প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ফিচার

ওআইসির পর্যটনমন্ত্রীদের ১০ম ইসলামিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যটন ব্যবসাবাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে মুসলিম দেশগুলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান

তারেক জোয়ারদার
আধুনিক বিশ্বায়নের এ যুগে মানুষ এখন ধীরে ধীরে পর্যটনের দিকে ঝুঁকছে। তাই বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত অনেক দেশই তার দেশের অর্থনৈতিক বিকাশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ ফেব্র“য়ারি প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসির পর্যটনমন্ত্রীদের ১০ম ইসলামিক সম্মেলন (আইসিটিএম) অনুষ্ঠিত হয়। পর্যটনমন্ত্রীদের এ সম্মেলন উদ্বোধন করে প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আ ক ম শাহজাহান কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসুফ বিন আহমেদ আল ওসাইমিন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুহম্মদ ফারুক খান বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম গোলাম ফারুক অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। এছাড়া নাইজারের পর্যটনমন্ত্রী এবং সম্মেলনের বিদায়ী চেয়ারপারসন আহমেদ বথু এবং জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশনের (ইউএনডব্লিউটিও) এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ডেপুটি ডিরেক্টর অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ইসলামি ঐতিহ্যের ওপর নির্মিত একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শিত হয়। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, জাতীয় সংসদের সদস্য, সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ৩০টি রাষ্ট্রের ১৫ জন পর্যটনমন্ত্রী এবং প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনের রীতি অনুযায়ী নাইজারের পর্যটনমন্ত্রী এবং সম্মেলনের বিদায়ী চেয়ারপারসন আহমেদ বথু বক্তৃতার পরপরই পরবর্তী দুই বছরের জন্য আইসিটিএম-এর চেয়ারপারসনশিপ বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আ ক ম শাহজাহান কামালের কাছে হস্তান্তর করেন। আন্তর্জাতিক এই সম্মেলন উদ্বোধন করে পর্যটন ব্যবসাবাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে ইসলামি দেশগুলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পর্যটন এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে ইসলামি দেশগুলো বৃহত্তর সুযোগ ও সম্ভাবনা খুঁজতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। বিশ্বব্যাপী পর্যটন একটি দ্রুত বিকাশমান খাত, যা বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পর্যটন শিল্প অন্যতম ক্ষেত্র যেখানে একসঙ্গে কাজ করার বড় সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ওআইসিভুক্ত দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে আগামীতে বৃহত্তর পরিসরে সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়াতে এই সম্মেলনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অর্থনৈতিক ও ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরস্পরের কাছাকাছি আসা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে এ সম্মেলন নতুন সুযোগ ও দিগন্ত উন্মোচন করবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক বিশ্বাস, বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভিত্তিতে। ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বিনিময় নিজেদের মানোন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামিক অর্থনীতি একটা নতুন বিষয় হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। এটির বিকাশ অব্যাহত থাকবে এবং সারাবিশ্বের মুসলমানদের দ্বারাই এটি পরিচালিত হবে। ইসলামিক পণ্য ও সেবার বিশ্বব্যাপী সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এবং একটি বিশাল ভোক্তা থাকার কারণে বিশ্বাসভিত্তিক পণ্য ও সেবার সম্প্রসারণের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি অমুসলিম সম্প্রদায়ের কাছেও এ সকল পণ্য ও সেবা জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় ইসলামিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
হালাল খাদ্য, ইসলামিক অর্থনীতি, হালাল ওষুধ এবং প্রসাধনী, হালাল পর্যটন ইত্যাদি ইসলামিক অর্থনীতির বর্ধিষ্ণু খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই খাতগুলোর উন্নয়নে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে (পিপিপি) সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণের এই পর্যায়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তু সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন যাবৎ উদ্বাস্তু সমস্যা মোকাবিলা করে আসছে। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু সম্প্রতি আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। নিজ বাসভূমিতে জাতিগত নিধনের ভয়াবহ নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে বাংলাদেশ অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দিয়েছে। ওআইসিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যারা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছে, তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী।
এ বিষয়ে ওআইসির বহুমাত্রিক ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সারাবিশ্বের মুসলমানদের মিলিত কণ্ঠস্বর হিসেবে ওআইসির সকল সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতা মুসলিম বিশ্বের স্বার্থরক্ষায় সহায়ক হচ্ছে। পারস্পরিক সহযোগিতার শক্তিতে বিশ্বাস এবং যৌথ ধারণার প্রতি অনুপ্রাণিত হয়েই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে ওআইসিতে যোগদান করেন। তখন থেকেই বাংলাদেশ সকল সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। ইসলামের মহৎ মূল্যবোধগুলো যেমন ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার, একতা এবং সকলকে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে মুসলিম উম্মার সংহতিকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ জন্য তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন। পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে আমাদের দেশে সম্পদের অভাব নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুদীর্ঘ মেরিন ড্রাইভসহ বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুন্দরবন বাংলাদেশে অবস্থিত। সাগরকন্যা কুয়াকাটা অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এসব স্থান পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে। শতশত নদী জালের মতো ছড়িয়ে থেকে এই দেশকে ছবির মতো সুন্দর রূপদান করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শত শত সবুজ চা বাগান আপনাকে দিবে অবকাশ যাপনের চোখ জুড়ানো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। এছাড়াও আমাদের হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও প্রতœসমৃদ্ধ স্থানসমূহ, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক ঐতিহ্যসমূহ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সর্বোপরি বাংলাদেশের বন্ধুভাবাপন্ন মানুষ, তাদের আতিথেয়তা এবং মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মোৎসর্গের গৌরবময় ইতিহাস স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে উন্নত করতে তাঁর সরকার বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী পর্যটনের টেকসই উন্নয়নের জন্য জাতীয় পর্যটন নীতি ২০১০ প্রণয়ন এবং জাতীয় শিল্পনীতি ২০১০-এ পর্যটন শিল্পকে দ্রুত বর্ধনশীল খাত হিসেবে চিহ্নিত করায় তাঁর সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে তাঁর সরকার স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় বিনিয়োগ প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছে বলে উল্লেখ করেন।
দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে অবকাঠামোগত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে তাঁর সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, প্রমত্তা পদ্মা নদীর উপর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি ঢাকার সঙ্গে সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করবে। পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি নির্মিত হলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে পর্যটকরা সরাসরি কক্সবাজারে আসতে পারবেন। কক্সবাজারকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, এ জন্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পর্যটনসহ অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শক্তিশালী ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। এখানে সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্ঞান ও প্রযুক্তি হস্তান্তর, অভিজ্ঞতা বিনিময়, মানবসম্পদ উন্নয়ন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসরকারি খাত ও সহযোগী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়সহ শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের ক্ষেত্রসমূহকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করতে হবে।
বাংলাদেশকে পরবর্তী ২ বছরের জন্য ১০ম ইসলামিক কনফারেন্স অব ট্যুরিজম মিনিস্টারস, আইসিটিএম-এর চেয়ারপারসন নির্বাচিত করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ তার দায়িত্ব পালনকালে সহযোগিতা ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ওআইসি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পর্যটন খাত বিকশিত করতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নেবে। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি পরবর্তী দুই বছরে বাংলাদেশ সভাপতি হিসেবে দৃষ্টান্তমূলক কিছু অর্জনে সক্ষম হবে।
শেখ হাসিনা পর্যটন খাতে ওআইসির কার্যক্রমের প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতার কথা পুনর্ব্যক্ত করে এই সম্মেলনের মাধ্যমে সকল সদস্য দেশ বৃহত্তর সহযোগিতা ও আন্তঃযোগাযোগ উন্নয়নের দিকনির্দেশনা পাবে এবং বাংলাদেশে সম্মেলন উপলক্ষে আগত অতিথিদের অবস্থান আনন্দময় ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন।