ফিচার

বই আলোচনা

জললিপি

স্বদেশ খবর ডেস্ক
এ উপন্যাসের মূল চরিত্র গগন চৌধুরী আদতে ভুঁইফোড় কেউ নন। তার নানামাত্রিক জীবনে রমণী ও ঐশ^র্যের প্রাচুর্য ছিল বেশ। পোড় খাওয়া গগন সময়টাকে বশে আনতে গিয়ে বৈধ-অবৈধ নানা রকম কাজে সম্পৃক্ত হন, তার বিচিত্র চলার পথে গলি-ঘুপচি ধরে অনিবার্যভাবে প্রেম এসে পড়ে। কামনার হোমানলে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকেন গগন চৌধুরী। সেখানে আনিলা, অহনা বা মৌপিয়ার মতো শরীরসর্বস্ব মেয়ে যেমন ছিল, তেমনি ছিল তার বিবাহিত স্ত্রী আরজু বেগম ও একমাত্র ছেলে কাজল- যে কিনা একটি স্পেশাল চাইল্ড। মামুন মোড়ল তার প্রতিপক্ষ, গগন চৌধুরীকে মামুন একজন ঠগ ও প্রবঞ্চক বলে চেনে। মজার ব্যাপার হলো পেশাদার খুনি খুররম এদের দুজনেরই খুব ঘনিষ্ঠ সহচর। সে যাই হোক, সহসাই একদিন নিজের বাড়িতে আত্মঘাতী হন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গগন চৌধুরী। খুন নাকি আত্মহনন! ডিটেকটিভ অলোকেশ একটি আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয়ের সূত্রে এই কেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ইন্সপেক্টর নাজিরের ধারণা অলোক তাকে না মারলেও কিছু একটা সংশ্লেষ তার ছিলই। বস্তুত গগন চৌধুরীর কেসে প্রায় ফেঁসেই যাচ্ছিল অলোকেশ। ভাগ্যিস তার খুব কাছের বান্ধবী ও বিশিষ্ট আর্কিটেক্ট উর্বী ওরফে জলপিপি ওর পাশে এসে দাঁড়ায়! ক্রাইম রিপোর্টার শুভও অবশ্য মগজ খেলিয়েছে খুব! গল্পের শেষে জানা যায়, গগন চৌধুরী কেবল বিজনেস ম্যাগনেট নয়, তার চরিত্রে ছিল দশ কুঠুরি হাজার দরজা!
এই আখ্যানের মূলে রয়েছে একজন গগন চৌধুরীর জিরো থেকে হিরো হয়ে ওঠার কাহিনি। লেখক নির্মোহ নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি মেলে চেয়ে থেকেছেন গগনের দিকে। তিনি নিজের কোনোরকম স্বপ্ন কল্পনা এই উপন্যাসের মূল চরিত্র গগনের ওপর চাপাতে চাননি। এই গল্পের অন্তরালে আমরা আরো একটি গল্প পাইÑ একজন ভুল মানুষের জিততে জিততে হেরে যাওয়ার গল্প। গগনের জীবনে প্রেম এসেছে বহুবার। সত্যি বলতে, যার অনেকটাই কামজ প্রেম। সেখানে হৃদয়ের সংশ্লেষ ছিল না বলেই মনে হয়।
পাঠকের জন্য এই আখ্যানে লেখক মূলত একের ভিতর দুয়ের আস্বাদ এনে দেন। গগন চৌধুরীর গল্পটা বলতে গিয়ে তিনি চমৎকার এক গোয়েন্দা অনুষঙ্গ টেনেছেন। গোয়েন্দা অলোকেশ গগন চৌধুরীর খুনের কিনারা করতে গিয়ে এই ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষটির উত্থান-পতন দেখিয়েছেন। সেখানে আনিলা, অহনা ও মৌপিয়া এসেছে অনেকটা অনিবার্যভাবেই। লেখকের শব্দচয়নে মুন্সিয়ানা এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জলপিপি একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস। পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার মতোই একটি গল্প।
প্রচ্ছদ : মাসুম রহমান, প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ

কফিমেকার

স্বদেশ খবর ডেস্ক
অলোকেশ রয়, কাস্টমস বিভাগের একজন চৌকস ডেপুটি কমিশনার। বলা যায় সৌখিন ডিটেকটিভ। সহজাত বুদ্ধিমত্তা আর বিজ্ঞানমনস্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভয়ঙ্কর সব রহস্য ভেদ করছেন। মি. রয় কুখ্যাত স্মাগলারদের চোখে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ড্রাগ-মাফিয়ারাও তাকে সব সময় এড়িয়ে চলে। একের পর এক ফরেন কারেন্সি, স্বর্ণের বার, আফিম, হেরোইন, কোকেনের বড় বড় চালান আটক করে অলোকেশ পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন। তার তদন্তের ধরন আলাদা। চারদিকে তিনি অজস্র বুদ্ধিমান চর জালের মতো বিছিয়ে রেখেছেন। যেন গোপনে পুঁতে রাখা ল্যান্ড মাইন। মি. রয়ের মতোই তার সহযোগীরা সতত সঞ্চরণশীল। তাদের চোখ গলে এক টুকরো মাছিও পালাবার উপায় নেই। এই গ্রন্থের প্রতিটি এপিসোডে থাকছে অলোকেশের দুর্দান্ত গোয়েন্দা-শৈলী।
সহজ করে বললে, কফিমেকার লেখকের গোয়েন্দা ধাঁচে লেখা গল্প। এর কিছু কিছু ঘটনা লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতাপুষ্ট। তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকালে এসকল ঘটনার মুখোমুখি হন। সেখানে চৌদ্দজন শুল্ককর্মকর্তার একটি বিশেষ দল স্মাগলার দমনে কাজ করে। ধরে নেয়া যায় অলোকেশ রয় আর কেউ নন, লেখক স্বয়ং। লেখকের জীবনী ঘাঁটলে দেখা যায় তিনি লন্ডনের একটি বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াকালীন নিউ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে কিছুদিন প্রশিক্ষণ নেন। যার প্রতিফলন আমরা ‘কফিমেকার’ গ্রন্থটিতে দেখতে পাই।
বলে নেয়া ভালো, এপার বাংলায় গোয়েন্দা গল্প এখনও ততোটা জনপ্রিয় নয়। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় এ জাতীয় খুব বেশি বই এখানে প্রকাশিত হয়নি। সেই অর্থে লেখক একটি আপাতকঠিন কাজ করতে চেয়েছেন। রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা অপরাধ কাহিনির প্রতি মানুষের একরকম আকর্ষণ বরাবর দেখা যায়। লেখক অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে ও ভাষায় প্রতিটি এপিসোড তুলে ধরেছেন। সেখানে সাসপেন্স যেমন আছে, তেমনি আছে ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও রহস্যজট খোলার নাটকীয় উদ্যোগ। সব মিলিয়ে ‘কফিমেকার’ রহস্যামোদী পাঠকের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হবে বলে আশা করা যায়।
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ, প্রকাশক : অনিন্দ্যপ্রকাশ