প্রতিবেদন

উর্দুর পরিবর্তে এবার বাংলায় বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাত : মোনাজাতে অংশ নিয়ে দেশ ও জনগণের সমৃদ্ধি কামনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিশ্ব ইজতেমার ইতিহাসে এবারই প্রথম আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেছেন একজন বাংলাদেশি মাওলানা। ফলে আখেরি মোনাজাত হয়েছে আরবি ও বাংলা ভাষায়। এতদিন তা আরবি ও উর্দু ভাষায় হয়ে আসছিল। শেষ দশকে ভারতের মাওলানা জোবায়েরুল হাসান, শেষ ২ বছরে মাওলানা সাদ কান্ধলভি আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেছিলেন উর্দু ভাষায়। এছাড়া প্রায় এক দশক ধরে উর্দুতে হেদায়েতি বয়ান করে আসছিলেন মাওলানা সাদ। এবারও আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করার কথা ছিল মাওলানা সাদ-এরই। কিন্তু কিছু বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে এবং উর্দুতে হেদায়েতি বয়ান ও আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করায় মাওলানা সাদের ওপর নাখোশ ছিল হেফাজতে ইসলামিসহ ইসলামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। তাদের প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে এসেও বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে পারেননি মাওলানা সাদ। ফলে বিশ্ব ইজতেমায় এবারই প্রথম হেদায়েতি বয়ান ও মোনাজাত বাংলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাতের আগের দিন ১৩ জানুয়ারি নিজ দেশে ফিরে গেছেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব দিল্লির মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্ধলভি। জেট এয়ারওয়েজের একটি ফাইটে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন তিনি। এর আগে সকালে কাকরাইল মসজিদ থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরে আনা হয়।
মাওলানা সাদের বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ ঠেকাতে ১০ জানুয়ারি বিমানবন্দর গোলচত্বর এলাকায় বিােভ করে কওমিপন্থি আলেম, হেফাজতে ইসলাম ও তাবলিগের কর্মীদের একাংশ। এর মুখে মাওলানা সাদকে কাকরাইল মসজিদে নেয়া হয়। ১১ জানুয়ারি দু’পকে নিয়ে বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দেন, মাওলানা সাদ ইজতেমায় যাবেন না, সুবিধাজনক সময়ে ভারতে ফিরে যাবেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার মাত্র ৩০ ঘণ্টার মাথায় ভারতের উদ্দেশে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন মাওলানা সাদ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে। মোনাজাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ও জনগণের অব্যাহত সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা জানান। টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে ১৪ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাতের বৃহত্তর এই সম্মেলনের প্রথম পর্ব শেষ হয়। আখেরি মোনাজাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অংশ নেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি ও কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলিসহ প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়রা। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহম্মদ জয়নুল আবেদীন, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, বিশেষ সহকারী ড. আবদুস সোবহান গোলাপ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ এ সময় সেখানে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন।
আখেরি মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তম ঐক্যের পাশাপাশি দেশ ও জাতির অব্যাহত শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করা হয়। কাকরাইল জামে মসজিদের জ্যেষ্ঠ পেশ ইমাম মাওলানা মো. জুবায়ের মোনাজাত পরিচালনা করেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, গাইবান্ধা, শেরপুর, লাক্ষ্মীপুর, ভোলা, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, নড়াইল, মাগুরা, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও নাটোরসহ দেশের ১৬টি জেলার লাখ লাখ মুসল্লি ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। এবারের ইজতেমার প্রথম পর্বে ৮৮টি দেশের প্রায় ৪ হাজার ৪৭৩ জন বিদেশি মুসল্লি অংশ নেন। ১৯ থেকে ২১ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। দেশের অবশিষ্ট ১৬টি জেলার মুসল্লিরা দ্বিতীয় পর্বে অংশ নেন।
