ফিচার

স্বাস্থ্যতথ্য

সুস্থ শরীরের জন্য যখন যে পরিমাণ পানি পান করবেন

সুস্থ শরীর পেতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা যে খুব দরকারি, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু প্রতিদিন ঠিক কতটা পানি পান করা দরকার তা নিয়ে আছে নানা মুনির নানা মত। যেমন কম পানি পান করলে শরীরে ডিহাইড্রেশনের সমস্যা হতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত পানি পান করলেও দেখা দিতে পারে নানা সমস্যা। তাই সঠিক পরিমাণ মেনে পানি পান করুন। কিন্তু ঠিক কতটা পানি পান করা দরকার? কেউ বলেন, দিনে ৮ গ্লাস পানি খান তো কেউ বলেন, দিনে ২ লিটার পানিই যথেষ্ট। জানেন কি, আমাদের প্রত্যেকের শরীরে পানির চাহিদা সমান নয়? শরীরের গড়ন এবং আমরা কে কতটা কাজ করি, কী ধরনের খাবার খাই, তার ওপর নির্ভর করে শরীরে পানির চাহিদা। আপনি প্রতিদিন কতটা পানি খাবেন, তা ঠিক করতে রয়েছে একটা সহজ ফর্মুলা।

নিজের ওজন জানুন
প্রথমেই কিলোগ্রামে নিজের শরীরের ওজন মেপে নিন। কারণ একজন ৪৫ কিলো ওজনের মানুষ যতটা পানি খাবেন, একজন ৮৫ কিলো ওজনের মানুষ নিশ্চয় তা খাবেন না।
৩০ দিয়ে ভাগ করুন
আপনার ওজনকে ৩০ দিয়ে ভাগ করুন। যে সংখ্যাটা বেরোবে, ঠিক ততো লিটার পানিই আপনার দৈনিক প্রয়োজন। ধরুন, যদি আপনার ওজন হয় ৬০ কিলো, তবে আপনি দৈনিক ২ লিটার পানি খাবেন।
পরিশ্রম করলে অতিরিক্ত পানি
আপনি কি রোজ ওয়ার্ক আউট বা হাঁটাহাঁটি করেন? তাহলে কিছু অতিরিক্ত পানি আপনার প্রয়োজন। পরিশ্রমের কাজ করলে আমাদের শরীরে ঘাম হয়। ঘামের মাধ্যমে শরীরের পানি খানিকটা বেরিয়ে যায়। তাই তা পূরণ করার জন্য একটু অতিরিক্ত পানি পান করা প্রয়োজন। যদি আপনি রোজ আধঘণ্টার ওয়ার্ক আউট করেন, তাহলে আরও ৭০০ মিলিলিটার পানি আপনাকে অতিরিক্ত পান করতে হবে।
খাবারেও পানি আছে
ফল, শাকসবজিতেও কিছু পরিমাণ পানি থাকে। তাই এসব খাবারের মাধ্যমেও পানি আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। আমরা রোজ যে পরিমাণ পানি খাই, তার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আসে খাবার থেকে। তাই আপনি যদি সবজি-ফল বেশি করে খান, তবে পানি একটু কম খেলেও তি নেই। কিন্তু ফাস্টফুড, ভাজাভুজি খেলে শরীরে পানির চাহিদা বেড়ে যায়। গবেষকদের মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের দৈনিক ২ দশমিক ৬ লিটার ও পূর্ণবয়স্ক নারীর দৈনিক ২ দশমিক ১ লিটার পানি দরকার হয়। কিন্তু এর পুরোটা পানি পান করার মাধ্যমে আসে না। পানি ছাড়াও অন্যান্য খাবারের মধ্যে থাকা জলীয় অংশ এবং বিপাক ক্রিয়ায় উৎপন্ন পানি মিলিয়েই এই চাহিদা পূরণ হয়। চা, কফি, দুধ, দই ও ফলমূলে যথেষ্ট জলীয় অংশ রয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন যে আমিষ, ফ্যাট ও শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়া হয়, তা বিপাক ক্রিয়ায় প্রায় ২৫০ মিলিলিটার পানি উৎপন্ন করে।
প্রতিদিন কতটুকু পানি পান করা উচিত
পিপাসা এবং প্রস্রাব শরীরের পানিচক্র নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা পিপাসা থাকলে পানি পান করি, টয়লেটে যাই, আবার পানি পান করিÑ পানি চক্র আবার শুরু হয়। দ্য ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটির ২০১০ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিদিন একজন সুস্থ পুরুষের অন্তত ২ লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। আর নারীর ১ দশমিক ৬ লিটার অথবা আট থেকে ১০ গ্লাস। তবে এটা নির্ভর করবে কাজ-কর্ম, স্বাস্থ্য ও ওজন এবং গরম ও ঠা-া আবহাওয়ার ওপর।
কখন বুঝবেন পানিশূন্যতায় ভুগছেন
বেশি পিপাসা লাগলে, গাঢ় হলুদ বর্ণের প্রস্রাব, প্রস্রাবে গন্ধ থাকলে বুঝবেন পানিশূন্যতা হচ্ছে; শরীরে পানির অভাব হয়েছে। এছাড়া সামান্য মাথা ব্যথা, শুষ্ক মুখ, আলস্য লাগাও পানি শূন্যতার লণ। প্রবীণ লোকেরাও কখনো কখনো পানিশূন্যতার বিষয়টি টের পান না। এদের সমস্যাগুলোও প্রায় একই ধরনের হয়। এরকম হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।
কখন বুঝবেন শরীরে বেশি পানি হচ্ছে
পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পানে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। তবে বেশি পানি পান করলে ইনটোক্সিকেশন এবং সোডিয়ামের মাত্রা অনেক নিচে নেমে হাইপোনেট্রেমিয়া হতে পারে। অনেক সময় অ্যাথলেটদের এই সমস্যা দেখা যায়। আবার কখনো শারীরিক অসুস্থতার কিছু কারণে শরীর বেশি পানি গ্রহণ করতে পারে না। কিডনি এবং হার্টের সমস্যায় এই বিষয়টি হয়। এসময় চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই পানি পান করা উচিত।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি আসে যখন মানুষকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হয়। যদি ৮ ঘণ্টার বেশি প্রস্রাব না হয়, অবসন্ন লাগে, দ্রুত হৃদস্পন্দন হয়, খুব বেশি পানির পিপাসা লাগেÑ এমনকি সেটা ডায়াবেটিস রোগীর বেলায়ও, তখন চিকিৎসকের কাছে নেয়া জরুরি। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন। বেশিও নয় আবার কমও নয়। শরীরের কথা শুনুন। তবে অস্বাভাবিক কিছু মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সুস্থতার জন্য এই প্রক্রিয়ার বাইরে ঠিক কতটুকু পানি পান করতে হবে তা নির্ধারণ করার জন্য আমাদের মস্তিষ্কে পিপাসাকেন্দ্র রয়েছে। আমাদের আবহাওয়ায় ৬ গ্লাসের মতো পানি পান যথেষ্ট হলেও কঠোর পরিশ্রম, ঘাম, গরম আবহাওয়ায় সে চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। আর আপনার পিপাসা মেটাতে এবং প্রস্রাবের রঙ ঠিক রাখতে যতটুকু পানি পান করা দরকার ঠিক ততটুকুই আপনার জন্য প্রয়োজন বলে মনে করবেন।