প্রতিবেদন

প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যুতে শিক্ষামন্ত্রীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য থাকলেও পাবলিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন সরকারের গলার কাঁটা হয়ে এ খাতের বিশাল অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। এটি যেন এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও কোনোভাবেই প্রশ্নপত্র ফাঁস নামক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলছে না। বলা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে একটি দুষ্টচত্র প্রশ্নপত্র ফাঁস করছে। এজন্য শিক্ষামন্ত্রী চলমান এসএসসি ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষার সময়ে ফেসবুক বন্ধ রাখারও আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা আগে পরীক্ষার হলে প্রবেশ বাধ্যতামূলক করা হয়। শিক্ষকদের পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব কোনো ব্যবস্থাই কাজে আসছে না। এসএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে থাকে। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বেশ কয়েকজনকে। শেষমেশ বীতশ্রদ্ধ হয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ পদত্যাগের হুমকি দিয়ে বসেন। এই অবস্থায় পদত্যাগ না করে প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ সকল ইস্যুতে শক্ত হাতে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সার্বিক পরিস্থিতি আমি পর্যবেক্ষণ করছিÑ এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীকে বলেছেন, ১০০ অর্জন আছে, দু’একটি ঘটনায় সর্ব অর্জন নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের কাজে কঠোর হোন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো সরকারের মর্যাদাক্ষুণœœকারী তৎপরতার বিষয়ে যাতে সঠিক তথ্য জনগণের কাছে যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ নিয়ে হতাশ হয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করলে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তাসহ সরকারের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগের ঘটনা সামাল দিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের আশানুরূপ সহযোগিতা না পাওয়ায় অনেকটাই হতাশ শিক্ষামন্ত্রী। এমন অবস্থার মধ্যেই সর্বশেষ ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবির প্রেক্ষাপটে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করেন শিক্ষামন্ত্রী। শিক্ষামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করতে চাই। সম্মান নিয়ে যদি কাজ না করতে পারি তবে এ পদে থাকতে চাই না।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীকে শান্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘পাগলামি করবেন না। পদত্যাগ করলেই তো সমস্যার সমাধান হবে না; বরং কঠোরভাবে মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম পরিচালনা করেন। কর্মকর্তাদের শক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে সরকার কী কী কাজ করছে, কারা কোথায় অপরাধ করছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। জনগণের কাছে কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সঠিক মেসেজটা যেতে হবে।’
জানা গেছে, প্রথমে সোনারগাঁও হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন শিক্ষামন্ত্রী। এ সময় মন্ত্রীকে পাগলামি না করার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনি আমার সঙ্গে গণভবনে চলেন।’ এরপর প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে গণভবনে যান। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষামন্ত্রীকে একান্তে কিছু দিকনির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে বসেন। প্রতিমন্ত্রী, দুই সচিবসহ অন্যদের নিয়ে শক্তভাবে সব কিছু দেখেন। সংসদে জাতীয় পার্টির সাংসদদের দাবির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন-দুজন বললেই সব শেষ হবে না। অনেক অর্জন আছে। কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের পরপরই প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী, দুই সচিব মো. সোহরাব হোসাইন, মোহাম্মদ আলমগীর, মন্ত্রণালয়ের সকল অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিবসহ অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। বৈঠকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী সকলের উদ্দেশে দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন।
শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী দুজনই বলেন, পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ তৈরি করে সরকারবিরোধী গোষ্ঠী যেকোনো মূল্যে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। সুতরাং প্রশ্ন ফাঁসসহ যেকোনো ইস্যুতে কঠোরভাবে কাজ করতে হবে। কোনো কাজে গাফিলতি সহ্য করা হবে না। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষার কয়েক মিনিট আগে যারা প্রশ্নের কথা বলে ফেসবুকে অপপ্রচার চালাচ্ছে, কিংবা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তাদের কেউ রেহাই পাবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হস্তে সকল অপরাধ বন্ধ করবে।
এ দিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশ্ন ফাঁস আগেও ছিল। এ রোগ পুরনো। তবে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে প্রশ্ন ফাঁস। অনেক ক্ষেত্রে টাকা আবার অনেকের ক্ষেত্রে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœœ করতেই ফেসবুকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে প্রশ্ন। ১৯৭৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে এ দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রবণতা বাড়ছে বলে বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এরপর বিভিন্ন সময় একটি-দুটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র কখনও কখনও ফাঁস হলেও গত কয়েক বছর ধরে পরীক্ষার হলেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে বা ফাঁসের অভিযোগ উঠছে।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রশ্ন ফাঁসের জন্য সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই দায়ী বলে অভিযোগ করেছেন দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য শিক্ষাবোর্ড, সরকারি বিজি প্রেস, বিভিন্ন ট্রেজারি এবং পরীক্ষা কেন্দ্রের অসাধু কর্মকর্তারাই দায়ী। সারাদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পরীক্ষায় যত জায়গায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জড়িত।
তবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য সবসময় কেবল শিক্ষকদেরকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, কিছু অসাধু শিক্ষকই প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে শিক্ষকরা জড়িত থাকার কারণে নানা পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যাচ্ছে না। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল শিক্ষকদের দায়ী করলে তা সঠিক হবে না। কারণ পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিতরণের সঙ্গে শিক্ষকের অংশগ্রহণ ১০ ভাগের বেশি নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ট্রেজারিতে থাকে প্রশ্নপত্র। তাই সরকারি বিজি প্রেস ও ট্রেজারি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থাকে সবচেয়ে বেশি। এমতাবস্থায়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য কেবল শিক্ষামন্ত্রীকে দায়ী না করে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলেই প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা কঠিন হবে না।