১২ জানুয়ারি ফজর নামাজের পর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ১৪ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে তা শেষ হয়। পরবর্তীতে ১৯ জানুয়ারি ফজর নামাজের পর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে তা শেষ হয়।
ইজতেমার প্রথম পর্বে বিশিষ্ট ওলামায়ে মাশায়েখবৃন্দ তাদের বয়ানের মধ্য দিয়ে পবিত্র কুরআন ও সুন্নার আলোকে পরিচালিত হওয়ার আহ্বান জানান। এ সময় তাদের বয়ান বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে শোনানো হয়। ইজতেমার দুই পর্বেই বাদ ফজর বাংলাদেশের মাওলানা নূরুল রহমান, বাদ জোহর সুদানের মাওলানা ড. জাহাদ, বাদ আসর বাংলাদেশের নূরুর রহমান, বাদ মাগরিব মাওলানা ফারুক হোসেন বয়ান করেন। বয়ানে উঠে আসে- দুনিয়া হচ্ছে ধোঁকার ঘর, দুনিয়ার জীবন ধোঁকার জীবন। মিছে এ দুনিয়ার আরাম-আয়েশের কথা ভুলে আখেরাতের সম্বল তৈরি করতে হবে। আমল ছাড়া আখেরাতে খালি হাতে যাওয়া যাবে না। সবাইকে দ্বীনের পথে সময় লাগাতে হবে। আমাদের সবার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
১৯৬৭ সাল থেকে নয়াদিল্লি ভিত্তিক তাবলিগ-ই-জামাত এই বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করে আসছে। ইজতেমায় দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক মুসল্লি আসতে থাকায় চাপ কমাতে ও সুষ্ঠুভাবে জমায়েতটি পরিচালনা করার স্বার্থে ২০১১ সাল থেকে দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২১ জানুয়ারি বঙ্গভবন থেকে বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতের শেষ পর্বে অংশগ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি দরবার হলে বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের নিয়ে সরাসরি সম্প্রচারকৃত আখেরি মোনাজাতে যোগ দেন। এ সময় দেশ ও জাতিসহ মুসলিম উম্মার শান্তি, সমৃদ্ধি কামনা করে পরম করুণাময়ের কাছে মোনাজাত করা হয়।
হেদায়েতি বয়ান, ধর্মীয় আলোচনা ও ইবাদতের মধ্য দিয়ে তিনদিন কাটানোর পর ২১ জানুয়ারি বেলা ১০টা ২০ মিনিটে আখেরি মোনাজাত শুরু হয়। বাংলা ও আরবি ভাষায় ২৬ মিনিটের এ মোনাজাত পরিচালনা করেন কাকরাইল মসজিদের ইমাম তাবলিগের শূরা সদস্য মাওলানা জুবায়ের।
মোনাজাতে অতীতের সব ভুলের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে মা চাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সব মুসলমানের মঙ্গল কামনা করা হয়। মোনাজাত প্রচারের জন্য গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ও গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস বিশেষ ব্যবস্থা নেয়।
আখেরি মোনাজাতকে কেন্দ্র করে প্রতিবারের মতো এবারও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপরও বিভিন্ন জেলার হাজারো মুসলমান যানবাহন থেকে নেমে শীতের মধ্যেই পায়ে হেঁটেই রওনা হন টঙ্গীর পথে।
দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভিকে নিয়ে বিতর্ক ও বিােভকে কেন্দ্র করে এবার বিশ্ব ইজতেমায় জনসমাগম ছিল অন্যবারের চেয়ে কম। তারপরও আখেরি মোনাজাতের সময় ইজতেমাস্থলের চারপাশের ৩-৪ কিলোমিটার এলাকায় যেন তিল ধারণের জায়গা ছিল না। মোনাজাতের আগে চলে হেদায়েতি বয়ান। বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মতিন। আর ভোরে ফজরের নামাজের পর বয়ান করেন মাওলানা রহিম নকিব। মোনাজাতের আগে ইজতেমা ময়দানে চটের শামিয়ানার নিচে বয়ান শোনেন লাখো মানুষ। ময়দানে জায়গা না পেয়ে আশপাশের অলিগলি ও রাস্তায় পাটি, খবরের কাগজ, পলিথিন বিছিয়ে তাতেই অবস্থান নেন অনেকে।
ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে বহু নারীও এসেছিলেন মোনাজাতে অংশ নিতে। ময়দানে ঢোকার অনুমতি না থাকায় তারা আশপাশের বিভিন্ন কারখানা ও আবাসিক ভবনের ছাদে অবস্থান নিয়ে মোনাজাতে হাত তোলেন।
জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর স্বদেশ খবরকে জানান, ৮৮টি দেশের ৪ হাজারের বেশি বিদেশি মুসল্লি এবার ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে অংশ নিয়েছেন। ইজতেমার প্রথম পর্বের আগে মাওলানা সাদকে নিয়ে বিতর্কে কিছুটা উত্তেজনা ছিল। তাই প্রথম পর্বে মুসল্লিদের উপস্থিতি কিছুটা কম হলেও দ্বিতীয় পর্বে বেড়েছে।
আখেরি মোনাজাত উপলে টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ আশপাশের এলাকার শিা প্রতিষ্ঠান, কারখানা, বিপণিবিতান ও অফিস বন্ধ ছিল। মোনাজাত শেষে টঙ্গী থেকে সবার বাড়ি ফেরার সুবিধার্থে ১৯টি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে রেল কর্তৃপ।