কলাম

দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী রাষ্ট্র পাকিস্তান

ড. অরুণ কুমার গোস্বামী
রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্প্রদায়িকতার পথে চলতে চলতে পাকিস্তান এখন সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানের এই পরিণতি থেকে এ দেশের সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘুসহ সব পর্যায়ের জনগোষ্ঠী এবং উপমহাদেশের সব জাতি-রাষ্ট্রের শিক্ষণীয় বিষয় আছে। শুধু মুখের কথা নয়, মনে-প্রাণে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতিশ্রুতি নিয়েই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পাকিস্তান থেকে বের হয়ে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। পাকিস্তানের বর্তমান অপমানজনক পরিস্থিতিতে সে দেশের সুবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকরা কি উপলব্ধি করছেন তার একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। পাকিস্তানের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাবা কামার টেলিভিশনের টকশো অনুষ্ঠানে তার অপমানের কথা বলে কাঁদছিলেন। সমসাময়িক বিশ্বের যেকোনো দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুধু পাকিস্তানি পাসপোর্ট থাকার কারণে অপমানিত হওয়ার সঙ্গে অতীতে পাকিস্তান শব্দটির উদ্ভাবক চৌধুরী রহমত আলীর সে দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়া এবং পাকিস্তান আন্দোলনের একমাত্র অমুসলিম সহযোগী নেতা যোগেন ম-লের প্রাণের ভয়ে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ প্রভৃতি জন্মভূমির কারণে অপমানিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা। এ রকম ঘটনার উদাহরণ পাকিস্তানে ভূরি ভূরি দেয়া যেতে পারে। পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হওয়ার পরও বাংলাদেশ কি এই পাকিস্তানি ভাইরাস থেকে মুক্ত হতে পেরেছে?
এক সময় ক্ষমতাধরদের দ্বারা, আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সহিংসতার আশ্রয় নিয়ে, অন্যদের অপমান করার পরিণামে এখন সমগ্র পাকিস্তানই অপমানিত হচ্ছে। পাকিস্তান এখন সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অবশ্য অতীতে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দ্বারা এরূপ বৈষম্য ও বিদ্বেষমূলক সাম্প্রদায়িক কর্মকা-ের জন্য দেশটির বর্তমান প্রজন্মের সাবা কামার বা এমন ধরনের কেউই দায়ী নয়। তথাপি অতীতে এবং বর্তমানে পাকিস্তানি শাসকরা ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে যে কাজগুলো করেছেন এবং এখনো করছেন তার প্রতিফল সব পাকিস্তানিকেই পোহাতে হচ্ছে। প্রসঙ্গক্রমে বিশ্বকবির একটি কবিতার স্মরণীয় পঙক্তি থেকে কিছুটা তুলে ধরা সমীচীন হবে। কবি লিখেছেন, ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান, মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছ যারে, সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে, তবু করে দাও নাই স্থান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’ যদিও কবির জীবদ্দশায় পাকিস্তান সৃষ্টি হয়নি এবং বর্তমান লেখায় যে ঘটনার সমর্থনে এই কবিতাটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক সে ধরনের কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই কবিতাটি লেখা হয়নি। কাকতালীয় হলেও বর্ণিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই কবিতাটি লেখা হয়েছে কি না তা সঠিক ও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। পাশাপাশি ১৯৪৭ সালের পরে বা তার আগে ১৯৪৬ সালে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র মাধ্যমে রক্তপাত ঘটিয়ে যে রাষ্ট্র সৃষ্টির যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হয়েছিল, সেই কথা স্মরণ করলে বর্তমান পাকিস্তানের সন্ত্রাসী পরিস্থিতি কবির এই অনুভূতির সঠিকতা প্রমাণ করে। পাকিস্তান থেকে বের হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের মানুষ রেহাই পেয়েছে।
