প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাঙ্গামাটিতে ৪০০০তম পাড়াকেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী : শান্তিচুক্তির বেশিরভাগই বাস্তবায়িত ॥ উন্নয়নের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান শেখ হাসিনার

নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্গম পার্বত্য এলাকায় বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী ৪০০০তম পাড়াকেন্দ্রের উদ্বোধন হয়েছে। ২১ জানুয়ারি রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী ও শিশুর সকল ধরনের মৌলিক সামাজিক সেবা নিশ্চিত করতে এই ৪০০০তম পাড়াকেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের সহযোগিতায় ১৯৮০ সাল থেকে ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আইসিডিপি) পার্বত্য তিন জেলাÑ রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানে বাস্তবায়িত হয়ে আসছে। তখন থেকেই ইউনিসেফের সহযোগিতায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মা, শিশু ও কিশোরীদের উন্নয়নে চলছে বিশেষ কার্যক্রম। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই প্রকল্পেরই এক অন্যন্য আবিষ্কার পাড়া সেন্টার বা পাড়াকেন্দ্র। সরকারের বিভিন্ন রকম সেবা বিভিন্ন পাড়ার জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়াই এই কেন্দ্রের কাজ। এর মধ্যে রয়েছে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ, প্রাক-স্কুল শিা, পুষ্টি বিষয়ক শিা, ভিটামিন এ ক্যাপসুল ও আয়রন ট্যাবলেট বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবার আওতায় মা ও শিশুর টিকা নিশ্চিতকরণ, জন্ম নিবন্ধন, শিশুবিবাহ রোধ, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহার ও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, বিভিন্ন তথ্য সংবলিত উঠান বৈঠক পরিচালনা করা ইত্যাদি। এছাড়া, প্রতিটি পাড়া সেন্টারে কিশোর-কিশোরীর বিকাশের সুব্যবস্থাও রয়েছে। ১৯৮০ সালে ১১টি মৌজায় ৩ হাজার পরিবার নিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি বর্তমানে ৩ হাজার ৫১৯টি পাড়ায় সেবা প্রদান করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং ইউনিসেফের সহযোগিতায় রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলার মিটিঙ্গাছড়িতে পাকা দালান বিশিষ্ট ৪০০০তম পাড়াকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উসেসিং-এর সভাপতিত্বে পাড়াকেন্দ্রের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আরএএম ওবায়দুল মুক্তাদীর চৌধুরী এবং ইউনিসেফের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ এডওয়ার্ড বেইগবেডার বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা প্রদান করেন এবং ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক, আমন্ত্রিত অতিথি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাড়াকেন্দ্রেগুলোর ৪০০ জন সদস্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাড়াকেন্দ্র নিয়ে একটি ভিডিও তথ্যচিত্রও পরিবেশিত হয়।
এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের প্রতি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শান্তিচুক্তির বেশিরভাগই ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষকে আমি বলব, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কারণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমি-জমার মালিকানা সেই ব্রিটিশ আমলে করা আইন দিয়ে নয় বরং আমাদের সব জায়গার মানুষ যেন তাদের ভূমির মালিকানা পায়, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ যেন তাদের ভূমির মালিকানা পায়Ñ সেটাই আমরা নিশ্চিত করতে চাই। সেটা মাথায় রেখেই আমি সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের একটা অঞ্চল অবহেলিত থাকবে এটা সরকার চায় না। পার্বত্য শান্তিচুক্তি করেছে তাঁর সরকার এবং এজন্য এটার বাস্তবায়নও সরকার করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা আড়াইশর মত সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করে নিয়েছি এবং সেখানকার সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) বিওপি তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। প্রত্যেকটা মানুষের জীবন মান উন্নয়নের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যারা অস্ত্র সমর্পণ করেছিল তাদের পুলিশ এবং আনসার-ভিডিপিতে চাকরি দেয়া হচ্ছে। তাদের জন্য প্রয়োজনে নীতিমালা পর্যন্ত শিথিল করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের উন্নত প্রশিণের ব্যবস্থার পাশাপাশি তারা সেদ্ধ চাল খেতে পারে না, তাই আতপ চালের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল তাদের প্রশিণের সময়। এভাবে তাদের জন্য প্রতেকটি উদ্যোগ অত্যন্ত যতœসহকারে করছে তাঁর সরকার।
প্রধানমন্ত্রী পরে চিটাগাং হিলট্রাক্টস জার্নি টুওয়ার্ডস পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সার্বিক উন্নয়ন তাঁর সরকারের একটি অন্যতম দায়িত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০ বছর এই অঞ্চলের মানুষ সম্পূর্ণ অবহেলিত ছিল। এই অঞ্চলে কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। সেই সংঘাতপূর্ণ অবস্থা থেকে উত্তরণে শান্তিচুক্তির ভূমিকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির ফলে সেই সংঘাতপূর্ণ অবস্থা থেকে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থায় আসতে সম হই।
