খেলা

সৌদি আরবে মেয়েদের স্টেডিয়ামে গিয়ে প্রথম ফুটবল ম্যাচ দেখার বিরল অভিজ্ঞতা

ক্রীড়া প্রতিবেদক
জানুয়ারি মাসে সৌদি আরবের মেয়েরা প্রথমবারের মতো স্টেডিয়ামে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখার সুযোগ পেয়েছেন। সৌদি মেয়েদের এ সুযোগ করে দিয়েছেন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি সমাজে এই অভিজ্ঞতাটা ছিল অভূতপূর্ব। সে দেশের মেয়েদের কাছে গাড়ি চালানো, স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখা কিংবা একা মার্কেটে গিয়ে শপিং করাটা ছিল অলীক কল্পনা। সৌদি আরবের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যাওয়ার জন্য এখন উন্মুখ প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি বাদশা মোহাম্মদ সালমানও স্বাস্থ্যগত কারণে সৌদি বাদশাহির দায়িত্বে পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন। এ জন্য তিনি ভাতিজাকে প্রিন্সের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুত্রকে এই দায়িত্বে নিয়ে আসেন। বলা হয় প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের এখন সৌদি বাদশাহ হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যে একজন উদারপন্থি মানুষ, সে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই রাজপরিবার থেকে স্বভাববিরুদ্ধভাবে সৌদি মেয়েদের বিষয়ে বিভিন্ন উদার নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। আর এই উদার নীতিরই একটি হলো মেয়েদের স্টেডিয়ামে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখার সুযোগ।
সৌদি আরবে এখন নানা রকমের পরিবর্তন আসছে। মেয়েরা গাড়ি চালানোর অধিকার পাচ্ছেন চলতি বছরের জুন থেকে। আর ইতোমধ্যেই মেয়েরা পেয়ে গেছেন স্টেডিয়ামে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখার অনুমতি। এই অনুমতি পাওয়ার পর রাজধানী রিয়াদ. দাম্মাম আর জেদ্দায় তিনটি ফুটবল ম্যাচে প্রথম সৌদি আরবের মেয়েরা ফুটবল খেলা দেখতে যান। রাজধানী রিয়াদে সৌদি প্রো লিগের ম্যাচ ছিল আল-হিলাল বনাম আল-ইতিহাদের মধ্যে। আর জেদ্দার ম্যাচটি ছিল আল-আলি আর আল-বাতিনের মধ্যে যাতে আল-আলি ৫-০ গোলে জেতে আল-বাতিনের বিপক্ষে।
ফুটবল থেকেই কি সৌদি আরবে আগামী দিনে একটা বিরাট পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে? জেদ্দার এই ম্যাচটিতে একজন স্টুয়ার্ড হিসেবে মেয়েদের গ্যালারিতে কাজ করেছিলেন ১৮ বছর বয়স্কা ছাত্রী সারা আল-গাশকারি। তিনি একজন সৌদি মেয়ে। তিনি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের কাছে বর্ণনা করেছেন সৌদি আরবে প্রথম মেয়েদের স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা।
গাশকারি বলেন, এ ছিল এক দারুণ অভিজ্ঞতা, মেয়েরা উত্তেজিতভাবে তাদের যারা যার পছন্দের দলকে উৎসাহ দিচ্ছিল। তাদের জন্য এটা ছিল একটা ঐতিহাসিক এবং আনন্দের মুহূর্ত। তারা উদ্বেলিত ছিল এই কারণে যে, তারা কোনো পুরুষ অভিভাবক ছাড়াই খেলা দেখতে আসতে পেরেছে। মেয়েদের জন্য স্টেডিয়ামে আলাদা কোনো নিয়ম ছিল না। পুরুষের জন্য যে নিয়ম মেয়েদের জন্যও তাই। ফলে তাদের মধ্যে ছিল এক আনন্দের উচ্ছ্বাস।
