প্রতিবেদন

মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান সরকারের আমলেই দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা নিরসনে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়িতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নের ১ হাজার ৪১৪ একর জমিতে জাপান সরকারের সহযোগিতায় এবং জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। মাতারবাড়ির এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি হবে বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় যে বন্দর নির্মাণ করা হবে, পরে তাকে গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তরিত করারও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮ জানুয়ারি তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেয়ার তাঁর সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বালাটা শুধু এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দেশের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষই বিদ্যুৎ পেয়ে গেছেন। আর ১০ ভাগ মানুষও পাবেন, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই সরকার কাজ করে যাচ্ছে। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়, বিদ্যুতের জন্য স্টেশন, সাব স্টেশন, সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করার কাজও তাঁর সরকার সমানতালে করে যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ডিজিটাল কায়দায় প্রধানমন্ত্রী এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ভিত্তিফলক উন্মোচনের সময় তাঁর সরকারের ভিশন-২০২১ এবং ভিশন-২০৪১’র কথা পুনরোল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে আমরা আলো জ্বালাবো, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। শেখ হাসিনা বলেন, যেখানে বিদ্যুতের গ্রিড লাইন নেই সেখানে তাঁর সরকার সোলার সিস্টেম ইনস্টল করে দিচ্ছে। প্রায় ৪৬ লাখ সোলার সিস্টেম বসানো হয়েছে। মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি সম্পৃক্ত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের এই চাহিদার সঙ্গে মিল রেখেই তাঁর সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যেই তাঁর সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, ভারতের থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়, নেপাল-ভুটানের সঙ্গে থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর জন্য সরকার সম্ভব সব ধরনেরই পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি এ সময় ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের সময় দেশে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ থাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিদ্যুতের উৎপাদন না বাড়িয়ে বরং কমিয়ে ফেলারও সমালোচনা করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ সালে আমরা ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেশে রেখে যাই; আর ২০০৯ সালে সরকার গঠনের সময় দেখি সে বিদ্যুৎ ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। আর এখন তাঁর সরকার দেশে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা কেনতারো সনুউরা এবং জাইকার জ্যেষ্ঠ সভাপতি ইনিচি ইয়ামাদাস গণভবন প্রান্ত থেকে এবং বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোইসু ইজুমি মাতারবাড়ির অনুষ্ঠান স্থল থেকে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আহমেদ কায়কাউস প্রকল্পের ওপর অনুষ্ঠানে একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক এলাহী চৌধুরী এবং ড. গওহর রিজভী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ এবং সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্পটি উদ্বোধনের পরে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সাধারণ জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
তাঁর সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার সর্বাগ্রে প্রত্যন্ত এবং অবহেলিত তৃণমূল মানুষ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মহেশখালীতেই আগে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতো। প্রকৃতির খেয়াল খুশিতেই এই এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা চলে। আজ এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, এলএনজি টার্মিনাল করছি এবং মহেশখালী-সোনাদিয়া হয়ে ডিপ সি পোর্টও গড়ে উঠছে। এতে একদিকে এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকা- আরো গতিশীলতা পাবে এবং তাদের জীবন মান বাড়বে।
বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগও তাঁর সরকারের সময়ই গৃহীত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো কোনো এলাকায় দেখলাম আমি দিনের পর দিন বিদ্যুৎ নেই। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম এটা সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়, এখানে আমাদের বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তখন আমরা আইন করে বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলাম বলেই আজকে সরকারি-বেসরকারি ক্ষেত্রে নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে উঠে মানুষের জীবনমানকে উন্নয়নের সুযোগ করে দিচ্ছে।’ দেশে কেবল বিরোধিতার স্বার্থেই বিরোধিতাকারী মুষ্টিমেয় স্বার্থান্বেষী মহলের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে নতুন কিছু করতে গেলেই বাধা আসে। অনেক ফর্মুলা আসে। অনেক তাত্ত্বিক গজিয়ে যায়, তারা নানা রকমের কথা বলেন।’
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণের শুরুতে ২০১৬ সালের ১ ও ২ জুলাই রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত ৭ জন জাপানি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাটি স্মরণ করে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি পুনরায় সমবেদনা জানান। এতকিছুর পরও বাংলাদেশে এসে পুনরায় কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী এবং জাইকাকে ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় বাংলাদেশে কর্মরত জাপানের নাগরিকসহ বিদেশিদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে সকলকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমি এতটুকু বলতে পারি আমাদের তরফ থেকে তাদের নিরাপত্তা দিতে যতটুকু করার দরকার আমরা তা করে যাচ্ছি। আমরা তা করে যাবো এবং আমি স্থানীয় জনগণ বিশেষ করে কক্সবাজার এবং মহেশখালীতে আমাদের যে জনপ্রতিনিধি, দলের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় জনগণ সবাইকে আমি এ আহ্বান জানাবোÑ আপনারাও তাদের নিরাপত্তার দিকে খুব ভালোভাবে লক্ষ্য রাখবেন। কারণ তারা আমাদের মেহমান, তারা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী, আমাদের দেশের উন্নতির জন্যই তারা কাজ করে যাচ্ছেন।’ এ সময় স্বাধীনতার পরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে জাপানের সহযোগিতার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে জাপান বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছিল।