সাহিত্য

মায়ের নোটবুক

মোহাম্মাদ নাজমুল আলম : জেসমিন মুন্নী রচিত ‘মায়ের নোটবুক’ উপন্যাসে লেখিকা তার মায়ের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ লেখাগুলো সম্পাদনার মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন পাঠকের মাঝে। লেখিকা তার মায়ের হাতে লেখা পুরনো ডায়েরিকে যথার্থ মূল্য দিয়ে উপন্যাস আকারে পাঠকের মাঝে তুলে ধরেছেন। একটি পরিবার ও পরিবারটির নিকট আত্মীয়স্বজন এবং একটি দেশ কিভাবে যুদ্ধের সময়ে কঠিন সময় পার করেছে সেই কাহিনিই লেখিকার মা তার ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে লেখিকা ‘মায়ের নোটবুক’ নামের উপন্যাসটি লিখতে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। লেখাটিতে মূলত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় এবং তার পরবর্তী অনেক বছর পরের একটি ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধের সময় অনিশ্চিত জীবন, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও বেঁচে যাওয়াসহ অনেক লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা লেখিকার মা তার ডায়েরিতে লিখেছেন। ডায়েরি লেখিকার চাচাতো ভাই আজাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, পরিবারসহ দেলোয়ার ভাইয়ের ভারত চলে যাওয়া এবং মি. রশিদের পাকিস্তান চলে যাওয়া ইত্যাদি খবরও লিপিবদ্ধ করেছেন স্পষ্টভাবে। সওদাগর ধনপতির কথা উল্লেখ করেছেন সুন্দরভাবে, যার স্ত্রীর নাম থেকেই নাকি আজকের খুলনা শহরের নামকরণ করা হয়েছে। ধনপতির দুই স্ত্রী। তিনি দক্ষিণ দেশে বাণিজ্য করতে এসে স্থায়ীভাবে থেকে যান বর্তমান এই খুলনা শহরে। তার দ্বিতীয় স্ত্রী খুল্লনার নামে খুল্লনেস্বরী মন্দির স্থাপন করেন। সেই হিসাবে এই এলাকার নাম রাখা হয় খুলনাÑ এমনটাই ধারণা অনেকের। পরবর্তীতে খুলনা হয়ে ওঠে এক বন্দরনগরী যেখানে উত্থান ঘটে গল্পের নায়ক আকরাম আলীর এবং সময়ের পরিবর্তে আবার ল-ভ-ও হয় আকরাম আলীর জীবন। আকরাম আলী হলেন কালাবড়ির সন্তান। কালাবড়িকে বিয়ে করে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছিল আকরাম আলীর বাবা রমজান মিয়া। আকরাম আলী পাকিস্তানি বেটা বলে এক সময় মাটিতে পা পড়ত না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে চেতনা জাগ্রত হলে মানুষ বুঝতে পারে পাকিস্তানিগো বেটা মানে জারজ সন্তান।
ডায়েরিতে দীর্ঘ একচল্লিশ বছর পরের ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেছেন, যার কেন্দ্রে আছে মূলত আকরাম আলীর করুণ কাহিনি। খুলনা থেকে পিরোজপুর চলে যাওয়া। যাত্রা পথে মানুষের মুখে গল্প শুনে শহীদ ভাগীরথী সাহার। গুপ্তচর ভাগীরথী পাকবাহিনীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সংবাদ পৌঁছে দিতেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের চর। মিলিটারিরা ভাগীরথীকে মোটরসাইকেলের পেছনে বেঁধে পুরো পিরোজপুর শহরের রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়েছিল। তারপর আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হত্যা করেছিল এবং বলেশ্বর নদীতে সুবেদার সেলিম তাকে ফেলে দেয়।
অবশেষে আকরাম আলীর সাথে দেখা মেলে কালাবড়ির মা গোলাপজান বিবির সাথে। নাতীকে পেয়ে গোলাপজান বিবি জড়িয়ে ধরেন। শুরু হয় গল্পের। আস্তে আস্তে বুকের গহিনে জমে থাকা সব কথাগুলো একত্রিত করে বলতে থাকে গোলাপজান এবং তার মেয়ের দুরন্তপনার কাহিনি। কালাবড়ির বাবার নাম ছিল আমিরুদ্দীন গাজী। কাজ করতেন খুলনায়। খুলনা থেকে একদিন একজন মেহমান নিয়ে আসেন বাড়িতে। সেই রাতে কালাবড়ি ঋতুবতী হয় এবং তারা আনন্দে মিষ্টি বিতরণ করে। এরপর কালাবড়ির সাথে বিয়ে হয়ে যায় সেই মেহমানটির।
সময় গড়িয়ে যায় যুদ্ধ চলছে। নভেম্বরে গাজীবাড়ি মিলিটারি হামলা। ডিসেম্বরে রাজাকার ও মিলিটারির অপারেশনে নিরীহ লোকদের আত্মাহুতি। বলেশ্বর খাল দিয়ে ভেসে আসা লাশ আর লাশ। হঠাৎ একদিন সন্ধ্যায় কালাবড়ির বাড়িফেরা। মিলিটারিদের যৌন নির্যাতনে তলপেট স্ফীত ও ক্ষত-বিক্ষত হয় কালাবড়ির শরীর। কালাবড়ির বীরাঙ্গনার খেতাব না পাওয়া। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ। সব কাহিনি গোলাপজান তার নাতীকে শোনায়।
পরিশেষে আকরাম আলী গল্প শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন এবং সেখান থেকে বিদায় নেন। গোলাপজান বিবিও তাকে বিদায় দেন। গাজীবাড়ি ঢোকার পথে মসজিদের কাছে মায়ের কবরের পাশে এসে আকরাম আলী দাঁড়ায় এবং একমুঠো মাটি তুলে নেয়। চারিদিকে তাকিয়ে সে মাটি তার মাথায় স্পর্শ করে এবং মনে মনে বলে ‘মা আমি পাকিস্তানি বেটা না, আমি তোমার ছ্যালে’।

লেখক : সিনিয়র প্রভাষক
রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, বনানী