প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

৭৫তম বিএমএ লং কোর্সের কমিশনপ্রাপ্তি উপলে আয়োজিত রাষ্ট্রপতি প্যারেডে প্রধানমন্ত্রী : বিশ্বজুড়ে শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে গড়ে তোলার প্রত্যয় শেখ হাসিনার

তারেক জোয়ারদার : বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ)-এর ৭৫তম লং কোর্সের অফিসার ক্যাডেটদের কমিশনপ্রাপ্তি উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের ভাটিয়ারির বিএমএ প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরে তিনি কৃতী ক্যাডেটদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।
এ কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ৩৪৩ জন বাংলাদেশি, ৫ জন ফিলিস্তিনি এবং ২ জন শ্রীলংকান ক্যাডেটসহ সর্বমোট ৩৫০ জন ক্যাডেট কমিশন লাভ করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত ক্যাডেটদের মধ্যে ৭৫তম বিএমএ লং কোর্সে ২৯৩ জন পুরুষ ও ৫০ জন মহিলা ক্যাডেট রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বিএমএ লং কোর্সের অফিসার ক্যাডেটদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেন, ৭৫তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের কমিশনপ্রাপ্তি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি প্যারেডে উপস্থিত সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
বিজয়ের এই মাসে আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি, যাঁর নেতৃত্বে আমরা অর্জন করেছি মহান স্বাধীনতা। আমি স্মরণ করছি জাতীয় চার-নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদ এবং দু’লাখ নির্যাতিত মা-বোনকে। সেনাবাহিনীর শহীদ সদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। মুক্তিযোদ্ধা ভাইবোনদের সালাম।
বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির জন্য আজ (২৭ ডিসেম্বর) একটি স্মরণীয় দিন। কারণ এই দিনে প্রথমবারের মতো তিন বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে লেফটেন্যান্ট হিসেবে প্রশিক্ষণার্থীরা কমিশন লাভ করতে যাচ্ছে। কমিশন লাভের এ শুভক্ষণে আমি সকল নবীন অফিসারকে জানাই আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের সেনাবাহিনীর জন্ম। স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি শক্তিশালী এবং প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য জাতির পিতা ১৯৭৪ সালে প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করেন। বিভিন্ন সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি একটি বিশ্বমানের মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭৪ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসে তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির উদ্বোধন করেন।
১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই দিন তিনি তাঁর বক্তৃতায় নবীন সামরিক অফিসারদের পেশাগতভাবে দক্ষ, নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন এবং দেশপ্রেমের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
জাতির পিতার সেই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রতিরক্ষা নীতির অনুসরণে আমরা ফোর্সেস গোল-২০৩০ প্রণয়ন করি। বিগত প্রায় ৯ বছরে আমরা সেনাবাহিনীর অবকাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছি।
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদেও আমরা নতুন নতুন ব্রিগেড, ইউনিট ও ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠাসহ ঘউঈ, ইওচঝঙঞ, অঋগঈ, গওঝঞ এবং ঘঈঙং একাডেমির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রতিষ্ঠা করি। সেনাবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যাপ্তসংখ্যক এপিসি, এআরভি, ব্যাটেল ট্যাংক, আরমার্ড, রিকভারি ভেহিক্যাল, হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র এবং সরঞ্জামাদি ক্রয় করা হয়। আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অবকাঠামোগত, কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে এক দশক আগেকার সেনাবাহিনীর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামাদির সমন্বয়ে আজকের সেনাবাহিনী অনেক বেশি উন্নত, দক্ষ ও চৌকস।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে রয়েছে আমাদের সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন। আমার ভাই শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দ্বিতীয় ভাই শহীদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ১৯৭৫ সালে রয়েল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্টস থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ শেষে কমিশন লাভ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। ছোট ভাই রাসেলের ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকেরা সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আমি তোমাদের মধ্যে আমার হারানো ভাইদের খুঁজে পাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিকে একটি অত্যাধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একাডেমিতে পরিণত করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এখানে ইতোমধ্যে ক্যাডেটদের ইনডোর প্রশিক্ষণের সকল প্রকার অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে এ একাডেমিতে বিভিন্ন বিষয়ে ৪ বছর মেয়াদি অনার্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি চালু করা হয়েছে। একইসঙ্গে ক্যাডেটদের কমিশন লাভের সময়কাল ২ বছর থেকে ৩ বছরে উন্নীত করা হয়েছে। একটি প্রশিক্ষিত ও আধুনিক সেনাবাহিনী গঠনে এ উদ্যোগ যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, এই দিনটি তোমাদের জীবনে অত্যন্ত আনন্দের এবং গুরুত্বপূর্ণ। আজ থেকে তোমাদের ওপর ন্যস্ত হচ্ছে দেশমাতৃকার মহান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে তোমাদের সজাগ ও সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে হলেও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই হবে তোমাদের জীবনের প্রথম ও প্রধান ব্রত। তোমরা নিঃস্বার্থভাবে জনগণের পাশে থাকবে এবং দেশের সেবা করবে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি অনুগত এবং অধীনস্থদের প্রতি সহমর্মী হতে হবে তোমাদের। মনে রাখবে অনেক রক্ত আর ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা নিয়ে যেন কেউ ছিনিমিনি খেলতে না পারে। তোমাদের জন্য রইল আমার শুভ কামনা।
দেশ-বিদেশে দায়িত্ব পালনে দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব দেখিয়ে আমাদের সেনাবাহিনী সব মহলের প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এ সুনাম তোমাদের আরও এগিয়ে নিতে হবে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষ শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জানবেÑ এটিই আমার প্রত্যাশা।
তোমাদের মনে রাখতে হবে, তোমরা এদেশের সন্তান। জনগণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তোমাদের সকলকেই সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্নার সমান অংশীদার হতে হবে। দাঁড়াতে হবে যেকোনো দুর্যোগ ও দুঃসময়ে বিপন্ন মানুষের পাশে।
সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন, সুশৃঙ্খলভাবে ত্রাণ বিতরণ এবং তাদের পরিচয়পত্র তৈরিতে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দুর্গম পার্বত্য এলাকায় সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক, সেতু ও ফাইওভার নির্মাণ, ভোটার তালিকা ও মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রেও দক্ষতা দেখিয়েছে।
বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়নসহ নানা ক্ষেত্রে আমরা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, অনেক উন্নত দেশকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি।
গত অর্থবছর আমাদের জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। দারিদ্র্যের হার ২০০৫ সালের প্রায় ৪১ শতাংশ থেকে বর্তমানে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। মাথাপিছু আয় ২০০৫ সালের ৫৪৩ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আমরা নিজেদের অর্থ দিয়ে পদ্মাসেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করব, ইনশাআল্লাহ।
তোমাদের সুসজ্জিত, সুশৃঙ্খল ও আকর্ষণীয় কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এজন্য তোমাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। নবীন নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং আজকের প্যারেডকে সামগ্রিকভাবে সাফল্যম-িত করার জন্য আমি একাডেমির কমান্ড্যান্ট, সংশ্লিষ্ট সকল অফিসার, জেসিও, এনসিও, সৈনিক এবং অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
প্রশিক্ষণে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল ও সাফল্যের জন্য পদকপ্রাপ্ত ক্যাডেটদের আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের গর্বিত অভিভাবকদের প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করে সবাইকে আবারও ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার সাদমানুর রহমান ৭৫তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে সেরা চৌকস ক্যাডেট বিবেচিত হন এবং গৌরবম-িত ‘সোর্ড অব অনার’ লাভ করেন। একই সাথে তিনি সামরিক বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য ‘সেনাবাহিনী প্রধানের স্বর্ণপদক’ লাভ করেন। পরে ক্যাডেটরা আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করেন এবং ক্যাডেটদের বাবা-মা ও অভিভাবকরা নবীন অফিসারদের র‌্যাংক-ব্যাজ পরিয়ে দেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী বিএমএ প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান।
রাষ্ট্রপতি প্যারেড শেষে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ১ হাজার ২০০ জন ক্যাডেটের জন্য নির্মিত আধুনিক সুবিধা সংবলিত ডরমেটরি, অফিসারদের জন্য ৫২টি ফ্যাট সংবলিত ১৪তলা আবাসিক ভবন এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একাডেমিক কমপ্লেক্স ভবনের উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার, সংসদ সদস্য, ঢাকাস্থ বৈদেশিক মিশনের কূটনীতিক, উচ্চপদস্থ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তা এবং সদ্য কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের বাবা-মা ও অভিভাবক উপস্থিত থেকে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করেন।