প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধানে সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে ইন্দোনেশিয়া

বিশেষ প্রতিবেদক
রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধানে ইন্দোনেশিয়া সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো। গত ২৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠককালে তিনি এই আশা প্রকাশ করে রোহিঙ্গা ইস্যুর দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান জরুরি।
মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যই বাংলাদেশ সফরে এসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো সফর করছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব জানান, নিঃসন্দেহে এটি মিয়ানমারের ওপর একটি চাপ। বাংলাদেশ মনে করে বাংলাদেশে আশিয়ান সদস্যভুক্ত কোনো সরকারপ্রধানের সফর ও রোহিঙ্গাদের দুরবস্থা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করা একটি বড় ধরনের ইস্যু। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে কূটনৈতিক সমর্থন চাইছে। জাকার্তা ইতোমধ্যেই জাতিসংঘ ও জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে রোহিঙ্গাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে ইন্দোনেশিয়া এই ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠককালে মিয়ানমার থেকে সহিংসতার কারণে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া ও তাদের থাকা-খাওয়ার সব ধরনের ব্যবস্থা করার জন্য ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এগিয়ে নিতে একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে আলোচনা শুরু করতে বৈঠকে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। দুই নেতা মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে বিপুল সম্ভাবনা থাকায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যে একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া রেয়াতি সুবিধা দেবে এবং এটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যবধান কমাতে সহায়ক হবে। দুই নেতার মধ্যে বৈঠকে সম্ভাবনাময় খাত উন্মুক্ত করতে সমুদ্রসম্পদ আহরণে একত্রে কাজ করতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবৈধ, অসমর্থিত ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার বিরুদ্ধে সহযোগিতার ব্যাপারে যৌথ ঘোষণা এবং টেকসই মৎস্য আহরণ ব্যবস্থা উন্নয়নে সমুদ্রসম্পদ খাতে সহযোগিতা জোরদারে দুই দেশের স্বাক্ষরিত চুক্তির কথা উল্লেখ করেন। সরকার দেশের বিভিন্ন এলাকায় একশটি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা করছে, প্রধানমন্ত্রী এসব অর্থনৈতিক জোনে ইন্দোনেশিয়ার বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ানের (এএসইএএন) সেক্টোরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন যে, এ ক্ষেত্রে জাকার্তা ঢাকাকে সহযোগিতা দেবে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর বাংলাদেশ সফরের দ্বিতীয় দিন ২৯ জানুয়ারি আসিয়ানের সঙ্গে আঞ্চলিক সংলাপ অংশীদারিত্বের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধের পক্ষে জাকার্তার সমর্থন চায় বাংলাদেশ। এর জবাবে ইন্দোনেশিয়া আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে বাংলাদেশের আগ্রহকে স্বাগত জানায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, অর্থনীতি, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদার করতে তাঁর সরকারের গভীর আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং এ জন্য ইন্দোনেশিয়ার সহায়তা কামনা করেন।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বাংলাদেশের এই আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে আসিয়ানে আরো সক্রিয় সম্পৃক্ততার জন্য বাংলাদেশকে প্রণোদিত করেন। একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট উইদোদো রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করে শরণার্থীদের নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের বসতভিটায় ফিরে যেতে ইন্দোনেশিয়ার সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের চলমান আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে প্রেসিডেন্ট উইদোদো আস্থার সঙ্গে বলেন যে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণমুখী নেতৃত্ব ও কল্যাণমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রেসিডেন্ট উইদোদোর প্রশংসা করেন। প্রধানমন্ত্রী আসিয়ান এবং ওআইসিতে জাকার্তার ভূমিকারও প্রশংসা করেন।
অভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভাষাগত ঐতিহ্যের ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্কের কথা পুনরুল্লেখ করে দুই নেতা পারস্পরিক কল্যাণের মাধ্যমে উভয় দেশের অংশীদারিত্বমূলক সমৃদ্ধিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে একমত পোষণ করেন। উভয় নেতা পররাষ্ট্র বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকে স্বাগত জানান। এর জয়েন্ট কমিশনের তৃতীয় বৈঠক চলতি বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। দুই নেতা এলএনজি আমদানির জন্য বাংলাদেশের পেট্রোবাংলা ও ইন্দোনেশিয়ার পারতামিনার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। উভয় নেতা দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা সম্পর্কিত চুক্তিকে স্বাগত জানান। তাঁরা দুই দেশের বেসরকারি খাতের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি দেন। তাঁরা সমুদ্র সম্পর্কিত সহযোগিতা ও ব্লু-ইকোনমির ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় ও পারস্পরিক সহযোগিতার স্বীকৃতি দেন। উভয় নেতা অবৈধ মৎস্য আহরণ বন্ধে স্বাক্ষরিত যৌথ উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
দুই নেতা উভয় দেশের মানুষের মাঝে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং পর্যটন, বাণিজ্য ও কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থার মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার প্রথম দিকে ১৯৭২ সালের ২৫ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ার সরকার ও জনগণের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।