প্রতিবেদন

২০১৯ সালে উৎপাদনে যাচ্ছে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র

নিজস্ব প্রতিবেদক : আর মাত্র ১৫ মাসের মধ্যে দেশে নির্মিতব্য কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবার আগে উৎপাদন শুরু করতে যাচ্ছে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীতে নির্মাণাধীন কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদন মতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। দুই ইউনিটের কেন্দ্রটির প্রথমটি আগামী ২০১৯ সালের প্রথমভাগে এবং অপর ইউনিটটি একই বছরের শেষ নাগাদ চালু হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (এনডব্লিউপিজিসিএল) এবং চীনের সিএমসি’র (চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন) উদ্যোগে এবং সমান অংশীদারিত্বে নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে এবং কেন্দ্রটি পরিচালনায় দুই প্রতিষ্ঠানের সমমালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ-চীন পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় ১৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা (২২০ কোটি মার্কিন ডলার)। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। বাকি ২০ শতাংশের সমান জোগান দিবে এনডব্লিউপিজিসিএল এবং সিএমসি। কেন্দ্রটির নির্মাণ ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে চীনের দুই কোম্পানি এনইপিসি এবং সিইসিসি নিয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম।
বিসিপিসিএল’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ধানখালীতে পায়রা বন্দর সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ওই জমির চারপাশে দেয়াল নির্মাণ করে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা (কেপিআই) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্মাণ কাজে জড়িত চীনা কনসোর্টিয়ামের কর্মকর্তা ঝ্যু ইয়ু ইয়ং জানান, প্রকল্পটিতে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৬ হাজার কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেড় হাজার চীনা এবং সাড়ে ৪ হাজার বাংলাদেশি কর্মী। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৩৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম ইউনিটের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের পর টারবাইন এবং জেনারেটর বসানো হবে।
পটুয়াখালীতে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পাইলিং কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৮০০টি সার্ভিস পাইলিং সম্পন্ন হয়েছে। কয়লা মজুদাগারের পিএইচসি পাইলিং কাজ চলছে। প্রথম ইউনিটের বয়লার স্থাপনের জন্য ইস্পাতের কাঠামো নির্মাণের কাজ এগিয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান ভবন, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভবন (সিসিবি), অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ এবং মূলকেন্দ্রের সীমানা প্রাচীর নির্মিত হচ্ছে। কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট পিএএফ, এফডিএফ এবং ইএসপির ভিত্তি নির্মাণ চলছে।
এছাড়া কলাপাড়ার মূল সড়কের সঙ্গে প্রকল্প এলাকা পর্যন্ত একটি সড়ক উন্নয়নের কাজ চলছে। এজন্য কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবহিনীর ডিজেল প্ল্যান্ট। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা আনতে অস্থায়ী জেটি নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। স্থায়ী জেটি নির্মাণের কাজ চলছে। এছাড়া প্রকল্প এলাকার তিগ্রস্ত ১২০ পরিবারের পুনর্বাসন কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এনডব্লিউপিজিসিএল’র ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে জানান, চুক্তিমূল্যের ১৫ শতাংশ অর্থ ইতোমধ্যে ঠিকাদার কোম্পানি এনইপিসি এবং সিইসিসি পরিশোধ করেছে। ঋণের আরেক কিস্তির অর্থ ডিসেম্বর, ২০১৭-এর মধ্যেই আসার কথা রয়েছে। মালিক প্রতিষ্ঠান বিসিপিসিএল ইতোমধ্যে মূলধনের ১৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
এনডব্লিউপিজিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম খোরশেদুল আলম স্বদেশ খবরকে বলেন, ২০১৯ সালের এপ্রিলে কেন্দ্রটির ৬৬০ মেগাওয়াট মতার প্রথম ইউনিট এবং অক্টোবরে দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ এগিয়ে চলছে। আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে উৎপাদিতব্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৮ সেন্ট বা সাড়ে ৬ টাকার মতো দাঁড়াবে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, কেন্দ্রটি থেকে পরিবেশ ঝুঁকি কমিয়ে অপোকৃত পরিচ্ছন্ন কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দেয়া হয়েছে। এটি পুরোদমে উৎপাদনে এলে প্রতিদিন সাড়ে ১২ হাজার টন কয়লা দরকার হবে। প্রাথমিকভাবে ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে কয়লা আমদানি করা হবে। সরকারের যতগুলো বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে সেগুলোর মধ্যে পায়রা কেন্দ্রটি সবার আগে উৎপাদনে আসবে বলে আশা করছি।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, সরকারের বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে রামপালে বিআইএফপিসিএলের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, খুলনায় ওরিয়নের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং পাবনার রূপপুরে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট মতার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে বা নির্মাণ চুক্তি সই হয়েছে। কাজের অগ্রগতি বিবেচনায় বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রথমে উৎপাদন শুরু করবে।
বর্তমানে পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ চললেও অধিগ্রহণকৃত এলাকায় সব মিলিয়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে সরকার। নির্মাণ চলমান কেন্দ্রটির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪০০ একর জমি। বাকি ৬০০ একর জমিতে অবশিষ্ট ৭ হাজার ৬৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নানা ধরনের জ্বালানিভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্র নির্মিত হবে। ইতোমধ্যে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট মতার আরেকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র, ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের এলএনজিভিত্তিক, ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ এবং ৫০ মেগাওয়াট মতার বায়ুভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, পায়রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দেশের দণিাঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদার সিংহভাগ এখান থেকে মেটানো হবে। এজন্য ১ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সাথে আলোচনা চলছে।