প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার দেয়া শিার কথা উল্লেখ করে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সবসময় শিা দিয়েছেন, শান্তি হচ্ছে উন্নয়নের পূর্বশর্ত। কাজেই নিজের দেশের অভ্যন্তরেই কোথাও কোন অশান্তি থাকুক সেটা আমরা চাই না। সেই ল্য বাস্তবায়নেই তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার মৃত্যুর পর ৭৬ সাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তির শুরু। শেখ হাসিনা বলেন, ’৭৫-পরবতী সামরিক সরকারগুলোর ভ্রান্তনীতির কারণেই (জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ২০ অক্টোবর এক অধ্যাদেশ বলে (নম্বর-৭৭) পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেন।) ১৯৭৬ সালে শান্তিবাহিনী সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। এই অবস্থা চলতে থাকে পরবর্তী দুই দশক পর্যন্ত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে আমি পার্বত্য সমস্যাকে রাজনৈতিক বলে বিবেচনায় নেই। এরই ধারাবাহিকতায় কোনো তৃতীয় পরে মধ্যস্থতা ছাড়াই আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স¦ারিত হয়। স্বাধীনতার পর জাতির পিতার তিনবার পার্বত্য অঞ্চল সফরের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পার্বত্য বোর্ড গঠন করা থেকে, সাংস্কৃতিক এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার এই অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। তিনি যে সংবিধান দিয়েছিলেন সেখানে এই ুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য চাকরি-লেখাপড়াসহ প্রত্যেকটি েেত্র তাদের জন্য বিশেষ কোটার ব্যবস্থা করে যান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরাও সরকার গঠনের পর সবসময় এটাই মাথায় রেখেছি কিভাবে এই অঞ্চলের মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন কার্যকর করা যায়।
শিাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আমরা এই অঞ্চলে যেমন সরকারিভাবে রাঙ্গামাটিতে বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছি, সেইসঙ্গে আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেরও অনুমতি দিচ্ছে সরকার। পার্বত্য উপজেলাগুলোতে তাঁর সরকারের উদ্যোগে কারিগরি কলেজ করে দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনের সেবা যেন মানুষ পায় সেজন্য প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। নতুন উপজেলা এবং ইউনিয়ন করে দিচ্ছে।
তাঁর সরকারের ল্য দেশের মানুষের সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই উন্নয়নটা সুষম হবে। আলাদাভাবে কারো একার উন্নয়ন নয়। শান্তিচুক্তির আলোকেই তাঁর সরকার বাংলাদেশের একটা বিশাল অংশের এই পার্বত্য জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নের ল্য বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। যার ফলে ওই অঞ্চলের মানুষ এখন যথেষ্ট অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য অর্জন করেছে।
পার্বত্য জনগণের জন্য পাড়াকেন্দ্রভিত্তিক প্রকল্প আইসিডিপি শেষ হয়ে যাওয়ার প্রেেিত সাসটেইনেবল সোশ্যাল সার্ভিসেস অন চিটাগাং হিল ট্রাক্টস (এসএসএস সিএইচটি) নামের একটি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পাড়াকেন্দ্র প্রকল্পটা যেহেতু শেষ হয়ে যাচ্ছে তাই এটাকে শেষ করে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নতুন একটা প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। তাঁর সরকার পুরনো প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে না টেনে নতুনভাবে আবার যাত্রা শুরু করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী পার্বত্যবাসীদের আশ্বস্ত করে বলেন, এসব প্রকল্পের মানুষগুলোকে এই প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে আরো বেশি মানুষ নিয়েই নতুন প্রকল্প কার্যকর করা হবে। সেখানে আশঙ্কার কিছু থাকবে না।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকার ঘোষিত ভিশন-২০২১ এবং ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নের পার্বত্য ুদ্র নৃগোষ্ঠীকে নিয়েই এগিয়ে যেতে চান উল্লেখ করে বলেন, এ জন্য ুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা বিভিন্ন অঞ্চলে পড়ে আছে তাদের উন্নয়নে সরকার বিশেষভাবে নজর দিয়েছে এবং বিশেষ প্রকল্প নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল পার্বত্যবাসী পাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সেখানে এখন ফলমূল প্রভৃতির চাষ হচ্ছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সে সব এখন সমতল ভূমিতেও চলে আসছে। সরকার এখানে ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে চায়। তাতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের ভ্যালু এডিশন করে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় পার্বত্য তাঁত শিল্পেরও ভূয়সী প্রশংসা করে এটি বিশ্বদরবারে তুলে ধরাই তাঁর ল্য বলে বর্ণনা করেন।
পার্বত্য অঞ্চলের প্রতেকটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাঁর সরকার পদপে গ্রহণ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চাহিদা মতো সংশ্লিষ্ট আইনগুলোকে যুগোপযোগী করা হয়েছে। সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে যাতে এই অঞ্চলের কোনো মানুষ আর যেন দরিদ্র না থাকে। পরে প্রধানমন্ত্রী মিটিঙ্গাছড়ির স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং হোটেল সোনারগাঁওয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।