কলাম

গাড়ির মালিকরা একটু সদয় হোন

অরুণ কুমার বিশ^াস
ক্ষমতার দাপট আছে জানি, ক্ষমতার খুঁটি আগলে কেউ ঘরে বসে থাকে না। কোনো না কোনোভাবে তা জাহির করতেই হবে। অনেকটা যেন কুসুমগরম নতুন প্রেমের মতো। প্রেমে পড়লে কাউকে তা জানানোর জন্য মনটা বড্ড আকুলি-বিকুলি করে। শত চেষ্টা করেও চেপে রাখতে পারে না অর্বাচীন যুবক-যুবতীরা। আমাদের সমাজেও গাড়িবান শ্রেণি রয়েছেন। এদের বড্ড টাকার গরম। নইলে সরকারি রাস্তায় গাড়ি চাপতে গিয়ে এদের এত দাপট কিসের! ঢাকা শহরের রাস্তা কি কেবল প্রাইভেট যানবাহনের জন্য, পাবলিক বাসের জন্য নয়!
এই প্রশ্ন উঠতো না, যদি আমাদের গাড়িবান বাবু-সায়েবরা একটু রয়েসয়ে গাড়িটা চালাতেন। আবার হয়ত আমার ভুল ধরে বসবেন! গাড়ি তো চালায় চালক, গাড়িবাবু তো তা চালান না। ওই হলো! বন্ধু দেখে যেমন মানুষ চেনা যায়, তেমনি চালকের গাড়ি চালানোর বহর দেখেও তার মালিকটির রুচি-পছন্দ কিছুটা হলেও মালুম করা যায়। রাস্তায় নামলেই এই হার্ট অ্যাটাক হবার জোগাড়। ভিড়ভাট্টা তো আছেই, আছে ধুলোবালি, হাউকাউ। সবচেয়ে যেটা অসহ্য এখন তা হলো প্রচ- কর্ণ পীড়াদায়ক হর্নের শব্দ। বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, রাজধানী শহরে যতগুলো যান চলাচল করে তার ৮০ শতাংশের বেশি ব্যক্তিগত যানবাহন। এসব গাড়ি জায়গা নেয় বেশি, কিন্তু যাত্রী বহন করে কম। চালকের বাইরে হয়ত একজন বা দুজন। অর্থাৎ এক হিসাবে শহরে ব্যক্তিগত গাড়ি বাড়ার ফলে সবরকম দূষণ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তা বাণিজ্যিকভাবে ভাইঅ্যাবল বা সুবিধাজনক হচ্ছে না। সোজা কথায় খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি।
সত্যিই তাই। গাড়িবান বাবুদের অকহতব্য বাদ্যবাজনার ঠেলায় আমাদের শহরবাসীর প্রাণ এখন ওষ্ঠাগত। আর দুদিন বাদেই নাভিশ^াস উঠবে। তারপর অকাল প্রয়াণ। বস্তুত একটি নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি ডেসিবলের শব্দ হলেই তাকে শব্দ দূষণ বলে। বয়সভেদে এই মাত্রা কমবেশি হতে পারে, কিন্তু ঢাকা শহরের যানবাহন চালকদের যে প্রচ- হর্নপ্রবণতা, তাকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা সহনশীল মাত্রা বলা যায় না। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ সকল প্রাইভেট গাড়ির চালক অন্তত ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে অকারণে হর্ন বাজায়। শুধু বাজায় না, হর্ন চেপে ধরে প্রায় কুড়ি সেকেন্ড থেকে আধা মিনিট। যেহেতু তারা গাড়ির জানালা তুলে দিয়ে এসির হাওয়া খায়, তাই চালক বা যাত্রী কিন্তু এই প্রচ- কর্ণকটু শব্দ শুনতে পায় না। অর্থাৎ তাদের ক্ষেত্রে শব্দ দূষণের অভিঘাত কম অনুভূত হয়। মরণ এই সানাইঅলার, মানে আমরা যারা আমজনতা, রাস্তায় চলাচল করি তাদের।
একটা ব্যাপার এখানে লক্ষণীয়। যে সকল রাস্তায় একই সাথে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলে, সেখানে হর্ন বাজানোর মাত্রা বেশি। আমি রিকশা-ভ্যানের কথা উল্লেখ করতে চাই। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, রিকশাঅলাদের আচরণ সত্যি বিব্রতকর। ওরা আইন-কানুনের পরোয়া করে না। যখন যেভাবে খুশি রিকশা চালায়। রঙ সাইড দিয়ে শুধু নয়, ওরা বিপজ্জনকভাবে গাড়ির সামনে এসে পড়ে। বিলেতে দেখেছি মানুষ মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়ে বাস কিংবা আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে চাপে। ব্যক্তিগত গাড়ি থাকলেও তারা টিউবে চেপে অভ্যস্ত। তাতে তাদের সময় ও পাউন্ড দুটোই বাঁচে। আমরাও কি পারি না আধা কিলো হেঁটে গিয়ে লাইন ধরে বাসে উঠতে! হয়ত পারি, কিন্তু পাবলিক বাসের যা দুরবস্থা তাতে জোর করে কাউকে বাসে তুলে দেয়া আর তাকে গাছে তুলে মই কেড়ে নেয়া সমান কথা! অথচ এই কর্ণপীড়াদায়ক হর্নের কারণে জনজীবন ক্রমশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। শুধু রাস্তায় নয়, হাসপাতাল, স্কুল কিংবা অফিসপাড়াতেও হর্নের কোনো বিরাম নেই। অথচ শব্দ দূষণের সবচেয়ে নির্মম শিকার হয় আমাদের বয়োবৃদ্ধ স্বজন, রোগী আর কোমলমতি শিশুরা। বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শব্দ দূষণের কারণে মানুষ অকালে শ্রবণশক্তি হারায়, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আচমকা হর্নের কারণে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক অবধি হতে পারে। এ সকল গাড়ির চালকও একই দুর্ভাগ্য বরণ করে। অকালে বধির হয়ে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কী! কেবল আইন করে কি অযথা হর্ন বাজানো বন্ধ করা সম্ভব! না করেই বা কি করে হবে! আমরা এখনও ততটা সভ্য হয়ে উঠিনি যে পরের কষ্ট হবে ভেবে নিজের স্বার্থটুকু শিকায় তুলে রাখবো। প্রচ- এক অস্থির সময় পার করছি আমরা। সবাই আগে যেতে চাই, এগিয়ে যেতে চাই। ইঁদুর দৌড়ে কোনোভাবেই পিছিয়ে পড়া চলবে না। মহামান্য হাইকোর্ট সদয় হয়ে হাইড্রোলিক হর্ন বাজানোর ওপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। হয়ত তা মানছেনও কেউ কেউ। কিন্তু সাধারণ হর্নও কি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ নয়!
শব্দ দূষণের আরো অনেক আয়োজন আছে এই শহরে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে ধুম-ধাড়াক্কা গান বাজানো এখন একরকম রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গান শুনে চিত্তের প্রশান্তির বদলে মাথা ঘোরে, গা গুলায়। পণ্যের বিজ্ঞাপনের নামে যত্রতত্র মাইক বাজানো হয়। শুধুই যন্ত্রনির্ভর কথাহীন গানের যন্ত্রণায় অস্থির নগরবাসী। আবার তা যদি হয় রাত দুপুর থেকে ভোর অবধি মানুষ তাহলে ঘুমাবে কখন! আপনি গিয়ে নিষেধ করবেন, শুনছে কে! সম্প্রতি এমন এক পরিস্থিতিতে গোপীবাগে ঘটে গেল অমানবিক একটি ঘটনা। কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবকের হাতে নির্মমভাবে খুন হলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নিজামুল হক। তিনি বিয়ে বাড়ির ছাদে চলমান নাচগানের অত্যাচার সইতে না পেরে তা বন্ধ করতে বলেছিলেন শুধু।
আমরা শব্দ দূষণ চাই না, শান্তিতে থাকতে চাই। ঘরে-বাইরে সবখানে যদি এমন অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, মানুষ তাহলে যাবে কোথায়! পরিস্থিতি উত্তরণে আইন প্রণয়ন ও আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়। আসুন আমরা শপথ নিইÑ অকারণে ভেঁপু নয়, অধিক রাতে শব্দযন্ত্র নয়। শব্দ দূষণ কমিয়ে আমরা সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারি।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক