খেলা

রকেট ত্রিদেশীয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ

ক্রীড়া প্রতিবেদক : রকেট ত্রিদেশীয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে গেলেও প্রথম হোঁচট খেয়েছে ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত শ্রীলংকার সঙ্গে ফিরতি ম্যাচে। ওই ম্যাচে শ্রীলংকার কাছে গো-হারা হেরেও ২৭ জানুয়ারি টুর্নামেন্টের ফাইনালে শ্রীলংকারই মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ফাইনালে শ্রীলংকা ৭৯ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে বাংলাদেশকে। প্রথমে ব্যাট করে শ্রীলংকা ২২১ রানের মামুলি সংগ্রহ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশের প্রতি। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ১৪২ রানে অল আউট হয় বাংলাদেশ। ফিল্ডিংয়ের সময় ইনজুরিতে পড়ায় সাকিব আল হাসান ব্যাট করেননি। বাংলাদেশ মূলত প্রথম পর্বের শেষ ম্যাচে যেভাবে শ্রীলংকার কাছে আত্মসমর্পণ করে ফাইনাল ম্যাচেও বাংলাদেশ একইভাবে পরাজয় বরণ করে। এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ আসলে পরাজিত হয় হাতুরাসিংহের অভিজ্ঞতার কাছে। হাতুরাসিংহে বাংলাদেশ দলের কোচিং ছেড়ে দিয়ে শ্রীলংকার কোচ হন। বাংলাদেশ সফর দিয়েই হাতুরাসিংহে তার শ্রীলংকান কোচিং মিশন শুরু করেন। প্রথম মিশনেই তিনি তার সদ্য সাবেক হওয়া সতীর্থদের মন ভেঙে দিয়ে শ্রীলংকাকে রকেট ত্রিদেশীয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন করেন।
শ্রীলংকার বিপক্ষে ফিরতি ম্যাচে বিশাল হারের পরও আশার কথা, প্রিয় দলের এমন একতরফা হারের পরও গ্যালারি দুয়ো দেয়নি। ১২টার ম্যাচ ৩টা ৮ মিনিটে শেষ হলেও সেলফি তোলায় ভাটা পড়েনি দর্শকমহলে। এই নিস্তরঙ্গ মনোভাবের কারণ আচমকা ৮২ রানে গুটিয়ে যাওয়া দেখে ভড়কে যাওয়ার মনোভাব মাশরাফিরা সাফল্যের সঙ্গে দূর করেছেন দর্শকমন থেকে। ম্যাচের পর ওয়ানডে অধিনায়কের কণ্ঠেও পরো সেই ঘোষণা। একদিক দিয়ে ভালো হলো যে ফাইনালের আগে একটা ওয়েকআপ কল (সতর্কঘণ্টা) পেয়ে গেল দল। কিন্তু সতর্কঘণ্টা পেয়েও মাশরাফির দল শ্রীলংকাকে হারাতে পারলো না সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও।
ক্রিকেটে ল অব অ্যাভারেজ যেমন খাটে, তেমনি সময়ের মিছিলে দুঃসময় উঁকি দিলে অতি আত্মবিশ্বাস মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে না আর। নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না, আজকের নাগরিক প্রার্থনায় মাশরাফিদেরও ব্র্যাকেটবন্দি করা হবে কি না। সেটার শব্দাবলি হতে পারে, সতর্কঘণ্টা শুনে যেন ২০১৪ সালের স্মৃতি নয়, সাম্প্রতিক নৈপুণ্যই ফিরিয়ে আনেন ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে।
২০১৪ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে শেষবার একশর নিচে অল আউট হয়েছিল বাংলাদেশ। প্রায় সাড়ে ৩ বছর পর আরেকটি বিপর্যয়ে তাই ঘাবড়ে যাওয়ার খুব কারণ নেই। তবে উৎকণ্ঠার জায়গা কিন্তু দোর্দ- প্রতাপে জেতা প্রথম ৩ ম্যাচেও আছে। এক নম্বরে তামিম ইকবাল দীর্ঘদিন ধরেই অপ্রতিরোধ্য। এই সিরিজে তিনে উঠে আসা সাকিব আল হাসান আর তার ব্যাটেই কিন্তু প্রথম ৩ ম্যাচে প্রতিপকে হেসেখেলে হারিয়েছে। সেই দুজন শ্রীলংকার বিপক্ষে একযোগে ব্যর্থ। সাকিব রান আউট হয়েছেন আর সুরঙ্গ লাকমলের লাফিয়ে ওঠা বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন তামিম। এরপরই চিচিং ফাঁক বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ের অন্দরমহল। মাঝখানে অবশ্য লাকমলের একটি বল স্টাম্পে টেনে এনে এনামুল হকের বিদায়ের ঘটনায় অবশ্য কোনো আহাজারি শোনা যায়নি গ্যালারিতে। নিয়মিত ব্যর্থ যিনি, তার জন্য সেলফিযুগের ক্রিকেট দর্শকদের ভাবনার সময় কোথায়? বরং যত দুর্ভাবনা মিডল অর্ডার নিয়ে। এ জায়গা ছেড়ে সাকিবের টপ অর্ডারে উঠে যাওয়ার পর টিম ম্যানেজমেন্টের আশা ছিল এই সুযোগটা লুফে নেবেন মাঝের দিককার ব্যাটসম্যানরা। এ জায়গায় মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদ উল্লাহ পরীতি, এক-দুটি ব্যর্থতায় তাদের শূলে চড়ানো বাড়াবাড়িই হবে। কিন্তু ছয় নম্বরে খেলতে নামা সাব্বির রহমান এ কেমন ধারার মানসিকতা নিয়ে থিসারা পেরেরাকে মিড অনের ওপর দিয়ে চালাতে গেলেন? বোলার মিড অন ওপরে তুলে এনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেই সেটি নিতে হবে? বিশেষ করে দল যখন ৫৭ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে রক্তশূন্যতায় ভুগছে? অবশ্য এর আগে লক্ষ্মণ ধনঞ্জয়কে রিভার্স সুইপ খেলে নিজের উদ্ধত মনোভাবের জানান দিয়েছিলেন সাব্বির নিজেই। ৫০তম ওয়ানডে খেলতে নামা একজন ক্রিকেটারের কাছে দল কখনোই এতটা অপ্রয়োজনীয় আক্রমণাত্মক ব্যাটিং আশা করে না। হাবভাবে বোঝা গেল, অধিনায়কের মতো টিম ম্যানেজমেন্টও টুকে নিয়েছে সাব্বিরের অ্যাপ্রোচ। অবশ্য চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে সাব্বির আউট হওয়ার পরও দুইশ রানের ইনিংসের স্বপ্ন দেখেছিলেন মাশরাফি। বড় দলের বেলায় এমনটা তো হরহামেশা হয়। একটা বিপর্যয় সামলে মাথা তুলে দাঁড়ানোর অসংখ্য উদাহরণ আছে ক্রিকেট ইতিহাসে। গত বছর আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে কিংবা জিম্বাবুয়ের বিপে আগের ম্যাচেও তো তেমনটা করে দেখিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের ভেলা ভাসিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে নিয়মিত খেলে যাওয়া নাসির হোসেনের স্কোরগুলোয় ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে তলিয়ে যাওয়ার নমুনাÑ ০, ০, ২ এবং ৩। ফাইনালেও তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে ২৭ জানুয়ারির অগ্নিপরীায় ব্যর্থ হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
সবচেয়ে আশা এবং আশঙ্কার ব্যাপার হলো মিরপুরের উইকেট নিয়ে নাকি কোনো ব্যাটসম্যানই অভিযোগ করেননি, ম্যাচের পর এমনটাই জানিয়েছেন মাশরাফি। আশা জাগানিয়া বিষয়টি হলো নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে উইকেটকে ঢাল বানাননি কেউ। আর আশঙ্কার কথা না বললেও ভালো উইকেটেও পারেননি ব্যাটসম্যানরা। তাহলে কি দুর্ধর্ষ বোলিং করেছেন লাকমলরা? সেরকমটা মনে হয়নি। এই সিরিজে বাংলাদেশ দলের ব্যান্ডওয়াগন সাকিবের রান আউট আর তামিমের লাফিয়ে ওঠা বলে আউট হওয়া ছাড়া আর কোনো উইকেট পতন নিয়েই আপে শোনা যায়নি অধিনায়কের কণ্ঠেও। ঘুরেফিরে একই কথা বলেছেন মাশরাফি, সাকিব-তামিম তো প্রতিদিন করে দেবে না। অন্যদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। সে আর তারা নিলেন কোথায়? হঠকারী ব্যাটিংয়ে বরাদ্দ ওভারের অর্ধেকটা ফুরোনোর আগেই শেষ বাংলাদেশের ইনিংস।
ম্যাচের শেষ ১১.৫ ওভার আরো একতরফা। ৮২ রান পুঁজি করে শ্রীলঙ্কাকে হারানোর অবিশ্বাস্য স্বপ্ন দেখেননি মাশরাফি। তাই বোলিং প্ল্যানেও বড় পরিবর্তন, কোনো রকমে ম্যাচ শেষ করে ফাইনালের জন্য ছক তৈরির কাজে বাড়তি সময় বের করে নেয়া যদি যায়। শ্রীলঙ্কার দুই ওপেনারও বিমুখ করেননি বাংলাদেশকে! কিন্তু শেষ বেলায় ত্রিদেশীয় ক্রিকেট ফাইনালে শূন্যহাতেই ফিরতে হলো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে।