প্রতিবেদন

শেখ হাসিনা সেনানিবাস ও বরিশালে উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী সামরিক-বেসামরিক উন্নয়ন কর্মকা- সচল রাখতে জনগণের অব্যাহত সমর্থন চান শেখ হাসিনা

মেহেদী হাসান
দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বৃহৎ উপকূলীয় এলাকায় এতদিন কোনো সেনানিবাস ছিল না। অথচ দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে এ অঞ্চলটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের আওতাধীন যশোর সেনানিবাসের সহায়তা নিতে হতো। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে যশোর সেনানিবাসের ৫৫ পদাতিক ডিভিশনকে এ অঞ্চলের ২১ জেলার প্রতিরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছিল। এই সমস্যা নিরসনে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বৃহৎ উপকূলীয় এলাকায় একটি সেনানিবাস স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এরই অংশ হিসেবে দেশে আন্তর্জাতিকমানের সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার ঘোষিত ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় পটুয়াখালীর লেবুখালীতে পায়রা নদীর তীরে দেশের ৩১তম ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ‘শেখ হাসিনা সেনানিবাস’ স্থাপিত হয়।
বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলার মধ্যবর্তী স্থানে পায়রা নদীর তীরে লেবুখালীতে ১ হাজার ৫৩২ একর জমিতে এ সেনানিবাস স্থাপন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় সেনাবাহিনীর শীতকালীন মহড়া পরিদর্শনের সময় বলেছিলেন, পটুয়াখালীর লেবুখালী ও রাজবাড়ীতে নতুন দুটি সেনানিবাস স্থাপনের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। ২০১৪ সালের ২৫ জুন লেবুখালীতে সেনানিবাস স্থাপনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়া যায়।
বরিশাল শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে পায়রা নদীর জেগে ওঠা চরে ৮ ফেব্রুয়ারি নতুন সেনানিবাসের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নতুন এ সেনানিবাস স্থাপনের ফলে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলায় সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক হবে। দেশের ৩১তম ক্যান্টনমেন্ট উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী ৭ পদাতিক ডিভিশনসহ ১১টি সদর দপ্তর বা ইউনিটের পতাকা উত্তোলন করেন। পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করে। পরে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন। একই দিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরিশাল বঙ্গবন্ধু উদ্যানে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। লেবুখালীতে সেনানিবাস উদ্বোধন, বরিশাল ও পটুয়াখালীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন এবং বরিশালের বিশাল জনসভায় ভাষণদানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামরিক-বেসামরিক উন্নয়ন কর্মকা- সচল রাখতে জনগণের অব্যাহত সমর্থন চান এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রতীক নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত
রাখুন : সেনাবাহিনীর প্রতি প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আগামীতে দেশের জনকল্যাণমূলক কাজে সেনাবাহিনীকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ দেশপ্রেমিক, পেশাদার সশস্ত্র বাহিনীকে বিশ্বমানের আধুনিক বাহিনীতে উন্নীত করতে তাঁর সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে এই ডিভিশনটি স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আজ (৮ ফেব্রুয়ারি) ৭ পদাতিক ডিভিশনকে পূর্ণতা দেয়ার লক্ষ্যে ডিভিশন সদর দপ্তর এবং দু’টি ব্রিগেড সদর দপ্তরসহ মোট ১১টি ইউনিটের পতাকা উত্তোলিত হলো।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী সকালে লেবুখালী সেনানিবাসে পৌঁছলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক এবং ৭ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আলম শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী এমপি গেটে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সেনানিবাসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রীবর্গ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল-এজি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান, কূটনীতিক এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি শক্তিশালী এবং প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য জাতির পিতা ১৯৭৪ সালে একটি প্রতিরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, জাতির পিতা প্রণীত নীতিমালার আলোকেই তাঁর সরকার আর্মড ফোর্সেস গোল-২০৩০ প্রণয়ন করে সেনাবাহিনীর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। তাঁর