১ টাকা। বর্তমানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ লাখ ২৮ হাজার ৮০০ টাকা বা ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার।
স্বাধীনতার পর যেখানে মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেয়ার লড়াইয়ে নেমেছিল বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশই এখন গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে (বিশ্ব ুধাসূচক) পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে। ২০১৭ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮; যেখানে পাকিস্তানের ১০৬। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন বস্ত্র-কাপড়ের সংকট তৈরি হয়েছিল, সেই দেশই এখন ভারত, পাকিস্তানের চেয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এগিয়ে। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান উৎস এখন তৈরি পোশাক খাত।
এত বছর পরও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এক পণ্যনির্ভর। পাটের বদলে তৈরি পোশাক এসেছে। তবে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য খুব বেশি আনা সম্ভব হয়নি। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের অবদান বাড়লেও পোশাক কারখানার পরিবেশ পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে ভালো নয় বাংলাদেশের। এই অবস্থা থেকে দ্রুত বের হয়ে আসতে হবে বাংলাদেশকে।