কলাম

বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরাম ও উন্নয়ন

আবদুল বায়েস
বিখ্যাত ব্যক্তিদের একটি উক্তি দিয়ে নিবন্ধটি শুরু করা যেতে পারে। বাংলাদেশের উন্নয়ন হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া। এই প্রতিকূলতার মধ্যে রয়েছে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতি ঘন জনসংখ্যার ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অনেকটা পৌরাণিক পাখির মতো, যে চিতাভস্ম থেকে বেঁচে ওঠে। বলাবাহুল্য, সেই সূত্রে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে পুরোদস্তুর উন্নয়ন ধাঁধা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। বিশেষত প্রত্যাশিত আয়ু বৃদ্ধি, পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের মৃত্যুর হার হ্রাস, মেয়েদের স্কুলে অন্তর্ভুক্তির হার ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রগতি অর্থনৈতিক অগ্রগতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। এটা বলা বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না যে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন থেকে শুরু করে বিশ্বের সেরা সমাজবিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বিশেষত গেল প্রায় এক দশক ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহতভাবে ৬ শতাংশের ওপরে ওঠা এবং সম্প্রতি ৭ শতাংশ অতিক্রম করা একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা বলতে হবে।
বাংলাদেশের এই উন্নয়ন যাত্রার প্রেক্ষাপট নিয়ে সম্প্রতি সোনারগাঁও প্যান প্যাসিফিক হোটেলে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (ইধহমষধফবংয উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঋড়ৎঁস) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আশা ছিল যে এ ধরনের সম্মেলন বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ ও প্রভাব মূল্যায়নে বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবে, যা নীতিনির্ধারক, দাতাগোষ্ঠী ও স্থানীয় এনজিওগুলোর কর্মক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তত্ত্বাবধানে ১৭-১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (বিডিএফ) এ সম্মেলনে উদ্বোধনী ভাষণ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ থেকে স্পষ্ট যে এ ধরনের সংলাপ বা আলোচনাকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে থাকে। প্রথমেই বলে নেয়া দরকার যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ পর্যাবৃত্ত উন্নয়ন ফোরাম আলোচনার ব্যবস্থা করে থাকে। এই ফোরাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সুধীসমাজ, এনজিও, দাতা ও ব্যক্তি খাতের উঁচু পর্যায়ের প্রতিনিধিরা কার্যকর সংলাপ সৃষ্টি করে থাকেন। মোট কথা বিডিএফ উন্নয়ন অংশীদারদের সামনে বাংলাদেশের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ ও তার সমাধানকল্পে সুপারিশমালা বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য উপস্থাপন করে থাকে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রথম প্যানেল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী। ‘সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল : চ্যালেঞ্জ ও আগামী পথ’-এর প্রধান উপস্থাপক সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম। এ সেশনের গুরুত্ব ছিল অনেক। কেননা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন কৌশল লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তির পর এবারই প্রথম এর অগ্রগতি নিয়ে কিছু বলা যাবে। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলাম বিশেষত টেকসই উন্নয়ন উদ্দেশ্য সাধনে আমরা কতটুকু এগোতে পেরেছি এবং যদি না পেরে থাকি, তাহলে কিভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব সে কথা শুনতে। বিশেষত এই প্যানেলে তাঁরা টেকসই উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে অবকাশ নেবেন বলে প্রত্যাশা ছিল।
বিশেষ করে বেশ কটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে এ বছরের বিডিএফ সভা অতি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বছরটিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সত্ত্বেও আকাশে কালো মেঘ জমেছে। এর একটি অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা বন্যার ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং অপরটি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘাÑ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। তাছাড়া রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী প্রবণতা, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ইত্যাদি এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাছাড়া চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এযাবৎকালের অর্জিত প্রবৃদ্ধি এখন প্রকট সমালোচনার মুখোমুখি। প্রবৃদ্ধি শুধু বৈষম্য বাড়ায়নি, অধিকন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে চলেছে। দেখার বিষয় ছিল, উন্নয়ন ফোরাম কি গতানুগতিক প্রবৃদ্ধির পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন কোনো দিকনির্দেশনা নিয়ে সামনে দাঁড়ায়। তৃতীয়ত, সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ আরো এ কারণে যে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় একই সঙ্গে ২০১৫ সালে শুরু হওয়ার পর বর্তমান একটা মধ্যমকালীন পুনর্মূল্যায়ন হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এই সম্মেলনে পঠিত প্রবন্ধ থেকে আঁচ করা যায়, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, যে পরিপ্রেক্ষিতে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হলো তা বেশ প্রশংসনীয়। প্রায় এক দশক বাংলাদেশের অর্থনীতি ৬ শতাংশের একটু বেশি হারে বেড়েছে, নব্বইয়ের দশকের তুলনায় দারিদ্র্যের হার এখন প্রায় অর্ধেক। প্রত্যাশিত আয়ু, সাক্ষরতার হার ও মাথাপিছু খাদ্যের নিরিখে অগ্রগতি কম নয়। ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের বন্ধনীতে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষত, ২০১৭ সালের রাজস্ব বাজেট ৭ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন আশা জাগিয়েছে। বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার পথ ধরে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, বিনিময় হার স্থিতিশীল, বাজেট ঘাটতি সহনীয় এবং জিডিপির অংশ হিসেবে বৈদেশিক ঋণের হ্রাস পাওয়া। প্রবৃদ্ধির প্রধান চালকের মধ্যে আছে পোশাকশিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস, রেমিট্যান্স ও কৃষি, যা মোটামুটি অন্তর্ভুক্তিমূলক। কিন্তু চ্যালেঞ্জগুলো কম নয়। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, যুবনির্ভর জনমিতি ও প্রযুক্তি পরিগ্রহণ। এর সঙ্গে যুক্ত জলবায়ুর পরিবর্তন সাপেক্ষে চ্যালেঞ্জগুলো। সর্বশেষ বিডিএফ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৫ সালের নভেম্বরে একটি কৌশলগত সময়ে, যখন জাতীয় পর্যায়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০২০) ও বৈশ্বিক পর্যায়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা মাত্র গড়ায়। বাংলাদেশ বহুমাত্রিক সংলাপের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আত্মস্থ করতে সমর্থ হয়।
যা হোক, যেসব বিষয়ের ওপর এবারের ফোরাম দৃষ্টি নিবদ্ধ করল বলে মনে হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে : ক. বাংলাদেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলো সম্পর্কে, বাংলাদেশের উন্নয়নে কৌশলিক প্রভাব রাখতে পারে, স্টেকহোল্ডারদের মতামত গ্রহণ।
খ. উন্নয়নের বিভিন্ন স্তরে সম্পৃক্তদের বিভিন্ন কাজের মূল্যায়ন এবং গ. গ্রহণযোগ্য কিছু নির্দেশিকায় উপনীত হওয়া।
মোট ৮টি বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে এবারের বিডিএফ অগ্রসর হয়েছে। কৃষি খাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ; বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ব্যক্তি খাতের জন্য যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, গুণগত শিক্ষা ও দক্ষতা নিশ্চিতকরণ, সমাজের বৈষম্য দূরীকরণ এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন ইত্যাদি। প্রতিটি সেশনের মূল লক্ষ্য ছিল যথাযথ নীতি উন্নয়ন, হস্তক্ষেপ নির্ধারণ করা, মহিলাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন নিয়ে বেশ বড় পরিসরে আলোচনার অবকাশ ছিল। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের ১৯, ২৭, ২৮ ও ২৯ ধারায় নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ধারা ২৭ বলছে, আইনের চোখে সব নাগরিক সমান। বিশেষত, ২৮ (২) উপধারায় বলা হয়েছে যে রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। অথচ এমনই একটি কেসে, সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ২০১৫ সালে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিবাহিত মহিলা তাদের জীবনে অন্তত একবার স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী স্বামী ছাড়া অন্য কর্তৃক দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। যদিও জিডিপিতে অবদান মাত্র ১৫ শতাংশ, কৃষি খাত মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশের কর্মসংস্থান ঘটায়। তাছাড়া ফসল নিবিড়তার ১৯২ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ২০০ শতাংশ পৌঁছানো মানে প্রাকৃতিক সম্পদ ভিতের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি। এর ওপর আছে জলবায়ুজনিত পরিবর্তন কৃষি খাতের উদীয়মান চ্যালেঞ্জগুলো। আলোচনায় আরো ছিল বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ব্যক্তি খাতের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি। ক্রমহ্রাসমান বৈদেশিক সাহায্য ও অনুদানের পরিপ্রেক্ষিতে দেশজ ব্যক্তিগত অর্থ নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে।
আশা করা যাচ্ছে যে ১৭-১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ফোরাম থেকে যেসব নীতিনির্ধারণী সুপারিশ বেরিয়ে এসেছে, তা থেকে আগামী দিনের সংকট মোচনের পাথেয় খুঁজে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ যেন অর্জিত সাফল্য ধরে রেখে উদীয়মান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে, সেটাই কাম্য। মনে রাখতে হবে, বিগত দিনে যে ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে, তার বিপরীতে বর্তমান সমাজ ও পৃথিবী পুরোপুরি না হলেও আংশিক বদলে গেছে। সুতরাং প্রথাগত ধ্যান-ধারণা পরিত্যাগ করে নবধারামূলক চিন্তাভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এখনই উৎকৃষ্ট সময়।
পাদটীকা : একসময় বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্যারিসে বা অন্য কোথাও এ ধরনের সম্মেলনের আয়োজন করা হতো। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীদের কাজ ছিল ভিখারির মতো থালা নিয়ে প্যারিসে পৌঁছানো। আজ বাংলাদেশ সেই সম্মেলনের আয়োজক। দাতারা আমন্ত্রিত অতিথি মাত্র। লিভ ইট অর টেক ইট। বাংলাদেশের বিবর্তন এখানেও।
লেখক : সাবেক উপাচার্য
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়