প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

বেপজা ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টরস সামিট ২০১৮ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : সরকারের ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ রপ্তানি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রাখছে বেপজা


এম নিজাম উদ্দিন : দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অধিকতর ভূমিকা রাখার লক্ষ্য নিয়ে ২৪ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকায় বেপজা ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টরস সামিট ২০১৮ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটি-বেপজা আয়োজিত আন্তর্জাতিক এই সামিট উদ্বোধন করেন। সামিটে বেপজার গত ৯ বছরের অবদান ও সাফল্য তুলে ধরা হয়। সামিট উদ্বোধন এবং দেশের সর্ববৃহৎ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল মিরসরাইয়ে ভিত্তিফলক উন্মোচনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলো (ইপিজেড) সফলভাবে পরিচালনায় বেপজার ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, সরকারের ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রেখে চলেছে বেপজা। ইপিজেডের মতো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) পরিচালনায়ও বেপজা সাফল্য দেখাতে সম হবে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এবং বেপজা ইনেভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন-এর চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. হাবিবুর রহমান খান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। অন্যান্যের মধ্যে এভারগ্রিন প্রডাক্টস ফ্যাক্টরি (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চ্যাং ইয়ো চ্যাং এবং কর্ণফুলী ইপিজেড-এর একজন চাকরিজীবী পান্না ইয়াসমিন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বেপজার অধীনে পরিচালিত চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক নির্মাণ ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কোনো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের যাত্রা শুরু হলো। এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এসইজেডটি পরিচালিত হবে বেপজার অধীনে।
‘বেপজা ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টরস সামিট ২০১৮’ উদ্বোধনের আগে সংস্থার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মুহম্মদ হাবিবুর রহমান খান, বিএসপি, এনডিসি, পিএসসি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সময়োপযোগী এই সামিট বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ইপিজেডসহ দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এর পাশাপাশি এটি দেশে-বিদেশে বেপজা তথা বাংলাদেশের অর্জন, আর্থসামাজিক কার্যক্রম, আধুনিক শিল্পায়ন, অনুকূল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বিনিয়োগ পরিবেশ, রপ্তানি বৃদ্ধি ও পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করবে।
বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আরো বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য আরো অনুকূল বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। বিগত ৯ বছরে বেপজা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। পূর্ববর্তী ৯ বছরের তুলনায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের ৯ বছরে (২০০৯-১৭) বেপজা বিনিয়োগে ২০০ দশমিক ৯৩ শতাংশ, রপ্তানিতে ২৪৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ, কর্মসংস্থানে ১১৮ দশমিক ৬০ শতাংশ ও শিল্প চালুকরণে ৪৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ ছাড়াও বিগত কয়েক বছরে জাতীয় রপ্তানি ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে বেপজার অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত ৮টি ইপিজেডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এ সময়ে ইপিজেডসমূহে মোট ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ ছাড়া বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ)’র শতভাগ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বেপজা পর পর তিনবার (২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কর্তৃক সম্মাননা অর্জন করেছে।
বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মুহম্মদ হাবিবুর রহমান খান, বিএসপি, এনডিসি, পিএসসি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প-২০২১ ও ২০৪১ নিয়ে বাংলাদেশ দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ রূপকল্প বাস্তবায়নের গর্বিত অংশীদার বেপজা। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বেপজার অংশগ্রহণে বাংলাদেশ যুগান্তকারী অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বেপজা ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টরস সামিট ২০১৮ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তাঁর সরকার বেসরকারি খাতের উন্নয়নে কাজ শুরু করে। দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য তাঁর সরকারই প্রথম দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিয়ে বেপজা ইনভেস্টরস কনফারেন্স করেছিল। সে সময় দেশে চট্টগ্রাম ইপিজেড এবং স্বল্প পরিসরে ঢাকা ইপিজেড চালু ছিল। পরবর্তীকালে বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য তাঁর সরকার ঢাকা ও চট্টগ্রাম ইপিজেডের সম্প্রসারণ করে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কুমিল্লা, মংলা, ঈশ্বরদী এবং নীলফামারিতে ইপিজেড স্থাপন করে।
