আন্তর্জাতিক

ট্রাম্প সরকারের অচলাবস্থা কাটলেও এখনও নানামুখী সংকটে যুক্তরাষ্ট্র সরকার

স্বদেশ খবর ডেস্ক : বাজেট বাড়ানো নিয়ে সিনেটে উত্থাপিত একটি বিল পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কার্যক্রমে যে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে, তার আপাত অবসান ঘটলেও এর রেশ মার্কিন অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিলে স্বারের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অচলাবস্থা। প্রায় ৩ দিন অচলাবস্থা চলার পর ২২ জানুয়ারি রাতে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকার পরিচালনার জন্য একটি তহবিল পাসের বিলে স্বার করেন তিনি। তার আগে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা সমঝোতা করে কংগ্রেসে বিলটি পাস করে।
এর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাজেট বাড়ানো সংক্রান্ত একটি বিলে মার্কিন সিনেটররা একমত হতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়। বাজেট নিয়ে সিনেটরদের বিভক্ত হয়ে যাওয়ার মূলে রয়েছে অভিবাসন নীতিতে প্রস্তাবিত পরিবর্তন। প্রায় ৩ দিন অচলাবস্থার পর ২২ জানুয়ারি অভিবাসন বিষয়ে সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলের নেতা চাক শুমার ও রিপাবলিকান দলের নেতা মিচ ম্যাককনেলের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। এরপর সরকারের জন্য তিন সপ্তাহের তহবিল বরাদ্দের ব্যাপারে সিনেটে ভোটাভুটি হয়। পরে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে প্রস্তাবটি ২৬৬-১৫৯ ভোটে পাস হয়। প্রস্তাবটির পে আগের চেয়ে ৩৬টি ভোট বেশি পড়ে। আর সিনেটে বিলটি ৮১-১৮ ভোটে পাস হয়। বিল পাসের পর ২২ জানুয়ারি রাতেই তাতে স্বার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
ডেমোক্র্যাট দলের চারটি সূত্র জানিয়েছে, দ্বিপীয় বৈঠকে ম্যাককনেল ও অন্যান্য রিপাবলিকান নেতার প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এবারের অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হয়। অচলাবস্থা শুরুর পর প্রথম কর্মদিবসের কয়েক ঘণ্টা পর ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়।
মার্কিন অর্থবছর শুরু হয় ১ অক্টোবর। তার আগেই বাজেট অনুমোদন করিয়ে নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রায়ই কংগ্রেস তা পাস করতে ব্যর্থ হয়। সে কারণে গত বছরের অর্থ বরাদ্দ চালু রাখতে ফেডারেল এজেন্সিগুলোকে অস্থায়ীভাবে তহবিল জোগান দিতে হচ্ছে। এবার সে বিষয়ে সম্মত হতে না পারায় ২০ জানুয়ারি থেকে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মার্কিন সরকারের বিভিন্ন দপ্তর। ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ অভিবাসীদের বিতাড়িত হওয়া থেকে রা করতে একটি আইন পাস করা নিয়ে কাজ করছে। ডেমোক্র্যাটরা চায়, বাজেট নিয়ে সমঝোতার অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিবাসন নিয়ে আপস করতে হবে। তবে রিপাবলিকানরা বলে আসছে, কেন্দ্রীয় সরকারের সেবাগুলো বন্ধ থাকায় কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। কিন্তু তরুণ অভিবাসীদের জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা আমলের সুরা অুণœ থাকার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা বাজেট বিলে ভোট দিতে আপত্তি জানানোয় সমস্যার সুরাহা হচ্ছিল না। ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত কোনো সমাধানে আসতে পারেনি মার্কিন সিনেট। ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের সঙ্গে ডেমোক্র্যাট দলের মতানৈক্য ছিল। পরে অবশ্য সরকারের কার্যক্রম পুনরায় সচল করতে ভোট দেয়ার বিষয়ে সম্মত হয় ডেমোক্র্যাটরা।
রিপাবলিকানদের সঙ্গে অভিবাসন নীতি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার পরিপ্রেেিত ভোট দিতে রাজি হন তারা। পরবর্তী সময়ে ড্রিমার্স হিসেবে পরিচিত অনথিভুক্ত অভিবাসীদের সুরার বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্কের আয়োজন করা হবে এমন প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই ওই বিল অনুমোদনে সম্মতি জানান ডেমোক্র্যাটরা। ৮ লাখ অস্থায়ী কর্মীকে স্থায়ী করার দাবি জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। ড্রিমার্সদের প নিয়ে তারা বলছেন, অনেকেই শিশু অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। কিন্তু এখনো বেআইনি অভিবাসী হয়েই রয়ে গেছেন তারা। আগামী মার্চ মাসে শেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের আইনি নিরাপত্তার সময়সীমা।
এদিকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের চলার মতো যে তহবিল পাস হয়েছে, সে সময় অতিক্রান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে যা ঘটতে পারে তার ফিরিস্তি তৈরি করেছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। এর ফলে জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় নয় কেন্দ্রীয় সরকারের এমন অনেক কর্মীকে অবৈতনিক ছুটিতে যেতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ অনেক দপ্তরও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ চলবে, যার মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা, ডাক, বিমান ওঠা-নামার কাজ, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সেবা, হাসপাতালে জরুরি বিভাগে সেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কারাগার, কর বিভাগ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন অন্যতম।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম হোয়াইট হাউজ ও কংগ্রেস একই দলের নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও সরকারের বাজেট বাড়ানোর বিল অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হল। এর আগে ২০১৩ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে সিনেটরদের মতবিরোধে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তহবিল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং ১৬ দিন পর্যন্ত ওই অচলাবস্থা চলেছিল। তখন ৮ লাখের বেশি কর্মীকে অবৈতনিক ছুটিতে যেতে হয়েছিল; জাতীয় উদ্যান ও স্মৃতিস্তম্ভগুলোর রণাবেণেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল; যা নিয়ে দেখা দিয়েছিল জনরোষ।
এর আগে এ ধরনের ঘটনায় ছুটিতে যাওয়া কর্মীদের সামান্য ভর্তুকি দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল কংগ্রেস। ট্রাম্প প্রশাসনও একই ধরনের পদপে নিতে পারে বলে জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
৮ ফেব্রুয়ারির পর কতজনকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হবে এবং কোন কোন দপ্তরের কাজ তিগ্রস্ত হবে তা জানা যায়নি। তবে ২০১৩ সালে এ ধরনের অচলাবস্থায় কী ঘটেছিল তার একটি তুলনা টেনে যা হতে পারে তার একটি ধারণা দিয়েছে রয়টার্স।
সরকারের অচলাবস্থার কারণে আফগানিস্তানে যুদ্ধ এবং ইরাক ও সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী লড়াই তিগ্রস্ত হবে না বলে মার্কিন প্রতিরা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। সামরিক বাহিনীর ১৩ লাখ সদস্য প্রতিদিনকার মতোই দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। তবে প্রয়োজনীয় নয় সামরিক বাহিনীর এমন কর্মকা-ে নিয়োজিত বেসামরিকদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হতে পারে।
মার্কিন বিচার বিভাগের বেশিরভাগ কর্মীই প্রয়োজনীয়। সরকারি অচলাবস্থা শুরু হলে বিভাগটির ১ লাখ ১৫ হাজার কর্মীর মধ্যে ৯৫ হাজারই কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। কংগ্রেসে বাজেট ঠিক হলেও স্টক মার্কেটের নিয়ন্ত্রক সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের অর্থায়ন হয় বিভিন্ন আর্থিক খাত থেকে পাওয়া ফি’র মাধ্যমে। ইতঃপূর্বে সরকারি অচলাবস্থা চলার সময়ও তারা সাময়িকভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়েছিল। তবে মার্কিন কংগ্রেস যদি ৮ ফেব্রুয়ারির পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেও অচলাবস্থা নিরসন করতে না পারে তাহলে এর কর্মীদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক ছুটিতে যেতে হবে। আর তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেট নিয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে হোয়াইট হাউজের ১ হাজার ৭১৫ কর্মীর মধ্যে ১ হাজারেরও বেশি কর্মীকে ছুটিতে যেতে হবে।