প্রতিবেদন

ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ ২০১৭-১৮ কোর্সের গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা | স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূর্ত প্রতীক বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী

বিশেষ প্রতিবেদক
ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ (সিএসসিএসসি) ২০১৭-১৮ কোর্স-এর গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠান ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুর ক্যান্টনমেন্টের ডিএসসিএসসি-তে শেখ হাসিনা কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ডিএসসিএসসি কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল একেএম আব্দুল্লাহিল বাকি অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূর্ত প্রতীক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সুমহান দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক মোকাবিলায় এবং দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম, অবকাঠামো নির্মাণ, জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ নির্মূল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে বেসামরিক প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে আসছে।
সামরিক বাহিনী কমান্ড ও স্টাফ কলেজের অবকাঠামোগত সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, স্টাফ কলেজের বহুতল একাডেমিক ভবনসহ আরও কিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নির্মিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রতিরক্ষা নীতির অনুসরণে তাঁর সরকার ফোর্সেস গোল-২০৩০ প্রণয়ন করেছে। বিগত ৯ বছরে আমরা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছি। আমরা এই বাহিনীগুলোতে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামাদির সমন্বয় ঘটিয়েছি। এই পদক্ষেপগুলোর কারণেই আজ সশস্ত্র বাহিনী অধিকতর উন্নত, দক্ষ ও চৌকস হয়ে উঠেছে।
শুধু দেশেই নয়, বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে প্রশংসা ও সুনাম অর্জন করেছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অধীনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা, গণতন্ত্রে উত্তরণ, সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনাসহ পুনর্গঠন কার্যক্রমে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাদের সাফল্যে সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফায় ১৯৬৬ সালেই পূর্ব বাংলায় নৌ-বাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপনের দাবি উত্থাপন করেন। আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি প্রক্রিয়ায় জয়লাভ করে বিশাল সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উন্মোচিত হয়েছে ব্লু ইকোনোমির সম্ভাবনাময় দুয়ার। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নৌ-বাহিনীকে ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। নৌবাহিনীর সাবমেরিন ছিল না। সম্প্রতি অত্যাধুনিক সাবমেরিন যুদ্ধজাহাজ যুক্ত হওয়ায় নৌবাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে। আক্ষরিকভাবেই বাংলাদেশ নৌবাহিনী এখন ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে এফ-৭ বিজি যুদ্ধবিমানসহ হেলিকপ্টার ও অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র। বিমান বাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে নতুন নতুন ইউনিট, বৃদ্ধি পেয়েছে জনবল। বঙ্গবন্ধু অ্যারোনটিক্যাল সেন্টার-এর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বঙ্গবন্ধু ও কক্সবাজার বিমান ঘাঁটি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের সেনাবাহিনীর জন্ম। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এই কলেজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিম-লেও এক অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত স্টাফ কলেজে সেনাবাহিনীর ৪২টি, নৌবাহিনীর ৩৬টি এবং বিমান বাহিনীর ৩৮টি স্টাফ কোর্স সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৪১টি বন্ধুপ্রতিম দেশের ১ হাজার ৬৬ জন অফিসারও এ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তারা সকলেই নিজ নিজ দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এই সাফল্যের জন্য তিনি কলেজের কমান্ড্যান্ট, অনুষদ সদস্যবৃন্দ ও সকল অফিসারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সমর বিজ্ঞানের ওপর উচ্চতর এ প্রশিক্ষণ অর্পিত দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালনে এবং যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও আত্মপ্রত্যয়ী হতে শেখাবে। শুধু তাই নয়, এখন থেকে আরও বড় পরিসরে নেতৃত্ব প্রদানে আপনারা নিজেদের প্রস্তুত রাখবেন।
এ বছর মোট ৭ জন মহিলা অফিসার গ্র্যাজুয়েট হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর কোর্সে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিলা অফিসারের অংশগ্রহণ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এটি সশস্ত্র বাহিনী তথা বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে। গ্র্যাজুয়েট অফিসারদের স্ত্রীগণ প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন গঠনমূলক ও সামাজিক কর্মকা-ে অংশ নেয়ায়ও সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নতুন নতুন ডিভিশন, ব্রিগেড, ইউনিট ও ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠাসহ এনডিসি, বিআইপিএসওটি, এএফএমসি, এমআইএসটি, ও এনসিও একাডেমির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রতিষ্ঠা করেছে। সেনাবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক এপিসি, এআরভি, ব্যাটেল ট্যাংক, আরমার্ড রিকভারি ভেহিকেল, হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র এবং সরঞ্জামাদি ক্রয় করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, নারীর ক্ষমতায়নসহ নানা ক্ষেত্রে আমরা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, অনেক উন্নত দেশকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালে মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশকে আমরা মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করব, ইনশাআল্লাহ। মন্ত্রীবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাম-লী, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, কূটনীতিক এবং বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।