প্রতিবেদন

ইতালির রোমে ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ)-এর ৪১তম পরিচালনা পরিষদের সভায় প্রধানমন্ত্রী ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে উন্নয়ন সহযোগীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান শেখ হাসিনার

মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ ও ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ) বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৬টি জেলার দুস্থ মানুষের অবকাঠামো ও বাজার উন্নয়নে ৯২ দশমিক শূন্য ৩ মিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ইতালির রোমে অবস্থিত ইফাদ সদর দপ্তরে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব কাজী শফিকুল আজম এবং ইফাদ প্রেসিডেন্ট গিলবার্ট এফ হুয়াংবো চুক্তিতে নিজ নিজ পক্ষে স্বাক্ষর করেন। এ সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীও উপস্থিত ছিলেন।
এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৬টি জেলার দুস্থ জনগণের অবকাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং তথ্য সংক্রান্ত একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। জেলাগুলো হচ্ছেÑ পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও জামালপুর। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের কাজ এ বছর শুরু হবে। এতে এই জেলাগুলোর ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে। প্রকল্পের মূল ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ এবং ১ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে ইফাদ প্রদান করবে। বাকি ২৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ সরকার প্রদান করবে।
ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবদুস সোবহান শিকদার জানান, বাংলাদেশের প্রকল্পটি এলজিআরডি মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করবে। আরেকটি প্রকল্প বাংলাদেশ ও ইফাদের মধ্যে আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ১১৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয়সংবলিত প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বাস্তবায়ন করবে কৃষি মন্ত্রণালয়। তবে এ ব্যাপারে এখনই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। তিনি আরো জানান, বাংলাদেশের কৃষি খাতে দুটি বড় প্রকল্পে ইফাদ অর্থায়ন করতে যাচ্ছে। অতীতে কৃষিখাতে এত বড় প্রকল্প কখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
১৩ ফেব্রুয়ারি ইতালির রোমে ইফাদ গভর্নিং কাউন্সিলের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন দেশ ইফাদকে অর্থ দেয়ার অঙ্গীকার করে। এই অর্থ ইফাদ অনুদান ও ঋণ হিসেবে ব্যবহার করবে। বৈঠকে চীন সর্বাধিক ৯০ মিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। বাংলাদেশ ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার প্রদানের অঙ্গীকার করে।
এর আগে ইফাদ প্রেসিডেন্ট সংস্থার সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তাদের সাক্ষাৎকালে আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুও উঠে আসে। ইফাদ প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং এদেশ সম্পর্কে তার পরিষ্কার ধারণা রয়েছে। কারণ তিনি দু’বার বাংলাদেশ সফর করেছেন। ইফাদ প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কথা বলেন এবং তাঁর নেতৃত্বের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।
ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে উন্নয়ন
সহযোগীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের
আহ্বান শেখ হাসিনার
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করতে উন্নয়ন সহযোগীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এজন্য উন্নয়ন সহযোগীদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপুল বিনিয়োগ ঘটাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ১৩ ফেব্রুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ)-এর ৪১তম পরিচালনা পরিষদের সভার উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এই আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় এবং বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা ছাড়া এটি অর্জন করা যাবে না। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণে উন্নয়ন সহযোগীদের আরো একটু উদার হতে হবে। অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ফ্রাজিলিটি টু লং টার্ম রেসিলেন্স : ইনভেস্ট ইন সাসটেইনেবল রুরাল ইকোনমি।
এসময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সহায়তা অব্যাহত থাকার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অগ্রগতির এই ধারা অব্যাহত রাখতে ইফাদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলেও তিনি প্রত্যাশা করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ইফাদ-এর সহায়তার মডেলটি জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থা থেকে আলাদা। ইফাদ-এর এই মডেলটি মানবতা রক্ষার্থে এখনকার মতো অনাগত দিনগুলোতেও কাজ করে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা স্থাপন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা যাবে না। গ্রামীণ সামাজিক ও জলবায়ুগত স্থিতিশীলতার উন্নয়নে একটি ব্যাপকভিত্তিক টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি প্রয়োজন। শেখ হাসিনা টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি তৈরিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রায় এক দশক ধরে সুশাসন থাকায় বাংলাদেশ ভাগ্যবান। তিনি বলেন, আমরা সতর্কতার সাথে চার বছরের আর্থসামাজিক প্রবৃদ্ধি হিসাব করে আমাদের কৌশল নির্ধারণ করেছি এবং গত ৯ বছর ধরে এটি বাস্তবায়নে চেষ্টা করছি। আমরা খুবই সতর্কতার সঙ্গে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে চাহিদা ও প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় করছি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা ৯ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে এবং এর অর্ধেক হবে মধ্যবিত্ত। এর ফলে বিশ্বের আবাদি জমি, বনভূমি এবং পানির ওপর প্রচ- চাপ পড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধিতে অনেক দেশের আবাদি জমি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠে পানির উচ্চতা বৃদ্ধিতে আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবো। ২০৫০ সালে বিশ্বে খাদ্যের চাহিদা ২০০৬ সালের অবস্থান থেকে অন্তত ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে এবং খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ৮৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কিভাবে এ ধরনের বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করবো? আমি আপনাদের আমার দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কৃষি প্রবৃদ্ধির কথা তুলে ধরবো, যা আমরা বৈশ্বিক পর্যায়ে মানব উন্নয়নের জন্য অন্যান্য দেশ গ্রহণ করতে পারে অথবা আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি। আমরা আরেকটি ১৯৮১ সালের মুখোমুখি হতে চাই না, তখন আমরা বুঝতে পারি কৃষি প্রবৃদ্ধিকে উপেক্ষা করা মানবজাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। প্রথমে আমি আপনাদের বলবো, প্রতি বছর জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে দেশে খাদ্য সংকট এবং খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশি জনগণ স্বাভাবিকভাবে সক্ষম। সংকটের মোকাবিলায় বাংলাদেশিরা আস্থার সঙ্গে শক্তভাবে লড়াই করে সমস্যার সমাধান এবং সংকট কাটিয়ে উঠতে বিকল্প উপায় গ্রহণের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করে। বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং চলতি বছর অসময়ে বার বার বন্যার কারণে অপ্রত্যাশিতভাবে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। এই ঘাটতি মোকাবিলায় গ্রাহকদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সাথে সাথেই খাদ্য আমদানি নীতি গ্রহণ করা হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা নোট রাখতে পারেন যে, আমরা খাদ্য উৎপাদন ১৯৭১ সালের ১১ মিলিয়ন টন থেকে ২০১৭ সালে ৩৯ মিলিয়ন টনে উন্নীত করেছি। যদিও এ সময়ে নানা কারণে আমরা এক-তৃতীয়াংশ আবাদি জমি হারিয়েছি। ২০০৮ সালে খাদ্য উৎপাদন ৯ মিলিয়ন টন বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি সম্ভব হয়েছে সরকার কৃষকদের বিপুল পরিমাণে ভর্তুকি প্রদান করাসহ সহজ শর্তে ও সুদমুক্ত ঋণ দানের পাশাপাশি কৃষকদের কাছে কৃষি উপকরণ পৌঁছানোর কারণে। সংকট কাটিয়ে উঠতে আমরা আইসিটির সকল সুযোগ কাজে লাগিয়েছি। বর্তমানে দক্ষতা উন্নয়নে এবং গবেষণায় বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোর ব্যাপারে আইসিটি সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বলেন, উপগ্রহের মাধ্যমে নতুন ম্যাপিং কৌশল এবং জিআইএস জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পেতে সরকারের জন্য সহায়ক হয়েছে। এটি নতুন উদ্ভাবিত শস্যজাতের জন্য কার্যকরভাবে পানি সংরক্ষণ, এলাকা চিহ্নিতকরণ, উপযুক্ত মানচিত্র তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। ফলে আমরা এখন খাদ্য ও কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি কিছু বাড়তি খাদ্য রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করেছি। টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা- ২০৩০ গ্রহণের পর ‘কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না’ এ লক্ষ্যে আমাদের দেশে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের লক্ষ্য একই এবং তা পরবর্তী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর এবং সবার জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা। শেখ হাসিনা বলেন, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বাংলাদেশ উর্বর ভুখ- হিসেবে পরিচিত, যেখানে সব ধরনের কৃষিপণ্য সহজেই উৎপাদিত হয়। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠাকালে দেশ কঠিন খাদ্য ঘাটতির মুখে পড়ে। তখন দেশে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন হতো মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন। স্বাধীনতার পরপরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেন এবং দেশে সবুজ বিপ্লব-এর ডাক দেন। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বঙ্গবন্ধু ভূমি সংস্কার, খাজনা কমানো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সেচ পাম্প স্থাপন, কৃষি উপকরণ বিনামূল্যে বিতরণসহ কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামাঞ্চলে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে নাÑ এ চ্যালেঞ্জই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৭২ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে এবং ৪৩ শতাংশ কৃষি খাতে শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করে, যারা দেশের জিডিপিতে ১৫ শতাংশ অবদান রাখছে। গ্রামীণ অকৃষি খাতের কর্মীর সংখ্যা শতকরা ৪০ শতাংশ, যারা গ্রামীণ আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি আয় করে। কাজেই অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই গ্রামীণ রূপান্তরই দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা দূর করা এবং কাউকে পেছনে ফেলে না রাখার লক্ষ্য অর্জনের মূলশক্তি।
বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ১৬ কোটি মানুষের দেশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের আগেই এটি ভালোভাবে এসডিজি লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রস্তুত। ২০২৪ সালের মধ্যে দারিদ্র নির্মূল হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ক্ষুধামুক্ত উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে অন্যান্য কঠিন চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কারণ ২০৮০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মাত্র ৬৫ সেন্টিমিটার বাড়লেই বাংলাদেশকে তার ৪০ শতাংশ উৎপাদনশীল ভূমি হারাতে হবে।
উপরন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ফসল উৎপাদনে পরিবর্তন দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করবে। কাজেই উন্নত অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন এবং স্থিতিস্থাপক কৃষি পদ্ধতি নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ কাজে লাগাতে হবে। এই জন্যই সরকারের ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় লবণাক্ততা, বন্যা এবং শীতসহিষ্ণু প্রতিরোধী উচ্চফলনশীল ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষিক্ষেত্রে গবেষণায় সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নে এবং অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলোর চিহ্নিতকরণ, যেমন স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি সমস্যার সমাধান, কৃষি কর্মসূচি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসের বিষয়েও জোর দেয়া হয়েছে বলেও ইফাদ সম্মেলনের মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, চলমান গ্রামীণ রূপান্তরকে সমর্থন করার জন্য গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা হবে, যার মাধ্যমে অকৃষিখাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ গতিশীলতা এবং গ্রামীণ অর্থ ব্যবস্থাকে সহযোগিতা করা হবে।
মৎস্যবান্ধব নীতির কারণে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট মাছের উৎপাদন ৪১ দশমিক ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছে গেছে। এটি মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় অবদান রেখেছে। আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ আমাদের পণ্য হিসেবে জিওলজিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন সার্টিফিকেট পেয়েছে। আমরা মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বের চতুর্থ স্থানে রয়েছি। সরকারের দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যের বন্দোবস্ত করার কর্মসূচিও চালু রয়েছে। ২০১৭ সালে প্রায় ৫০ লাখ পরিবারের মাঝে মাসে ৩০ কেজি করে খাবার চাল অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে ৫ মাস ধরে সরবরাহ করা হয়েছে। খাদ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতে সরকার ৭৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। এছাড়াও তাঁর সরকার নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খোলা বাজারে চাল বিক্রিতে ৭৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০১০-১১ অর্থবছরে সরকার একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প চালু করে, যার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক জীবিকা এবং পারিবারিক খামারের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে। মোট ১১ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে এই প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১০ লাখ সুবিধাভোগীকে নিয়ে ১৭ হাজার ৩০০টি গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা গঠন করা হয়েছে; যারা প্রায় ৭ লাখ ছোট ছোট খামার স্থাপন করেছে। তাঁর সরকার জনগণের পুষ্টি সমস্যার সমাধানের সাফল্য অর্জন করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯২ সালে যেখানে বাংলাদেশের জনগণের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ অপুষ্টির শিকার ছিল সেখানে এই হার ২০১৬ সাল নাগাদ ১৬ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অতি দারিদ্র্যের হার যেখানে ২০০৫-০৬ সালে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল সেখান থেকে বর্তমানে তা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এই ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পোপের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে হলি সি-তে (ভ্যাটিক্যান সিটি) বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রী সকাল ১০টায় ভ্যাটিক্যান সিটিতে পৌঁছার পর সেখানে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী ভ্যাটিক্যান সিটিতে পোপের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী পোপের সঙ্গে তাঁর সফরসঙ্গীদের পরিচয় করিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী পোপকে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর একটি পেইন্টিং উপহার দেন। পোপও শেখ হাসিনাকে একটি ক্রেস্ট উপহার দেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের স্যুভেনির উপহার দেন।
শেখ হাসিনা ভ্যাটিক্যান সিটিতে সেক্রেটারি স্টেট অব ভ্যাটিক্যান সিটি কার্ডিনাল পিত্রো পারোলাইনের সঙ্গেও বৈঠক করেন এবং সিস্টিন চ্যাপেল ও সেন্ট পিটারস ব্যাসিলিকা পরিদর্শন করেন। দি সিস্টিন চ্যাপেল ভ্যাটিক্যান সিটিতে ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপের প্রশাসনিক বাসভবন অ্যাপোস্টলিক প্রাসাদের প্রার্থনার জন্য নির্দিষ্ট স্থান।
অন্যদিকে সেন্ট পিটারস ব্যাসিলিকা ভ্যাটিক্যান সিটিতে একটি ইতালীয় রেনেসাঁ গির্জা, যা রেনেসাঁ স্থাপত্যকলার একটি অনন্য নিদর্শন। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গির্জা। রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত স্থাপত্যবিদ দোনাতো ব্রামান্তে, সে সময়কার বিখ্যাত ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী মাইকেল এঞ্জেলো, স্থাপত্যবিদ কার্লো মর্দানো ও জিয়ান লরেঞ্জো বেরনিনি এর নকশা প্রণয়ন করেন। উল্লেখ্য, ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের শীর্ষ ধর্মগুরু পোপ দুই মাস আগে ঢাকা সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার পর এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো। ঢাকার বৈঠকে পোপ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সহিংসতা পরিহার ও রোহিঙ্গাদের মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পোপ ফ্রান্সিস শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে দুই মাস আগে ৩১ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করেন।