সরকার ১৯৯৬-২০০০ মেয়াদেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যাপক উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধন করেছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সাল হতে ৯ বছরে আমরা সেনাবাহিনীর অবকাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছি। সেনাবাহিনীতে নতুন পদাতিক ডিভিশন ও ব্রিগেড প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জামাদিতে সজ্জিত করা হয়েছে। আর্মার্ড ব্রিগেড, কম্পোজিট ব্রিগেড ও প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড এবং বাংলাদেশ ইনফেন্ট্রি রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে অনেক আধুনিক যানবাহন, হেলিকপ্টার, সমরাস্ত্র ও সরঞ্জামাদি সংযোজন করা হয়েছে। তাঁর সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রধানমন্ত্রী এ সময় সেনা সমস্যদের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন। শেখ হাসিনা বলেন, অত্যাধুনিক ব্যবস্থা নিয়ে সিএমএইচসমূহে উন্নতমানের চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকা সিএমএইচে যুক্ত হয়েছে যুগান্তকারী বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন সেন্টার। ককলিয়ার প্রতিস্থাপন কেন্দ্র, বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি কেন্দ্র যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সেনাসদস্যদের সাথে সাথে দেশের জনগণও আধুনিক চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার সেনাবাহিনীর সকল পদবির সৈনিকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ তাদের বাসস্থান, মেস, এসএম ব্যারাক ইত্যাদি নির্মাণ করেছে এবং বেতন ও রেশন বৃদ্ধিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বৃদ্ধি করেছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে এ সময় তাঁর সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন থাকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর ভাই শেখ কামাল সেনাবাহিনীতে থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় ভাই শহীদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ১৯৭৫ সালে রয়েল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্টস থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ শেষে কমিশন লাভ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ছোট ভাই শেখ রাসেলের ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। কিন্তু তার আগেই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঘাতকরা তাকেও হত্যা করে।
এই পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, আমি আপনাদের মাঝে আমার হারানো ভাইদের খুঁজে পাই। তিনি বলেন, মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের সহায়তায় সেনাবাহিনী অত্যন্ত প্রশংসার সাথে কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বহির্বিশ্বে আরও উজ্জ্বল করছে। যেকোনো দুর্যোগে আর্তমানবতার সেবা ও জান-মাল রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর কর্তব্য ও দায়িত্বশীল ভূমিকা সবসময় প্রশংসিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ এখন একটি ব্র্যান্ড নেম বলেও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় তাঁর সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের খ-চিত্র তুলে ধরে বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই ডিভিশনের প্রত্যেক সদস্যের পেশাগত দক্ষতা ও কর্মচাঞ্চল্যে ৭ পদাতিক ডিভিশন একটি অনুকরণীয় ডিভিশনে পরিণত হবে। এই সেনানিবাস হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর এবং কার্যকর একটি সেনানিবাস, ইনশাআল্লাহ।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পটুয়াখালী ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ডায়াবেটিস হাসপাতাল, মীর্জাগঞ্জ উপজেলার দেউলী ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, বাউফলের সাবুপাড়া গ্রামে ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, সরকারি শিশু পরিবারের (বালিকা) নবনির্মিত হোটেল ভবন, কাজী আবুল কাশেম স্টেডিয়াম, দশমিনা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, কলাপাড়া উপজেলার পশ্চিম চাকামইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টার, পূর্ব ডালবুগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টার, হোগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টার, বাউফলের ধানদী মডেল হাইস্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার, কলাপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, গলাচিপা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ডিজিটাল পাবলিসিটি স্কিন এবং শহীদ শেখ কামাল স্মৃতি কমপ্লেক্সের (অডিটোরিয়াম) উদ্বোধন করেন। এছাড়া তিনি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক ভবন সম্প্রসারণ ও হল রুমের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