পাকিস্তানি টিভি চ্যানেল ‘এ-প্লাস টিভি’-এর ‘এক নয়ি সুবহা উইথ ফারাহ’ শীর্ষক টক শো অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের জনপ্রিয় অভিনয় শিল্পী সাবা কামার যখন তার অপমানিত হওয়ার কথাগুলো বলছিলেন তখন তার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি উর্দুতে যা বলেছেন তার বাংলা অনুবাদ হচ্ছে, ‘আমরা সচরাচর পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাক ছার জমিন সাদ বাদ বলে থাকি। বাইরে গেলে বোঝা যায়, যখন (কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে) চেকিং করা হয়, আমি আপনাকে বলতে পারছি না। আমার এত অপমান লাগছিল। একটি কথা আমার মনে পড়ে। শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে তিবলিস (জর্জিয়ার রাজধানী) গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে যেসব ক্রু ছিলেন সবাই ভারতীয়, তারা সব চলে গেলেন। কিন্তু আমাকে থামিয়ে দেয়া হলো। আমার সঙ্গে যে পাসপোর্ট ছিল তার জন্য, আমি পাকিস্তানি তাই। আমার পুরো তদন্ত হলো, সাক্ষাৎকার নেয়া হলো, এরপরই কেবল আমাকে যেতে দিল। সেই দিনের পর থেকে আমি বুঝতে পারলাম, এই হলো আমাদের (পাকিস্তানিদের) ইজ্জত, এই আমাদের (পাকিস্তানিদের) অবস্থান, কোথায় আমরা (পাকিস্তানিরা) দাঁড়িয়ে আছি। সাবা কামারের এই টিভি সাক্ষাৎকার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তো এটি ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। সাবা কামারের টিভি সাক্ষাৎকারে কথা বলতে বলতে কাঁদতে থাকার দৃশ্যসহ সংবাদের ঠিক নিচে সাবাহ আলম নামের একজন পাকিস্তানি যে মন্তব্য করেছেন তা দেশটির বর্তমানের মর্যাদাহানিকর অবস্থার চরম বহিঃপ্রকাশ। সাবাহ আলম ১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ তারিখে এক টুইট বার্তায় বলছেন, অপমানিত শুধু সাবা কামারই হয়নি। সব পাকিস্তানিই অপমানিত অনুভব করে থাকে যখন আমরা সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হই, যখন আমাদের শিশুরা নিহত হয়ে থাকে এবং আমরা তাদের জন্য ন্যায়বিচার পাই না, যখন হাফিজ সাঈদের মতো সন্ত্রাসীরা মুক্তভাবে ঘোরাফিরা করে এবং আমরা অসহায়ের মতো তা দেখি। পাকিস্তানের নাগরিকরা বর্তমানে বিশ্বের সব জায়গায় পদে পদে অপমানিত হচ্ছে। উপরে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তান শব্দটির উদ্ভাবক চৌধুরী রহমত আলী এবং পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য অন্যতম সহায়ক ব্যক্তি একজন সংখ্যালঘু যোগেন ম-লও এমনিভাবে পাকিস্তানে অপমানিত হয়েছিলেন। শুধু তারা দুজনই নয়, এমনি আরো অনেকে পাকিস্তান রাষ্ট্র কর্তৃক এমনিভাবে অপমানিত হয়েছে। পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরা ক্রমান্বয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হতে একেবারে শূন্যের কোঠায় এসে পৌঁছেছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল শতকরা ২৩ ভাগ। আর বর্তমানে অর্থাৎ ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী পাকিস্তানের জনসংখ্যা হচ্ছে মুসলিম শতকরা ৯৬ ভাগ, এর মধ্যে সুন্নি ৭৫ শতাংশ এবং শিয়া ২০ শতাংশ। অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আহম্মদিয়া ২ শতাংশ, হিন্দু ২ শতাংশ, খ্রিস্টান ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ, বাহাই জনসংখ্যা ৭৯ হাজার, শিখ ২০ হাজার, যরথ্র“স্ত ২০ হাজার, কৈলাস ৩ হাজার, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেড় হাজার।
পাকিস্তানের দৈনিক পত্রিকা ডন-এর ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর সংখ্যায় সিনিয়র সাংবাদিক আখতার বালুচ তার ‘ঔড়মবহফৎধ ঘধঃয গধহফধষ : ঈযড়ংবহ নু ঔরহহধয, নধহরংযবফ নু নঁৎবধঁপৎধপু’ শীর্ষক কলামে আহমদ সেলিমের পাকিস্তান এবং আকলিয়তিয়েন কিংবা পাকিস্তান ও সংখ্যালঘু বই-এর ১০৪ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন, ‘একজন সংখ্যালঘুকে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য নির্বাচিত করার বিষয়টি নতুন রাষ্ট্রটির প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয় এবং এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও আভাস দেয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি বাস্তবরূপ লাভ করেছিল ভারতীয় উপমহাদেশের একজন সংখ্যালঘুর অবিশ্রান্ত প্রচেষ্টার ফলে। আমি উল্লেখ করতে চাই যে, শুধু পাকিস্তান ও ভারত নয় সমগ্র বিশ্বের জনগণ, কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির কার্যবিবরণী লক্ষ্য করছেন। উপমহাদেশের মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি চেয়েছিলেন। এখন বিশ্ব দেখতে চায় যে তারা সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সহৃদয়পূর্ণ আচরণ করে কি না। মুসলিম লীগ নেতারা বিশেষত কায়দ-ই-আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই মর্মে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, সংখ্যালঘুদের প্রতি শুধু ন্যায়বিচার ও সহনশীলতাপূর্ণ আচরণই করা হবে তাই নয়, তাদের প্রতি সহৃদয়তাপূর্ণ আচরণও করা হবে।’
