অর্থনীতি

ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ইস্যুতে নতুন ব্যাংকিং আইন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালকদের টানা ৩ মেয়াদে ৯ বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে আইন সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন ও সংসদে এ আইন পাস করেছে সরকার। সংসদে এ আইন পাস হওয়ায় একটি ব্যাংকে এক পরিবারের ৪ জন একইসঙ্গে পরিচালক থাকার সুযোগ পেলেন।
বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালকরা ৩ বছর করে ২ মেয়াদে টানা ৬ বছর পরিচালক থাকতে পারেন। ২ মেয়াদ শেষে ৩ বছর বিরতি দিয়ে আবারও ৩ বছরের জন্য পরিচালক হতে পারেন। এটাতে পরিবর্তন এনে বলা হয়েছে কোনো ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক একনাগাড়ে ৯ বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। ৩ বছর গ্যাপ দিয়ে আবার ৯ বছর থাকতে পারবেন। ৩ বছর গ্যাপ দিয়ে দিয়ে ৯ বছর করে কারও আমৃত্যু ব্যাংক পরিচালক থাকতে আইনে কোনো বাধা নেই বলেও জানানো হয়।
ব্যাংক পরিচালকদের সুযোগ বাড়িয়ে আইন সংশোধন করতে ব্যাংকারদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এতদিন কোনো ব্যাংকে একই সময়ে একই পরিবারের ২ জনের বেশি সদস্য পরিচালক পদে থাকতে পারতেন না। ওই ধারা সংশোধন করে একই পরিবার থেকে ৪ জন পরিচালক করার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই পরিবার অর্থায়ন করে, ইনভেস্টমেন্টও তারাই করে। পারিবারিকভাবে ইনভেস্ট করেন এজন্য তাদের এফিলিয়েশন বা মায়া থাকে। ব্যাংক মালিকদের দাবি ছিল যারা প্রতিষ্ঠাকালে পরিচালক হিসেবে ইনভেস্ট করেন তাদের পরে কিছু বলার থাকে না। অন্য লোকজন এসে মাঝখানে কিছু নিয়ে চলে যায়। যারা ফাউন্ডিং ডাইরেক্টরস, তাদের যেন একটা রোল থাকে। একই পরিবার থেকে কোনো ব্যাংকে ৪ জন পরিচালক থাকলে ভালো-মন্দ দুটোই হতে পারে বলে মন্তব্য করে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, ভালো মানুষরা হ্যান্ডেল করলে ভালো হবে।
এতদিন বিশেষায়িত ব্যাংক ছাড়া অন্য ব্যাংকগুলোকে পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনোনয়নের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হত। সংশোধিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নির্বাচন বা মনোনয়নের পর তাকে নিয়োগ দেয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। পরিচালক পদে সরকার কাউকে মনোনয়ন দিলে তার েেত্রও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। কোনো ব্যাংকের পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে কাউকে নির্বাচিত বা মনোনীত করার পর বাংলাদেশ ব্যাংক তা অনুমোদন না দিলে তার নিয়োগ কার্যকর হবে না বলেও জানানো হয়।
১৯৯১ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন পাস হওয়ার পর থেকে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালকদের মেয়াদ সম্পর্কিত ধারাটি ৫ বার সংশোধন করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালে ধারাটি সংশোধন করা হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইনে তিনটি ধারার পরিবর্তনে বাংলাদেশ ব্যাংকও সম্মতি দিয়েছে জানিয়ে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে ভালো হবে ভেবেই সংসদ সদস্যরা এতে সম্মতি দিয়েছেন। স্টেকহোল্ডার যারা আছেন সবাই এর সঙ্গে একমত হয়েছেন।
ব্যাংক পরিচালকদের সুযোগ বাড়িয়ে আইন সংশোধনে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছিলেন বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তারা। তাদের দাবির পরিপ্রেেিতই ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০১৭ সংসদে পাস হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মূলত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকদের দাবিই মেনে নেয়া হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নতুন সংশোধনী পাস হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মতা খর্ব হওয়ার পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে স্বদেশ খবরকে বলেন, করপোরেট গভর্ন্যান্সের দিক থেকে ব্যাংক কোম্পানি আইনে এ ধরনের পরিবর্তন আমরা কখনই ভালো চোখে দেখি না। এমনিতেই দেশের ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশের ২৫-২৬টি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছে। দেশের অর্ধেক ব্যাংকে পর্যবেক নিয়োগ দেয়া অবস্থায় যদি ব্যাংক কোম্পানি আইনে এ ধরনের সংশোধনী আনা হয় তাহলে সেটি অপ্রত্যাশিত। তিনি বলেন, এমনিতেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব নেই। নতুন আইন হওয়ায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপরও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃত্ব হারাবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে এ ধরনের পরিবর্তন আনার আগে সংশ্লিষ্ট সব পরে সঙ্গে আলাপ-আলোচনার দরকার ছিল।
যদিও তাদের দাবির কোনোটিই অযৌক্তিক নয় বলে মনে করেন বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তারা। বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার এ প্রসঙ্গে স্বদেশ খবরকে বলেন, ৫-৭ বছর ধরেই আমরা ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। আমাদের দাবিগুলো যৌক্তিক হওয়ায় সরকার ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে নতুন আইন পাস করেছে। তিনি বলেন, আমরা ব্যাংক তৈরি করলাম। পরবর্তীতে যদি আমরাই ব্যাংকে না থাকতে পারি, তাহলে তা চালাবে কে? আমার তৈরি করা বাড়ির প্রতি আমার মায়া-দরদ যে ধরনের থাকবে, সেটি অন্যদের থাকার কথা নয়। দেশের বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বতন্ত্র পরিচালকরা ব্যাংক পরিচালনা করবেন। কিন্তু তারা পরিচালনা করলে ব্যাংক ভালো থাকবে, এর নিশ্চয়তা কে দেবে? ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যের েেত্র কোনো সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত নয়। বিশ্বে অনেক ব্যাংক আছে, যেগুলো একটি পরিবার দিয়েই সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলামও মনে করছেন, ব্যাংকিং আইনে সংশোধনী আনার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তিনি স্বদেশ খবরকে বলেন, কেন আইন পাস করা হলো সে বিষয়ে কোনো যুক্তি উপস্থাপন করা হয়নি। এমনিতেই ব্যাংকিং খাত খেলাপিতে জর্জরিত। সার্বিকভাবে অনেক ব্যাংকে সুশাসনের অভাব রয়েছে। এখনও অনেক ব্যাংকে একই পরিবারের ৩-৪ জন পরিচালক আছেন। আইন পাসের কারণে নতুন করে ব্যাংকগুলোতে পরিবারতন্ত্র আরো বেড়ে যাবে। ফলে ব্যাংকের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে, বাড়বে খেলাপির পরিমাণ। যার নেতিবাচক প্রভাব শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়বে।