প্রতিবেদন

বাংলাদেশ সফরকালে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি : বিনিয়োগের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও উপযুক্ত স্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের চমকপ্রদ আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বিনিয়োগের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও উপযুক্ত স্থান। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ১৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সৌজন্য সাাৎকালে এসব কথা বলেন।
বৈঠকের শুরুতেই দুই নেতা নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করেন। প্রণব মুখার্জি তার অবসর সময় কাটানোর বৃত্তান্ত তুলে ধরে বলেন, বই পড়েই এখন তার সময় কাটছে। তিনি বলেন, আমি জীবনের দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেছি। ভারতের সংসদে এবং রাষ্ট্রপতির পদের মতো সাংবিধানিক পদে ছিলাম। অবসর গ্রহণের পরে আমার অফুরন্ত সময় পড়ার জন্য। প্রণব ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশে তার প্রথম বিদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরে বলেন, তাঁর সরকারের বিভিন্ন বাস্তবধর্মী পদেেপর ফলে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। গত বছরের বন্যার ফলে দেশের অর্থনীতি খানিক তির সম্মুখীন হয়েছে।
রোহিঙ্গা ইস্যু সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় প্রদান করেছে।
প্রণব মুখার্জির মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব সুরাইয়া বেগম এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনের প্রধান প্রবেশমুখে ফুলের তোড়া হাতে প্রণব মুখার্জিকে স্বাগত জানান। উল্লেখ্য, প্রণব মুখার্জি ৫ দিনের ব্যক্তিগত সফরে ১৪ জানুয়ারি ঢাকা এসেছিলেন।
দুই.
সাবেক হলেও বাংলাদেশের পরীতি অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জি সফরকালে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সমপরিমাণ সম্মান ও পূর্ণ নিরাপত্তা। ১৪ জানুয়ারি বিকেল ৪টায় ঢাকা পৌঁছলে তাঁকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। সফরের প্রথম দিনে প্রণব মুখার্জি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন চ্যান্সেরিতে তার সম্মানে বিশেষ সংবর্ধনা ও নৈশভোজে যোগ দেন। ভারতীয় হাইকমিশন চ্যান্সেরিতে তাঁকে স্বাগত জানান ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা।
সফরের দ্বিতীয় দিনে ১৫ জানুয়ারি প্রণব মুখার্জি ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাাৎ ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। বিকেলে বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য রাখেন। সন্ধ্যায় তাঁর সম্মানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দেয়া নৈশভোজে অংশ নেন প্রণব মুখার্জি ।
সফরের তৃতীয় দিনে ১৬ জানুয়ারি তিনি যান চট্টগ্রামে। সেখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প থেকে বাঙালির এই চিরন্তন বন্ধুকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি দেয়া হয়। এ উপলে আয়েজিত অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্যও রাখেন। প্রণব মুখার্জি চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূর্যসৈনিক মাস্টার দা সূর্যসেন ও বীরকন্যা প্রীতিলতার স্মৃতিবিজড়িত এলাকা পরিদর্শন করেন। সন্ধ্যায় তিনি চট্টগ্রামে ভারতীয় হাইকমিশনের আয়োজনে সংবর্ধনা ও নৈশভোজে অংশ নেন।
সফরের চতুর্থ দিনে ১৭ জানুয়ারি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব ঢাকায় ফিরে আসেন। ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাাৎ করেন ও তাঁর সম্মানে রাষ্ট্রপতির দেয়া নৈশভোজে অংশ নেন।
সফরের পঞ্চম দিনে ১৮ জানুয়ারি দিল্লি ফিরে যান ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি।
তিন.
