প্রতিবেদন

বিবিএস জরিপ : ৮৯ ভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০১৯ সালের মধ্যেই সরকার শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবে বলে জনগণকে আশ্বস্ত করেছে। পাশাপাশি ৮৯ ভাগ মানুষের ঘরে ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপের ওপর ভিত্তি করে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী গত ১৫ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন। বিবিএস গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯ হাজার ৬০০ মানুষের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে তারা ৮৯ ভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকার তথ্য পেয়েছে।
জরিপের ফলাফলে বলা হচ্ছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় সরকারের পরিকল্পনায় ৭৯ দশমিক ৭ ভাগ মানুষ আস্থা রাখতে চান আর ৫ দশমিক ৬ ভাগ মানুষ আস্থা রাখতে পারছেন না। বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই ১৪ ভাগ মানুষের। জরিপ চালানো মানুষের ৭৩ ভাগ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর বাকিরা পৌর এবং সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, আমরা বিদ্যুৎ খাতে কী কাজ করছি তার ফল জানার জন্যই এ ধরনের জরিপ করা জরুরি। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পন্থায় এই জরিপ করা হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এ ধরনের জরিপ সহায়তা করে। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী আমরা বলতে পারি, ৮৯ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
২০১৪ সালের পর আবারও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে মানুষের সন্তোষ-অসন্তোষ জানতেই এই জরিপ করে বিদ্যুৎ বিভাগ। তবে ২০১৪ সালের নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাসে শীতের সময় গবেষণা পরিচালনার জন্য মানুষের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা হয়েছিল। এবারও গত বছর ফেব্রুয়ারি এবং অক্টোবরে বিবিএস গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহ করেছে। অপোকৃত তাপমাত্রা কম থাকায় এই দুই মাসের কোনোটিতেই দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে না। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর এই সময়ে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে, গত বছরের অক্টোবরের শুরুর দিকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তখন গরমই থাকে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশের বিদ্যুৎ খাতে ৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি খাতে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং বেসরকারি খাতে ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। চলতি বছর থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আরও ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। এসব বিনিয়োগের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। সরকার ২০২১ সালে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ল্য নির্ধারণ করেছে। বাস্তবে এই সময়ে ২৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ১১ হাজার সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন এবং ৫ লাখ কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হবে।
বিবিএসের জরিপে বলা হয়, গ্রীষ্মকালে ৯ হাজার ৯২৭ জন, শীতকালে ৯ হাজার ৬৭৩ জনের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করা হয়। এ সময় তাদের ৬টি প্রশ্ন করা হয়। জরিপের উত্তরদাতাদের মধ্যে ৬৭ দশমিক ৩ ভাগ পুরুষ এবং ৩২ দশমিক ৭ ভাগ নারী। জরিপে দেখা গেছে ১১ ভাগ মানুষের ঘরে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি।
জরিপের ফলাফল সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর মধ্যে ৮৬ দশমিক ৯ ভাগ মানুষ সন্তুষ্ট এবং ১৩ দশমিক ১ ভাগ মানুষ সন্তুষ্ট নয়। ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১১ দশমিক ২ ভাগ মানুষ খুব সন্তুষ্ট, সন্তুষ্ট মানুষের হার ৪৫ দশমিক ৮ ভাগ আর মোটামুটি সন্তুষ্ট মানুষের হার ২৯ দশমিক ৯ ভাগ। এই হারের আবার গ্রীষ্ম এবং শীতে পার্থক্য রয়েছে। বিবিএস বলছে, গ্রীষ্মকালে ৯ দশমিক ২ ভাগ খুবই সন্তুষ্ট, ৪৭ দশমিক ২ ভাগ সন্তুষ্ট, ৩১ ভাগ মোটামুটি সন্তুষ্ট এবং ১২ দশমিক ৭ ভাগ অসন্তুষ্ট। আবার শীতে ১৩ দশমিক ৩ ভাগ খুবই সন্তুষ্ট, ৪৪ দশমিক ৭ ভাগ সন্তুষ্ট, ২৮ দশমিক ৮ ভাগ মোটামুটি সন্তুষ্ট এবং ১৩ দশমিক ৫ ভাগ অসন্তুষ্ট।
খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৩ ভাগ জনগণ খুবই সন্তুষ্ট, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫ দশমিক ৫ ভাগ মানুষ খুবই সন্তুষ্ট। ময়মনসিংহ বিভাগে সর্বোচ্চ ৫২ দশমিক ৭ ভাগ সন্তুষ্ট, বরিশাল বিভাগে সর্বনিম্ন ৩৪ দশমিক ৩ ভাগ মানুষ সন্তুষ্ট। চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৪ ভাগ মোটামুটি সন্তুষ্ট এবং খুলনা বিভাগে সর্বনিম্ন ১৯ দশমিক ৩ ভাগ মোটামুটি সন্তুষ্ট। মোটেও সন্তুষ্ট নয় এবং জনসংখ্যার মধ্যে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ১৭ দশমিক ৩ ভাগ এবং সর্বনিম্ন রাজশাহীতে ৯ দশমিক ৯ ভাগ।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ৮৪ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ সর্বনিম্ন রংপুরে ৬৯ দশমিক ২ ভাগ মানুষ। সাশ্রয়ের জন্য সুইস অফ করেন সর্বোচ্চ ৮০ দশমিক ১ ভাগ মানুষ এরা খুলনা বিভাগের বাসিন্দা আর বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর সুইস অফ করেন না এমন মানুষের বেশিরভাগই বসবাস করেন সিলেটে। সিলেটের ৫৬ দশমিক ১ ভাগ মানুষই বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর সুইস অফ করতে ভুলে যান। বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস বলেন, এখন দেশে মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্যাপটিভসহ ১৬ হাজার ৪৬ মেগাওয়াট। এর আগে সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২০০৯ সালে ৪ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট এবং গত বছর অক্টোবরে শুধু গ্রিড সংযুক্ত কেন্দ্রে উৎপাদন হয়েছে ৯ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ছিল ৫৫০ মেগাওয়াট আর তখন প্রতিদিন উৎপাদন হতো ২২৪ মেগাওয়াট।
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, ইপিআরসি চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন (অব.), পিডিবি চেয়ারম্যান খালিদ মাহমুদ এবং বিবিএসের মহাপরিচালক মো. আমির হোসেন উপস্থিত ছিলেন।