শেখ হাসিনা সেনানিবাসের জন্য
নবগঠিত ৭ পদাতিক ডিভিশন
শেখ হাসিনা সেনানিবাসের জন্য নবগঠিত ৭ পদাতিক ডিভিশন নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পদাতিক ডিভিশনের সংখ্যা দাঁড়াল ১০-এ। অন্যান্য পদাতিক ডিভিশন হচ্ছে সাভারে ৯, কক্সবাজারে ১০, বগুড়ায় ১১, সিলেটে ১৭, ঘাটাইলে ১৯, চট্টগ্রামে ২৪, কুমিল্লায় ৩৩, যশোরে ৫৫ ও রংপুরে ৬৬। আর সেনানিবাসের সংখ্যা শেখ হাসিনা সেনানিবাসসহ ৩২টি। সর্বশেষ এ সেনানিবাস দেশে আন্তর্জাতিকমানের সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার ঘোষিত ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় স্থাপিত হয়েছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের অগ্নিঝরা দিকনির্দেশনামূলক ভাষণকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে এই ডিভিশনের নামকরণ করা হয়েছে ‘৭ পদাতিক ডিভিশন’। সরকার অনুমোদিত ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর অংশ হিসেবে ৮ ফেব্র“য়ারি লেবুখালীতে পায়রা নদীর তীরে এই পদাতিক ডিভিশনের জন্মলাভ করে। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকের দিকনির্দেশনায় ও যশোর এরিয়ার ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. নাঈম আশফাক চৌধুরী, এসবিপি, ওএসপি, পিএসসি’র সার্বিক তত্ত্বাবধানে ৩ বছরের অধিক সময়ে শেখ হাসিনা সেনানিবাসের কার্যক্রম অগ্রসর হয়। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে এরিয়া সদর দপ্তর বরিশাল ও ৭ পদাতিক ডিভিশনের চৌকস অফিসার, জেসিও এবং অন্যান্য পদবির সৈনিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল ৭ পদাতিক ডিভিশন। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পাশাপাশি আরও বেশকিছু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বুকে লালন করছে ৭ পদাতিক ডিভিশন। যেমন মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠের সংখ্যা ৭ জন। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ২৫ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেও ৭ সংখ্যাটি (৫+২, ২+৫, ১+৬) অন্তর্নিহিত। মহান স্মৃতিসৌধে রয়েছে ৭টি ধাপ; যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৭টি পর্যায়কে নির্দেশ করে।
নৌকায় ভোট চাই, আপনাদের
সহযোগিতা চাই : শেখ হাসিনা
বরিশাল নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যানের জনসমুদ্রে প্রধান অতিথির ভাষণে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা মার্কার প্রার্থীদের ভোট দিয়ে পুনরায় আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার জন্য উপস্থিত জনতাকে হাত তুলে সমর্থন জানানোর আহ্বান করেন।
এদেশের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন আহ্বানে জনসভার মাঠ ছাপিয়ে পুরো নগরীতে ছড়িয়ে পড়া সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়ে হাত তুলে নৌকাকে বিজয়ী করার পক্ষে সমর্থন জানান। জনসভাস্থল বঙ্গবন্ধু উদ্যান ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ। মাঠ উপচে মানুষের ঢল ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।
বিশাল ওই জনসমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার জোটকে ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলেই দেশের উন্নয়ন হয়। দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগামী নির্বাচনেও নৌকা মার্কাকে নির্বাচিত করতে হবে। নৌকাকে নির্বাচিত করলে দেশ এগিয়ে যায়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসলে দেশে লুটপাট হয়, দেশ দুর্নীতিতে বারবার চ্যাম্পিয়ন হয়। তাই দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে আগামীতেও আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করতে হবে। তাই আপনারা হাত তুলে ওয়াদা করেন আগামীতেও নৌকা মার্কার প্রার্থীদের ভোট দেবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে বিশ্ব দরবারে দেশ সম্মানের সাথে এগিয়ে যাবে। ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে আবারও আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করুন।
জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসে লুটপাট, দুর্নীতি, সন্ত্রাসী ও এতিমদের টাকা আত্মসাৎ করতে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে। বিএনপির নেত্রী এতিমের টাকা পর্যন্ত চুরি করেছে। এতিমখানার টাকা এতিমখানায় যাবে, সেই টাকা তাদের কাছে কেন থাকবে? আজকে এতিমের টাকা চুরি করে ধরা পড়ে গেছে। কারণ এতিমের টাকা মেরে দেয়া ইসলাম ধর্মও সমর্থন করে না। এতিমের সম্পদ লুটপাট করলে সেই শাস্তি আল্লাহতায়ালা নিজেই দেন। আজ খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া সেই শাস্তি পেয়ে গেছে। কোর্ট রায় দিয়েছে এখানে আমাদের করার কিছুই নাই। কিন্তু অন্যায় করলে যে শাস্তি পেতে হয় সেটা আজ প্রমাণিত হয়েছে। তাদের লজ্জা থাকলে আর লুটপাট করবে না, দুর্নীতি করবে না।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আরও বলেন, বিএনপি দুর্নীতি করেছে। এতিমের টাকা চুরি করেছে। দেশের সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে, দুর্নীতি করে তাদের বিচার আল্লাহতায়ালাই করে।
দেশের চলমান উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, আজ দেশের সর্বক্ষেত্রে উন্নয়নের সুবাতাস বইছে। সেই উন্নয়নের ছোঁয়া বরিশাল ও দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্র লেগেছে। আমরা বরিশালে অনেক ব্রিজ-কালভার্ট ও সড়ক নির্মাণ করেছি। ভোলার গ্যাস পাইপ লাইনের মাধ্যমে বরিশালে নেয়া হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের শতভাগ চাহিদা পূরণ করতে কাজ করছে সরকার। ২০২১ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাবে। প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া হবে। ভোলায় পাওয়ার প্ল্যান্ট করে বরিশালে বিদ্যুৎ আনা হবে এবং বরিশাল থেকে ভোলা পর্যন্ত সড়ক পথে যাতায়াতের জন্য সেতু নির্মাণ করা হবে। বরিশালে স্বতন্ত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা ২০০১ সালে পদ্মাসেতুর ভিত্তিপ্রস্তর করেছিলাম। কিন্তু খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে পদ্মাসেতুর কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। আল্লাহর রহমতে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু আজ দৃশ্যমান হয়েছে, দ্রুত নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে।
দীর্ঘ ৩১ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি-জামায়াত সে নির্বাচন ঠেকানোর নামে সারাদেশে সন্ত্রাস ও নাশকতার মাধ্যমে ধ্বংসাত্মক কর্মকা- চালায়। তারা পেট্রোল বোমা মেরে জীবন্ত মানুষদের পুড়িয়ে হত্যা করেছে। তারা ২৯টি রেলগাড়ি, ৯টি লঞ্চ, ২৫২টি গাড়ি, প্রায় ১ হাজার ৪০০ সরকারি অফিসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালাও-পোড়াও আর অগ্নিসংযোগ হচ্ছে তাদের আন্দোলন। আমরা কঠোর হস্তে তাদের সে সন্ত্রাস মোকাবিলা করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি ধ্বংস করতে জানে, সৃষ্টি করতে জানে না। মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করতে জানে। বিএনপি পেট্রোল বোমায় মানুষ মেরেছে। তাদের আগুন, পেট্রোল বোমায় বহু মানুষ জীবন দিয়েছে। তারা প্রায় ৫০০ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। প্রায় ৩ হাজার মানুষ তাদের আগুন সন্ত্রাসের শিকার হয়ে এখনও ধুঁকছেন। তাদের অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে ৩ হাজার ৩৬ জন অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। আল্লাহ আজ তাদের বিচার করছেন। শেখ হাসিনা বলেন, আন্দোলন হবে মানুষের জন্য। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন ধ্বংস করার জন্য। তারা পারে দেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করতে। বিপরীতে আওয়ামী লীগ উন্নয়ন করে, উন্নয়নে বিশ্বাস করে, জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের ওয়াদা চাই। আপনারা হাত তুলে ওয়াদা করুন, নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বলেছিলাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করব। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আল্লাহর রহমতে করেছি।
শেরেবাংলা, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, উন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা শওকত হোসেন হিরণ ও ডা. মোখলেসুর রহমানের বরিশালের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ মানে উন্নয়ন, আওয়ামী লীগ মানে জনগণের কল্যাণ তাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়। আজকে আমরা এই দেশেকে উন্নত করতে চাই। আমার মা ও বোনেরা বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন, বিধবা ভাতা পাচ্ছেন, এমনকি দুগ্ধবতী মাও ভাতা পাচ্ছেন। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বিগত সরকারের আমলে অবহেলিত ছিল। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি করেছি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরির ব্যবস্থা করেছি। আমরা দেশের উন্নয়নে বিশ্বাস করি। কারণ আমার বাবা এ দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। তিনি চেয়েছিলেন আমাদের ছেলে-মেয়েরা উন্নত শিক্ষা পাবে, উন্নত চিকিৎসা পাবে। একটা মানুষও গৃহহীন থাকবে না। এটাই ছিল জাতির পিতার স্বপ্ন। আমরা সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।