খেলা

আরচারির মাধ্যমে অলিম্পিকে পদক পাওয়ার মিশনে নেমেছে সিটি গ্রুপ

ক্রীড়া প্রতিবেদক
ক্রীড়াবিশ্বে অনেক পুরনো ও জনপ্রিয় ইভেন্ট হলেও খেলা হিসেবে আরচারি বাংলাদেশে খুব বেশি দিনের পুরাতন নয়। ২০০০ সাল। ক’জন আরচারিপ্রেমী এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। সেটাকে বাস্তবে রূপ দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হয় ২০০১ সালে। ২০০২ সালেই মাঠে গড়ায় খেলাটি। সফল হয় একটি ক্রীড়াস্বপ্ন। গত ১৭ বছরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আরচারি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের আরচাররা ১২টি স্বর্ণপদক জিতেছেন।
২০২০ টোকিও অলিম্পিকে লাল-সবুজের সাক্ষ্য রাখতেই তীরন্দাজদের প্রস্তুত করছে ‘তীর’ ও বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশন। প্রাপ্তির খাতায় আমাদের অনেক কিছু থাকলেও কিছু কিছু স্বপ্ন এখনও অধরা। সে অধরাকে স্পর্শ করতে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘তীর’ এবার যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশনের সঙ্গে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের আরচারিতে ছিলেন ভারতীয় কোচ নিশীথ দাস। তবে এবার তারচেয়েও হাইপ্রোফাইল কোচ নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশন। তিনি জার্মানির ফ্রেডরিক মার্টিন। তার কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা ৩৩ বছরের। আপাতত এই জার্মান কোচকে ৫ বছরের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় আরচারি কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন অডিটোরিয়ামে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘তীর গো ফর গোল্ড’-এর আওতায় নতুন কোচের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়া সেরে নেয় ফেডারেশন। আরচারি ফেডারেশনের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক কাজী রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান দিপু। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম বছরে ৫০ বছর বয়সী মার্টিন পাবেন মাসে ৫ হাজার ডলার (আয়কর দেবে আরচারি ফেডারেশন)। দ্বিতীয় বছরে এই অঙ্কটা বাড়তে পারে তার পারফরম্যান্স ভালো হলে। এছাড়া আরো কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবেন মার্টিন। থাকার জন্য অ্যাপার্টমেন্ট, খাওয়ার খরচ, ড্রাইভারসহ গাড়ি, বছরে এক মাস ছুটি, বছরে দুটি রিটার্ন টিকিট (ঢাকা-বার্লিন-ঢাকা), মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স (৯০ ইউরো) ইত্যাদি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাদি পাবেন।
এ বিষয়ে আরচারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী রাজীব উদ্দিন বলেন, এতদিন একজন বিদেশি কোচের অধীনেই আরচাররা প্রশিক্ষণ চালিয়ে আসছিল। তিনি ছিলেন একজন ভারতীয়। এখন আমরা একজন হাইপ্রোফাইল কোচ নিয়োগ দিয়েছি। তিনি জার্মানির। অত্যন্ত উঁচুমানের কোচ তিনি। বিশ্বের সেরা কোচদের একজন বলা যায় ফ্রেডরিক মার্টিনকে ।
চপল আরও জানান, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্র“পের নির্বাহী পরিচালক জনাব শোয়েব মো. আসাদুজ্জামান আমাকে বললেন, কোচ আনবেন যখন একজন উন্নতমানের কোচই আনুন। সেই প্রেক্ষিতেই আমাদের এই হাইপ্রোফাইল কোচ নিয়োগ। এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে সিটি গ্র“পের নির্বাহী পরিচালক স্বদেশ খবরকে বলেন, আরচারদের ট্রেনিং ক্যাম্পের জন্য ইকুইপমেন্ট কেনার পরিকল্পনা আমাদের আগেই ছিল। আমরা তা কিনিনি এ কারণে যে নতুন কোচ এসে বলবেন এগুলোতে চলবে না। এ কারণেই নতুন কোচের পরামর্শমতো আমরা জিমনেশিয়ামের ইকুইপমেন্ট কিনব। নতুন কোচ এসেছেন সপ্তাহখানেক হলো। তিনি আমাদের টঙ্গীর আবাসিক ক্যাম্প দেখে খুবই খুশি হয়েছেন। নতুন আরচারদের ব্যাপারেও তিনি আশাবাদী। তিনি জিমনেশিয়ামের জন্য প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট কেনার কথা বলেছেন। আমরা এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা কেনার ব্যবস্থা করব। এছাড়া আধুনিক মানের ডাইনিং রুমসহ উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থাও করেছি আরচারদের জন্য।
এখনও অকৃতদার কোচ ফ্রেডরিক মার্টিন বলেন, আবাসিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প দেখে আমি খুবই খুশি। আরচাররাও তরুণ। আমি আমার সেরাটা দিতে চেষ্টা করব। আমি জিমনেশিয়ামের উন্নয়নের ব্যাপারে কিছু ইকুইপমেন্ট কেনার তালিকা দিয়েছি। এগুলো সংযোজন হলে আধুনিকমানের জিমনেশিয়াম পাব আমরা। মার্টিন আরো বলেন, ২০২০ অলিম্পিকের বাছাইপর্ব শুরু হয়ে যাবে ২০১৯ সালেই। আমরা অবশ্যই ২০২০ অলিম্পিকে পদক জেতার চেষ্টা করব। তবে ২০২৪ অলিম্পিকই হচ্ছে আমার মূল টার্গেট। এখানকার আরচারদের দেখে যতটা বুঝেছি রিকার্ভ বা মিশ্র ইভেন্টেই তারা বেশি ভালো ফল করবে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর সিটি গ্র“পের সঙ্গে বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তীর গো ফর গোল্ডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ফেডারেশন ২০তম এশিয়ার আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপ-২০১৭ এবং তীর নবম জাতীয় আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপ-২০১৭-এর আয়োজন করে।
আরচার হিসেবে বিশ্ব আরচারিতে মার্টিনের আছে নজরকাড়া সাফল্য। গত ২০১৬ রিও অলিম্পিক আরচারির সেরা ৮ কোচের একজন ছিলেন মার্টিন। ২০২০ টোকিও অলিম্পিককে টার্গেট করে তীর গ্র“পের সঙ্গে ৫ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে গো ফর গোল্ড চুক্তি করেছে ফেডারেশন। সেই চুক্তিতে আছে বিদেশি কোচ নিয়োগ। বাংলাদেশের সাবেক ব্রিটিশ কোচ রিচার্ড প্রিসনানের সুপারিশেই ফ্রেডরিককে নেয়া হয়েছে।
আগামী ২৪-২৮ মার্চ বিকেএসপিতে দক্ষিণ এশিয়া আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হবে। ফ্রেডরিকের হবে এটাই প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট। তবে এর আগে আরচারির গ্রাঁ প্রিঁ খেলতে থাইল্যান্ড যাচ্ছেন তীরন্দাজরা। বিকেএসপির ৮, বিমান বাহিনীর ২ ও তীরন্দাজ ক্লাবের ৩ জন অংশ নেবেন ৩-৫ মার্চ ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য এ টুর্নামেন্টে।
অলিম্পিকে যদি বাংলাদেশ কোনোদিন পদক জেতে তাহলে সেটা জিতবে আরচারি বা তীর নিক্ষেপ থেকেÑ এমনটাই অভিমত ক্রীড়ামোদীদের। ২০১৬ রিও অলিম্পিকে বাংলাদেশ ক্রীড়া দলকে পরিচয় করে দেয়া হয়েছিল অলিম্পিকে কোনো পদক না জেতা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ বলে। এই অপবাদ ঘুচিয়ে ফেলতে চায় বাংলাদেশ। আরচারির মাধ্যমেই বাংলাদেশ অলিম্পিকে প্রথম পদক জিততে চায়। এ জন্য বিদেশি কোচ নিয়োগ করেছে আরচারি ফেডারেশন। ফেডারেশনকে নিরবচ্ছিন্ন পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে সিটি গ্রুপ। দেশের বেশিরভাগ করপোরেট হাউজ যেখানে ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে সিটি গ্রুপ আরচারির মাধ্যমে বাংলাদেশকে অলিম্পিকে প্রথম পদক পাইয়ে দেয়ার মিশনে নেমেছে। আরচারিপ্রেমীদের মতে, সিটি গ্রুপের এটি একটি মহতী উদ্যোগ।