গাশকারি বলেন, সৌদি মেয়েরা সবসময়ই সরাসরি মাঠে বসে খেলা দেখতে চেয়েছে; কিন্তু এতদিন পর্যন্ত তাদের খেলা দেখতে হতো শুধু টিভির পর্দায়।
গাশকারি নিজেও একজন সৌদি মেয়ে। স্টেডিয়ামে স্টুয়ার্টের কাজ করাটা তার কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরেও সৌদি মেয়েদের উন্মুক্ত স্থানে কাজ করাটা ছিল নিষিদ্ধ বিষয়। গাশকারি বলেন, আমি একজন স্টুয়ার্ড হিসেবে কাজ করেছি। তাই আমাকে খেলা শুরুর ৬ ঘণ্টা আগে স্টেডিয়ামে ঢুকতে হয়েছে। আর বের হয়েছি খেলা শেষ হওয়ার ৩ ঘণ্টা পর। অনেক পরিশ্রমের কাজ, কিন্তু আমার কখনো ক্লান্তি লাগেনি। তাছাড়া খেলা দেখাটাও ছিল একটা স্বপ্নের মতো ব্যাপার; আমি খেলোয়াড়দের চোখের সামনে খেলতে দেখছি, গোল করতে দেখছিÑ এটা যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল এ যেন এক নতুন সৌদি আরব। আমি মনে করি, আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। আমরা ফুটবল খেলা দেখতে যেতে পারছি, আগামী জুন থেকে আমরা গাড়িও চালাতে পারবো। আইনের পরিবর্তনের আগে আমরা শুধু আমাদের প্রিয় দল কী করছে তার খোঁজখবর রাখতাম। খেলা দেখতাম শুধু টিভিতে। তবে এখন ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমরা খুবই আশাবাদী।
আল-হিকমা নামের আরেকজন স্টুয়ার্ট বলেন, মেয়েরা মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখবেÑ এর বিরোধিতাকারী এখনো সৌদি আরবে অনেক। এরা বয়সে প্রবীণ। এই ষাটোর্ধ্বরা মেয়েদের চার দেয়ালের অভ্যন্তরেই রাখতে পছন্দ করেন। তাদের ধারণা সৌদি সমাজ এখনো এর জন্য তৈরি হয়নি, মানুষও তৈরি নয়। তাদের ধারণা সৌদি মেয়েরা যত প্রকাশ্যে আসবে নারীঘটিত গোলমাল দেশে তত বাড়তে থাকবে। কিন্তু আমি বলেছিলাম, আমরা আয়োজকদের অংশ, কোনো গোলমাল হবে না, হয়ওনি। প্রায় আড়াইশো সউদি মেয়ে শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করেছে, দর্শকরাও আমাদের সহযোগিতা করেছে। মেয়েরা স্টেডিয়ামে আসার পর সৌদি ছেলেরা যথেষ্ট সংযত আচরণ করেছে। তারা মেয়েদের তাদের মতোই দর্শক ভেবেছে, মেয়ে নয়। আল-হিকমা বলেন, সৌদি প্রিন্স প্রবীণ নন। আমি নিশ্চিত মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি প্রিন্স না হলে সৌদি মেয়েদের ঘরে বসেই টিভিতে খেলা দেখতে হতো।
এই স্টুয়ার্ট বেশ উত্তেজিতভাবেই বলেন, স্টেডিয়ামে কাজ করার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার বিষয়ে আমি বলবো, আমি যতটা ভেবেছিলাম তার চাইতেও উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। দর্শকরা গান গাইছিল, যার যার দলকে উৎসাহ দিচ্ছিল। আমি নিজেকে মনে করছি এই ইতিহাসের অংশ। আমি দেখেছি একজন লোক তার মেয়েকে ফুটবলের নিয়মকানুন বুঝিয়ে দিচ্ছেন, মেয়েদের দেখেছি প্রাণ খুলে তাদের দলকে চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছে, কে কী ভাবলো তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। আমি মনে করি, এই অভিজ্ঞতা আমার মধ্যেও একটা পরিবর্তন এনে দিয়েছে। সৌদি মেয়েদের মতো আমি নিজেকেও আর চার দেয়ালের বন্দিনী ভাবছি না।