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেছেন, শত বাধার মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম এগিয়ে যাওয়া দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ দেশের জাতীয় আয় এই কয়েক বছরে ৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ২০০৮ সাল থেকে সারা পৃথিবীতে অর্থনৈতিক মন্দা চললেও বাংলাদেশ থামেনি। অপুষ্টি দূরীকরণ, নারী শিা দূরীকরণ, উচ্চশিা সম্প্রসারণে বাংলাদেশ উন্নতি করছে। অন্যান্য উন্নত দেশগুলো না পারলেও বাংলাদেশ পেরেছে। আজকে যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনারা আমাকে ডি. লিট দিয়ে সম্মানিত করেছেন সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি উপলব্ধি করছি, গণতন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট ডিগ্রি নেয়ার পর শিার্থীদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রণব মুখার্জি। রাজনীতি, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার ৪০ মিনিটের বক্তব্য মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছেন অতিথিরা। চবি থেকে মাস্টারদা সূর্যসেনের জন্মস্থান রাউজানে যান প্রণব মুখার্জি। রাউজানের নোয়াপাড়ায় সূর্যসেনের ভাস্কর্যে সম্মান জানান তিনি। নগরীর হোটেল র‌্যাডিসনে ভারতীয় দূতাবাসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও যোগ দেন প্রণব মুখার্জি।
উপমহাদেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেন বারবার আক্রমণের শিকার হচ্ছেÑ সেই প্রশ্ন তুলে এসব হত্যাকা-ের কারণ জানতে গবেষণার আহ্বান জানিয়ে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেন, এ উপমহাদেশে যাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল সে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর কেন বারবার হিংসাত্মক আক্রমণ হয়েছে তা জানতে হবে।
তিনি ১৯৫৯ সালে শ্রীলংকার সলোমন বন্দরনায়েক, ১৯৪৮ সালের ৩ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক, জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি ও শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট রানাসিঙ্গে প্রেমাদাসা নিহত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে চবির মনোগ্রাম সংবলিত ক্রেস্ট প্রদান করেন চবি উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী।
এ সময় প্রণব মুখার্জি বলেন, ভারতে স্বাধীনতার কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে হারিয়েছিলাম। ১৯৪৮ সালের ৩ জানুয়ারি ঘাতকের বুলেট তাঁকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল। ঠিক তেমনি স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় একদল ঘাতকের নৃশংস আক্রমণে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আত্মত্যাগ করলেন। প্রায় জন্মলগ্নের মুহূর্তে জাতিকে জাতীয় নেতৃত্বশূন্য করে দেয়া হলো। পৃথিবীর কোনো দেশে এমন নজির নেই। এ বিপুল রাজনৈতিক হত্যাকা-ের কারণ কী, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রোপট আছে কি না তা আমাদের জানতে হবে।
বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোতে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেনি কেন তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রণব মুখার্জি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্র গ্রহণ করেছে ভারতের মতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষের কাছে মতা তুলে দিয়েছে। শ্রীলংকা, মিয়ানমারও একই পথে হেঁটেছে। আরো অনেক দেশ সংসদীয় গণতন্ত্র গ্রহণ করেছে। তবে ভারত, বাংলাদেশসহ দু-একটি দেশ ছাড়া অন্য তেমন কোনো দেশে এটি মজবুত হতে পারেনি। কেন? এসব দেশে দীর্ঘদিন সামরিক শাসন চলেছে। কোন আর্থসামাজিক কারণে সৈন্যরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রীয় মতা দখল করেছে তা জানা দরকার। এসব কারণে সংসদীয় গণতন্ত্র বা রাষ্ট্রপতিশাসিত গণতন্ত্র মজবুত হতে পারছে না।
জাতির জনক শেখ মজিবুর রহমান প্রসঙ্গে প্রণব মুখার্জি বলেন, অন্য দেশের স্বাধীনতার স্থপতিরা দেশকে গড়ে তোলার অনেক সময় পেলেও বাংলাদেশের জনক শেখ মুজিবুর রহমান তা পাননি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্থপতি। তিনি ছিলেন সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি আরও বলেন, ভাষার জন্য কোনো দেশের মানুষ জীবন দিয়েছে তার নজির নেই। তবে তা বাংলাদেশের মানুষ করেছে। মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির রার জন্য তারা জীবন উৎসর্গ করেছে। আজ বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রণব মুখার্জি উচ্চশিা ত্রেকে গবেষণানির্ভর করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকেই চুম্বকের সাথে তুলনা করতো। চুম্বকের ন্যায় এ বিশ্ববিদ্যালয় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিভাবান মানুষদের আকর্ষণ করতো। আমি চাইবো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও সেই অবস্থানে যাবে। এখান থেকেই বিজ্ঞানী-অর্থনীতিবিদ বের হবে, যারা সারাবিশ্বের কল্যাণে কাজ করে যাবে। আমি চাইবো এ বিশ্ববিদালয়ের শিার্থীরা এমন কোনো তত্ত্ব আবিষ্কার করবেন, যাতে করে পুরো বিশ্ব এতে উপকৃত হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে প্রণব মুখার্জি বঙ্গবন্ধু চত্বরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর তিনি শহীদ আব্দুর রব হলের মাঠে প্রবেশ করেন। উদ্বোধনী সংগীত দিয়ে তাকে বরণ করে নেন চবির নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের শিার্থীরা। এরপর তাকে সম্মানসূচক ডি. লিট ডিগ্রি তুলে দেন চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দীন চৌধুরী।