দেশের অধিকাংশ ইপিজেড আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থাপিত হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইপিজেড স্থাপনের ফলে ওইসব অঞ্চলের আর্থসামাজিক েেত্র ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এবং মানুষের জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেছে।
মিরসরাইয়ে বেপজার অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বেপজাকে ইতোমধ্যে ১ হাজার ১৫০ একর জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। শিল্পের প্রসার, রপ্তানি খাত সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। সরকার এ েেত্র সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
এই পর্যায়ে শেখ হাসিনা বলেন, এক জায়গায় সমন্বিতভাবে কলকারখানা স্থাপন করলে বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর পে তাদের সেবা দেয়া সহজ হয়। পাশাপাশি জমির অপচয়ও বন্ধ হয়। তাঁর সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতির ফলেই চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দণি কোরিয়াসহ ৩৮টি দেশের বিনিয়োগকারীরা ইপিজেডের কারখানায় বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড পণ্য উৎপাদন করছে। তিনি বলেন, বেপজার অধীনে ইপিজেডগুলো দেশের মোট জাতীয় রপ্তানি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখছে। সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি, সময়োপযোগী বিভিন্ন পদপে এবং বেপজার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে। এসময় শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বেপজার বিনিয়োগ দ্বিগুণের বেশি এবং রপ্তানি প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের ৮টি ইপিজেড মাত্র ২ হাজার ৩০৭ দশমিক ২৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই ৮টি ইপিজেডে মোট ৪৬৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যার শতকরা ৬৪ ভাগই নারী। বিগত ৯ বছরে ইপিজেডগুলোতে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬২০টি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের রয়েছে তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং দ জনবল। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সমস্যা আমরা কাটিয়ে উঠেছি। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ল্েয তাঁর সরকার বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় মেট্রোরেলের কাজ চলছে। আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু বাস্তবায়ন করছি। পদ্মাসেতু দণিাঞ্চলের তো বটেই, সারাদেশের আর্থসামজিক উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। তাঁর সরকার রূপসা সেতু ও পায়রা বন্দর নির্মাণ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। ঢাকা-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে।
বর্তমানে দেশের ৮৯ ভাগ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সমতা ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। মাতারবাড়ি ও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ এগিয়ে চলছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজও সন্তোষজনক গতিতে এগিয়ে চলছে।
পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল তৈরিতে বেপজা আন্তরিকভাবে কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেপজা লো কার্বন গ্রিন জোন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এেেত্র তিনি সকলের সহযোগিতা আশা করে বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রায় আমাদের সময়েই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা ইপিজেডে কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) চালু হয়েছে। আদমজী ইপিজেডের একটি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিশ্বের গ্রিন ফ্যাক্টরির তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।
সরকার শ্রমিক-মালিক-ব্যবস্থাপনার সুসম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে থাকে উল্লেখ করে শ্রমিকদের কল্যাণে তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদেেপর কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শ্রমিকদের অধিকার রার স্বার্থে ইপিজেড শ্রমিক কল্যাণ সংঘ ও শিল্প সম্পর্ক আইন-২০১০ প্রণয়ন করেছি। এই আইনের আওতায় ইপিজেডের শ্রমিকেরা গোপন ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ ট্রেড ইউনিয়নের ন্যায় শ্রমিকদের স্বার্থ রায় কাজ করতে পারেন। বিগত ৭ বছরে আমরা ইপিজেডের শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি দুইবার বৃদ্ধি করেছি। ইপিজেডের শ্রমিকেরা বিনামূল্যে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। নারী শ্রমিকেরা মাতৃত্বকালীন ছুটি, ইপিজেডে বেপজা পাবলিক স্কুল ও কলেজগুলোতে শ্রমিকদের ছেলেমেয়েরা কম খরচে লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অধিকাংশ ইপিজেডেই ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় শ্রমিকদের এসব সুবিধাদি এবং কর্মেেত্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বেপজা ও বিনিয়োগকারীদের ধন্যবাদ জানান।
শেখ হাসিনা শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, আমরা শ্রমিকদের স্বার্থ রায় সর্বদা সচেষ্ট। ইপিজেডের বাইরের পোশাক খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা বৃদ্ধির জন্য আমরা নিম্নতম মজুরি কমিশন গঠন করেছি। এর আগে আমরা দুদফা বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী কোনোরকম উসকানিতে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্যও এ সময় শ্রমিকদের সতর্ক করেন।
দুই.
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক স্বপ্নের বাস্তবরূপ প্রদানে নিবেদিত কর্মযজ্ঞের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ-বেপজা। বেপজার সাফল্যগাথা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে করেছে গর্বিত ও সম্মানিত। আধুনিক শিল্পাঞ্চলের অগ্রযাত্রায় বেপজা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে গতানুগতিক বাধা বিপত্তি এড়িয়ে চলেছে আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে। সুরক্ষিত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইত্যাদির মাধ্যমে বেপজা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী ও সুদৃঢ়করণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা বাংলাদেশে ইপিজেডের পথিকৃৎ। এই ইপিজেডের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় দেশে আরও ৭টি ইপিজেড স্থাপিত হয়েছে, যার অধিকাংশের যাত্রা শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। তিনি পিছিয়ে পড়া উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে উত্তরা, ঈশ্বরদী ও মংলা ইপিজেড স্থাপন করেছেন। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত কোনো একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় যে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের ইপিজেডসমূহ।
তিন.
বাংলাদেশের বেশকিছু প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এদের মধ্যে বেপজা অগ্রণী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ২ হাজার ৩০৭ দশমিক ২৭ একর এলাকা সংবলিত ৮টি ইপিজেড জাতীয় রপ্তানি ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অবদান রাখছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ-বেপজা’কে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মুখ্য কর্মসম্পাদন সূচক (কেপিআই) এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করায় বেপজার সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে স্বীকৃতি সম্মাননা স্মারক প্রদান করেছে।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৪৩ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, রপ্তানি হয়েছে ৬ হাজার ৫৪৯ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২৬ হাজার ৬৩৮ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ক্রমপুঞ্জীভূত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫০৯ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, রপ্তানিকৃত পণ্যের মূল্য ৬২ হাজার ৮৩৯ দশমিক ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭ জন বাংলাদেশির।
বর্তমান সরকারের ৯ বছরে বেপজা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় ২০০৯-১৭ সময়ে বেপজা ৩ হাজার দশমিক ৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে ২০০ দশমিক ৯৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, ৪৫ হাজার ২৪১ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি নিয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৪৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬২০ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি ১১৮ দশমিক ৬০ শতাংশ ও ১৭৯টি শিল্প চালুকরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
চার.
বিশ্বের কাছে সহজে সংযোগ করার জন্য ইপিজেডসমূহের ভৌগোলিক অবস্থান তুলনামূলক সুবিধা প্রদান করে। প্রশিক্ষিত ও একনিষ্ঠ শ্রমগোষ্ঠীর অবিচ্ছিন্ন গতি উৎপাদনশীল দক্ষ কর্মপ্রবাহের সৃষ্টি করে। অধিকন্তু, বেপজা বিনিয়োগকারীদের সাশ্রয়ী খরচে শিল্প-কারখানা নির্মাণে অবকাঠামোগত ও ইউটিলিটি সুবিধাসহ প্লট এবং আদর্শ কারখানা ভবন প্রদান করে থাকে।
বেপজা শুধু ইপিজেডেই সবুজায়ন করার চেষ্টা করেনি বরং ইপিজেডের প্রতিষ্ঠানসমূহকে সবুজায়নে উৎসাহিত করেছে। বেপজা পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ইপিজেডে উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন পরিবেশবান্ধব সেবামূলক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে।
পাঁচ.
বেপজা কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও শ্রমিক কল্যাণে বদ্ধপরিকর। ইপিজেডসমূহের কর্মসংস্থানের আকারে এটাই প্রতীয়মান যে নারীর ক্ষমতায়নসহ বিপুল কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে বেপজা। ইপিজেডের মোট কর্মসংস্থানে দুই-তৃতীয়াংশ নারী। সরকার ইপিজেডে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং কল্যাণের জন্য জাতীয় সংসদে ‘ঞযব ঊচত ডড়ৎশবৎং ডবষভধৎব অংংড়পরধঃরড়হ ধহফ ওহফঁংঃৎরধষ জবষধঃরড়হং অপঃ, ২০১০’ আইন পাস করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় বিগত ৭ বছরে ২ বার ইপিজেডের শিল্প শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। উপরন্তু শ্রমিকেরা তাদের বেতনের সাথে বেসিকের ওপর ১০ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, ফ্রি মেডিকেল, খাবার ও যাতায়াত সুবিধা পাচ্ছে। এছাড়াও তারা যানবাহন ভাতা ও নাইট অ্যালাউন্স, বাড়ি ভাড়া, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ওভারটাইম উৎসব ও উপস্থিতি ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ইন্স্যুরেন্স ও অন্যান্য সুবিধাদিও পাচ্ছে। ইপিজেডের শ্রমিকদের সমস্যা নিরসনে লেবার ও অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল রয়েছে।
বেপজা তার শিল্প-সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তা ও পরিবেশ কাউন্সেলর কাম পরিদর্শকবৃন্দের মাধ্যমে সামাজিক ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সসহ নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করেছে। প্রত্যেক ইপিজেডে বেপজার রয়েছে সুদক্ষ অগ্নি নির্বাপণকারী দল, যারা নিয়মিতভাবে অগ্নি নির্বাপণ সচেতনতার মহড়ার আয়োজন করে। ইপিজেডের প্রকৌশল বিভাগ নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের স্বার্থে বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করছে।
শেষ কথা
ইপিজেডের শ্রমিকসহ বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য বেপজা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। উল্লেখযোগ্য হলো বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ-বেপজা’কে সর্বোচ্চ রক্তদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। বেপজা ‘বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার ২০১৫ ও ২০১৬’ অর্জন করেছে। লন্ডনভিত্তিক এফডিআই ম্যাগাজিন, দি ফিন্যানশিয়াল টাইমস চট্টগ্রাম ইপিজেডকে পৃথিবীর মধ্যে তৃতীয় ইবংঃ ঈড়ংঃ ঈড়সঢ়বঃরঃরাব জোন, ২০১০-১১ সালের জন্য চতুর্থ ইবংঃ ঊপড়হড়সরপ চড়ঃবহঃরধষ জোন হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। ঋউও এষড়নধষ ঋৎবব তড়হব ড়ভ ঞযব ঋঁঃঁৎব ২০১২-১৩ এ নবম স্থান অর্জন করেছে চট্টগ্রাম ইপিজেড।
বেপজা আজ বাংলাদেশের একটি অন্যতম সফল সংস্থা। আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তাদের কাছে দেশের ইপিজেডসমূহ এখন বিনিয়োগের সুবর্ণভূমি হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, স্বল্পতম উৎপাদন ব্যয়ে শান্তিপূর্ণ শিল্পবান্ধব কর্ম-পরিম-লের কারণে বিশ্ববাজারে বেপজা একটি ব্র্যান্ড। অর্থনৈতিক অঞ্চলের গর্বিত অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ ইপিজেড কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ১৫০ একর এলাকা নিয়ে চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই-এ বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সরকারের অন্যান্য সংস্থার পাশাপাশি বেপজাও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।