পাকিস্তানের গর্ভ থেকে জন্ম হয়েছে বাংলাদেশ। মতাদর্শগত উৎপত্তির ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় দুই ধরনের মতবাদ বিদ্যমান। একটি হচ্ছে লাহোর প্রস্তাবের অন্তর্নিহিত ভাবধারা দ্বিজাতি তত্ত্বের কবর এবং ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমেই বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্ভব হয়েছে। আর একটি হচ্ছে পাকিস্তান হওয়ার কারণেই বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্ভব হয়েছে। পাকিস্তান হওয়ার কারণেই যদি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া সম্ভব হয়ে থাকে তাহলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ ও বাংলাদেশের জন্য একটি প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে দেখা দেয়; অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতাও বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য মতাদর্শ। সমস্যাটা এখানেই। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের তকমা যাদের আছে তাদের অনেকেই এভাবে প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সম্পন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। জাতীয় সংখ্যালঘু কনভেনশনে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মনোরঞ্জন শীল গোপাল তার বক্তব্যে বলেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেন, তারা জামায়াতের চেয়েও খারাপ।’
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িকতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার ছদ্মাবরণে বাংলাদেশ ঘরানার সাম্প্রদায়িকতা ধীরে ধীরে অথচ খুব নিশ্চিতভাবে সমাজ, রাজনীতি ও প্রশাসনে শিকড় শক্ত করতে থাকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রভৃতির কারণে প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িকতার দাম্ভিকতা কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু লুক্কায়িত সাম্প্রদায়িকতা বা অন্তরে অন্তরে যারা ‘সাম্প্রদায়িকতাকে’ লালন করেন অথচ বাইরে বেশ ‘জোরালোভাবেই অসাম্প্রদায়িক’ হিসেবে নিজেকে প্রদর্শন করেন তাদের দাপট অপ্রতিরোধ্য। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার যখন অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তখন সরকারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করা অসম্ভব হওয়া উচিত নয়।
১৯০১ সাল থেকে প্রতি দশ বছর পর পর অনুষ্ঠিত আদমশুমারিতে বাংলাদেশে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অমুসলিম বিশেষত হিন্দু জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে। যদিও মধ্যবর্তী ২০১৭ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী মুসলিম ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যার হার কিছুটা হ্রাস-বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই হিসাবটি অর্থাৎ ২০১৭-এর হিসাবটি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। এ জন্য পরবর্তী অর্থাৎ ২০২১ সালে অনুষ্ঠিতব্য আদমশুমারির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। পাশাপাশি অধ্যাপক আবুল বারাকাতের গবেষণা অনুযায়ী ‘বিশেষ পদক্ষেপ না নিলে ক্রমান্বয়ে হিন্দুশূন্য হয়ে যাবে বাংলাদেশ’ এ পর্যবেক্ষণটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ জানুয়ারি, ২০১৮ সিরডাপ মিলনায়তনে ১৯টি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী সংগঠন ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কনভেনশন’ অনুষ্ঠিত হয়। এখানে বলা হয়, ‘বিদ্যমান রাজনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতিতে এ দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, পদোন্নতিতে বিগত বছরগুলোতে বেশ খানিকটা ইতিবাচক অগ্রগতি ঘটলেও পূর্বেকার মতো একটানা সাম্প্রদায়িক হামলা, নির্যাতন, ভয়ভীতি, হুমকি, জমি জবরদখল এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে হত্যা তাদের দিশেহারা ও নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে। দেশত্যাগের প্রবণতা আবার দেখা দিয়েছে, অনেকে ইতোমধ্যে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. আবুল বারাকাতের গবেষণা গ্রন্থ’ ‘বাংলাদেশে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘১৯৬৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিগত ৫ দশকে আনুমানিক ১ কোটি ১৩ লাখ লোক নিরুদ্দিষ্ট হয়েছেন অর্থাৎ গড়ে বছরে বাধ্য হয়ে দেশান্তরিত হয়েছেন আনুমানিক ২ লাখ ৩০ হাজার ৬১২ জন। এ নিরুদ্দেশ প্রক্রিয়ার প্রবণতা বজায় থাকলে এখন থেকে দুতিন দশক পরে এ দেশে সংখ্যালঘু মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
১২ জানুয়ারির কনভেনশনের উদ্যোক্তা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক সদিচ্ছায় বিগত ৭ দশকের বৈষম্যমূলক কালাকানুন (শত্র“-অর্পিত) সম্পত্তি আইন বাতিল হয়ে ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ’ সংসদে গৃহীত হলেও মহলবিশেষ ও আমলাতান্ত্রিক চক্রান্ত এর বাস্তবায়নে বাধার প্রাচীর তৈরি করে চলেছে, ভুক্তভোগী মালিকদের নিদারুণভাবে হয়রানি আগেকার মতোই অব্যাহত রয়েছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নিপীড়নের অন্যতম একটি উদাহরণ হিসেবে সচরাচর দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অনুপাত ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়ার প্রবণতাকে তুলে ধরা হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন রিলেশনস কমিটির হিয়ারিংয়ে প্রদত্ত কমিটির চেয়ারম্যান এডওয়োর্ড রয়েস বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে ১৯৪৭ থেকে এ পর্যন্ত (২০১৭ সাল) ৪৯ মিলিয়ন হিন্দু মিসিং হয়েছে।’ সম্ভবত এ হিসাবটি আমরা এমনকি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত থেকেও ক্যালকুলেশন করে বের করতে পারি। তবে এ কাজটি যেহেতু রয়েস সাহেব করেছেন সেটি আমাদের করা দরকার হবে না। ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি আদাম দিয়েন অন্যান্য অনেক কিছুর পাশাপাশি এটিও বলেছেন যে, ‘বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশে সংখ্যালঘু নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া চলছে।’ এমেরিটাস প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান গত ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা যে সমাজের কথা ভেবেছিলাম, বলা বাহুল্য সেই সমাজ আমাদের জীবদ্দশায় আর দেখতে পারলাম না। শিগগিরই যে পারব তাও মনে হয় না। কিন্তু এটা মনে হয় যে, আমরা ১৯৭০, ’৭১, ’৭২, ও ’৭৩-এ যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই স্বপ্নের একটা ভিত্তি ছিল। সেটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম।’
জাতীয় সংখ্যালঘু কনভেনশনে বলা হয় জাতীয় নির্বাচন সংখ্যালঘু-আদিবাসীদের শঙ্কিত করে তোলে। কারণ নির্বাচন তাদের কাছে উৎসব নয় অভিশাপ ও আতঙ্ক হিসেবে আসে। নির্বাচনের আগেকার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তাদের নির্মম অভিজ্ঞতায় রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দল ও মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও সংখ্যালঘু আদিবাসীদের স্বার্থ ও অধিকারের প্রশ্নে কারো কোনো ভিন্নতা না রেখে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব রক্ষায় ৭ দফাকে ম্যাগনাকার্টা হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয়।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে। ২০০১-এর নির্বাচনসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে দেশের সংখ্যালঘু ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের ওপর যে নারকীয় হামলার ঘটনা ঘটেছে সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে আগে থেকেই এ ব্যাপারে সুষ্ঠু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর এ জন্য ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন’ এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
লেখক : চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
পরিচালক, সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়