অনুষ্ঠান শেষে প্রণব মুখার্জি ভিসির বাংলোতে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। এ সময় ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা, চবির রেজিস্ট্রার, ডিনসহ সিনিয়র শিকরা উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রওনা দিয়ে রাউজানের নোয়াপাড়ায় সূর্যসেনের পৈতৃক ভিটায় পৌঁছেন প্রণব মুখার্জি। রাউজান কলেজের কাছে মুন্সির ঘাটা এলাকায় সূর্যসেনের ভাস্কর্যে সম্মান জানান তিনি। এরপর সূর্যসেন স্মৃতি পাঠাগারের উদ্বোধন করে সেখানে রাখা স্মারক বইয়েও স্বার করেন।
সূর্যসেন পল্লীতে প্রণব মুখার্জির মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জি এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় মধ্য বয়স্ক বেবী দাশ নামের এক নারী শর্মিষ্ঠাকে তার ঘরে আমন্ত্রণ জানান। এ সময় বেবী দাশ বলেন, আপনি রাজার মেয়ে। আমি নিঃসন্তান। আপনার মতো ভাগ্যবতী নারী যদি আমার ঘরে একটু বসেন তাহলে ভগবান আপনার মতো আমাকেও সন্তান দান করবেন। একথা শুনে প্রণব মুখার্জীর মেয়ে শর্মিষ্ঠা স্থানীয় বেবী দাশের ঘরে গিয়ে একটু বসেন এবং তার ঘরে যেন একটি সন্তান আসে এ প্রার্থনা করেন। বেবী দাশ এলাকার হারাধন দাশের স্ত্রী।
চার.
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। ১৭ জানুয়ারি নগরীর পাহাড়তলীতে তৎকালীন ইউরোপিয়ান কাবের সামনে স্থাপিত আব মূর্তিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর কাবটি ঘুরে ঘুরে দেখেন তিনি।
এর আগে নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনসে ব্রিটিশ পুলিশের অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহৃত দুটি স্থাপনা পরিদর্শন করেন। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীরা অস্ত্রাগারটি দখলে নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ পুলিশের অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহৃত স্থাপনা দুইটি ঘুরে দেখার সময় অস্ত্রাগারটির ইতিহাস তার সামনে তুলে ধরেন পুলিশের কর্মকর্তারা। অস্ত্রাগার পরিদর্শন শেষে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান কাবে যান প্রণব মুখার্জি। যেখানে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বের মাস্টার দা সূর্য সেনের নির্দেশে হামলা চালিয়ে আত্মোৎসর্গ করেন বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। এই কাবটির সাইনবোর্ডে লেখা ছিল ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ’।
প্রণব মুখার্জি কাঠের কাঠামোয় নির্মিত কাবটি ঘুরে ঘুরে দেখেন। কাঠের পাটাতনের নিচে ব্রিটিশ সৈন্যদের অস্ত্র রাখার জায়গাটি তাকে দেখানো হয়। এরপর প্রীতিলতার আব মূর্তিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিনি। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জি।
পাঁচ.
আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী আয়োজনে যোগ দিয়ে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় দূষণ মানুষের চিন্তা-ভাবনা, মনে ও কাজে। আর এ দূষণ দূর করে নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে পারবেন শুধুমাত্র শিল্পী-সাহিত্যিকরা।
১৫ জানুয়ারি বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ‘বিশ্ব মানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’- এ প্রতিপাদ্যে দুই বাংলার সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণে এ সম্মেলনের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন পরিষদ। সহযোগিতায় ছিল বাংলা একাডেমি, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন ও ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও ভারতের চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। সমাপনী বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন পরিষদের আহ্বায়ক ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
প্রণব মুখার্জি বলেন, কোনো কারণ ছাড়া একেকটা বড় বড় যুদ্ধে কত মানুষ মারা যাচ্ছে! গত এক দশকে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের কথা ভাবুন- হিংস্রতার শিকার হচ্ছে কত নিরীহ মানুষ! এই হিংস্র পৃথিবীতে মানুষ কী করে বাস করবে? এই হিংস্রতা প্রতিহত করতে জাতিসংঘ বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় কোনো সম্মেলন থেকে সমাধান আসবে না। এই দূষণ থেকে মুক্ত করতে পারবেন স্রষ্টা। যারা কবি-সাহিত্যিক, তারাই নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করবেন।
তিনি বলেন, যুগ যুগ ধরে মানব সভ্যতার ইতিহাস এ কথা বলে গেছে- হিটলার, মুসোলিনিরা নয়; সভ্যতার ইতিহাস নির্মাণ করে গেছেন প্রফেট, খ্রিস্ট, বুদ্ধ। দিগি¦জয়ী বীরেরা নয়; সভ্যতার ইতিহাসের দিক নির্মাণ করেছেন লেখক-কবি-সাহিত্যিক তথা শিল্পীরা। পরীায় পাসের জন্য দিগি¦জয়ী বীরদের নিয়ে পড়াশোনা করা যায়; পাসের পর তা বেমালুম ভুলে যাই। কিন্তু শিল্পীর ছবি, কবির কবিতা বা প্রিয় উপন্যাস কখনও ভোলা যায় নাকি? যে গান, সানাই বা সরোদের সুর আমাদের প্রিয়; তা কখনও ভুলতে পারি আমরা?
নিজের বক্তব্যের শুরুতেই রসিকতার ঢঙে এ সম্মেলনে তার আগমনের ব্যাখ্যা দিয়ে প্রণব মুখার্জি বলেন, আমি তো পাঠক, একজন দর্শক। আমি স্রষ্টা নই; সৃষ্টিকর্ম তো আমার নেই। এই আন্তর্জাতিক সাহিত্যের মহামেলায় আমার কাজটা কী হবে? বীরভূমের গ্রামের ভাষায় রাজমিস্ত্রিদের; সিমেন্ট, বালু ইত্যাদি এনে দেয়া লোকদের যোগাই বলা হয়। এই সম্মেলনে আমার কাজটা এখানে অনেকটা যোগাইয়ের মতো।
নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বই পড়তে না পারায় দুঃখ করে তিনি বলেন, ১৯৬৯ থেকে ২০১২ সাল- দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি খুব বেশি পড়ার সুযোগ পাইনি। ২৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম। সরকারি কাজ, সংসদীয় কাজের ঠেলায় পড়ার সময় পাইনি। ৩৩০ করে রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রথমে এসে ভাবলাম- এখানে আমার কাজ কী? প্রধানমন্ত্রী ফাইল পাঠাবেন, আইন প্রণয়ন করবেন সাংসদরা; আমি তাদের পরামর্শ দেব। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির এখানে ভূমিকা কম। বছরে একদিন সাংসদদের ডেকে বক্তৃতা দেব। সেখানে দাঁড়ি, কমা, ফুল স্টপ- সবটাই মন্ত্রিসভার তৈরি। রাষ্ট্রপতিকে বলতে হবে- মাই গভর্নমেন্ট।
রাষ্ট্রপতি ভবনে তার পাঠ্যাভাস্যের বিষয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে দেখলাম প্রাসাদসম বিশাল ভবন। পরিসংখ্যানবিদদের মতে, ৩৩০টি ক বিশিষ্ট এমন ভবন বিশ্বে আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের নেই। রাষ্ট্রপতি হলে কাজ করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতির কাজ নৈবেদ্যর ম-ার মত বসে থাকা। তবে একটা কাজ আছে রাষ্ট্রপতির। প্রচুর বই রাষ্ট্রপতি ভবনে। প্রচুর কাগজ, দলিল দস্তাবেজ সেখানে। ইতিহাসের প্রচুর উপাদান। যেসব পড়তে তিনটি প্রেসিডেন্সিয়াল টার্ম লাগবে। তো, অতদিন তো সময় পাওয়া যাবে না। তার আগেই ঈশ্বর আমাকে ডেকে নেবে। বলবেন, এসো আমার কাছে। তাই আমি দেরি না করে পড়তে শুরু করলাম।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়েছে বাংলা ভাষা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে নোবেল পেয়ে বাংলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপরে ভাষা আন্দোলনে অনেক ত্যাগ-তিতিায় ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়। তাদের কাছে আমরা ঋণী। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসকে তারা রা করেছেন। যারা আগ্রাসন করে তাদের হাতে সেই ইতিহাসকে লুট হয়ে যেতে দেননি। সেই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ভাষা সাহিত্য সম্মেলন হবে না তো কোথায় হবে! বাংলা সাহিত্য শুধুমাত্র তার কল্পনা, চিন্তা-প্রতিভার প্রতিফলন নয়, তার মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানবতার প্রতিফলন ঘটে। তাই তো এই মঞ্চ থেকে ঘোষণা আসে পৃথিবীকে এই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প থেকে বাঁচানোর।
লেখক-সাহিত্যিকদের উদ্দেশে প্রণব বলেন, আসুন এই সংকল্প করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা হিংস্রতার সব বিষবাস্প থেকে বাঁচাবোÑ এই হোক আজকের অঙ্গীকার।