প্রতিবেদন

ইতালি সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে ইতালি সফর নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। উল্লেখ্য, সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী তিনটি সুখবর দেন; যার একটি হলো দেশ ফোরজির যুগে প্রবেশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর দ্বিতীয় সুখবরটি বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নির্মাণ এবং উৎক্ষেপণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় সুখবর হচ্ছে ব্রিটেন বাংলাদেশের কার্গো বিমান পরিবহনে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, সেটা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ইফাদ সম্মেলনে যোগ দেয়া উপলক্ষে ইতালি সফর নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক রাজনীতি নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, বিএনপি আসুক বা না আসুক সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে। এখন বহুদলীয় গণতন্ত্রের সময়। কোন দল নির্বাচন করবে কি করবে নাÑ এটা সম্পূর্ণ তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু নির্বাচন সময়মতো হবে। জনগণও ভোট দেবে। ২০১৪ সালে এতো তা-ব করেও যখন নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি, ভবিষ্যতেও ঠেকাতে পারবে না।
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি যদি নির্বাচন না করে তাহলে কারো কিছু করার নেই। গতবারও তারা নির্বাচন করেনি। এবারও যদি কোনো দল না আসে, সেখানে আমাদের কী করার আছে?
খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিলে তার দল নির্বাচনে যাবে না বলে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এক মন্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এটা যদি আপনারা বলেন, আমি শাস্তি দিয়েছি, আমি তুলে নেবো, সেটাতো আমি পারবো না। আদালত তাকে (খালেদা) শাস্তি দিয়েছে। আর মামলা করেছে দুদক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ যদি বলে নির্বাচন করতে দেবো না, এটা গায়ের জোরের কথা, যেটা বিএনপি বলতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বিএনপির জন্ম, রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আত্মপ্রকাশ এবং জিয়াউর
রহমানের পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খানের স্টাইলে ক্ষমতা দখলের ইতিবৃত্ত এবং তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় হ্যাঁ-না ভোটের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বিচারপতি সায়েমকে অস্ত্রের মুখে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে জেনারেল জিয়া প্রেসিডেন্ট হন। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকা-র সঙ্গে জড়িত থাকায় মোশতাক ক্ষমতা নিয়েই জিয়াকে সেনাপ্রধান বানিয়ে দিলেন। জিয়া তার কতটা বিশ্বস্ত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঠিক আইয়ুব খানের মতো একই অঙ্গে দুই রূপ নিয়ে তিনি (জেনারেল জিয়া) ক্ষমতায় এলেন।
প্রধানমন্ত্রীর ইতালি সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও আগামী নির্বাচন, খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলা, পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রোহিঙ্গা সমস্যাগুলো ঘুরে ফিরে আসে। দুর্নীতিবাজদের দলে না নেয়া সংক্রান্ত বিএনপির গঠনতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট ধারাটির পরিবর্তন করে বিদেশে অবস্থানরত দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব প্রদান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে দুর্নীতি নিয়ে একটি পারসেপশন আছে। ব্যক্তি বিশেষের দুর্নীতির ক্ষেত্রে কিছু বলাও হয় না, করাও হয় না। এখানে খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে আদালত রায় দিয়েছে, আমাদের কিছু করার নেই।
শেখ হাসিনা বলেন, আদালতের রায় হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন যাকে করা হলো সে আবার ফেরারি আসামি। সে দেশেও নেই। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন দেশে কি বিএনপির এমন কোনো নেতা নেই যাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা যেতো? যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আর রাজনীতি করবেন না বলেই মুচলেকা দিয়ে নিজের দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। আমেরিকার এফবিআইর তদন্তেও তার দুর্নীতি ধরা পড়েছিল এবং এফবিআইর লোক এ দেশে এসে আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে গেছে। পরে তার ৭ বছরের সাজা ও ২০ কোটি টাকা জরিমানা হয়েছে। তাকেই করতে হলো ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন!
শেখ হাসিনা মামলা নিয়ে বেগম জিয়ার টাল-বাহানার অভিযোগ তুলে খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, মামলার ১০৯ কার্যদিবস তিনি সময় চাইলেন, অসুস্থ বলে অফিসে গিয়ে বসে থাকলেন, ২৬১ দিনের মতো ১০ বছর যাবৎ চলমান মামলায় তারিখ পড়লো, আপিল বিভাগে ২২ বার রিট করেছেন, হাইকোর্টে রিট করেছেন। এতো কিছু করে তিনি মামলা চলাকালীন মাত্র ৪৩ দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এরপরও তার সাজা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই মামলাটি রুজু হওয়ার সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হককে উদ্ধৃত করে বলেন, তিনি বলেছিলেন, ওই পরিমাণ টাকা জমা করে দিলেই মামলাটি প্রত্যাহার হয়ে যাবে। কারণ টাকাটা এসেছিল এতিমদের জন্য। কিন্তু খালেদা জিয়া টাকার মায়া ত্যাগ করতে পারেননি।
তিনি বলেন, আমি বিস্তারিত বলবো না, আপনারা মামলার শুনানিতেই দেখেছেন, সেই টাকা কতভাবে, কত হাত ঘুরে এতিমদের জন্য না গিয়ে ব্যক্তিগত তহবিলে চলে এসেছে। এতিমের টাকা মেরে খেলে এর জন্য শাস্তি আদালতও দেয়, আল্লাহর তরফ থেকেও হয়। কারণ আমাদের পবিত্র কোরআন শরিফেই আছে, এতিমের টাকা মেরে খাওয়া যায় না। কাজেই আমাদের কিচ্ছু করার নেই।
শেখ হাসিনা নিজের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন, ২০০৭ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করার সময় তিনি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করে যান। তিনি তার ছোট বোন শেখ রেহানা বা পুত্র, বা প্রবাসের কাউকেই দলের দায়িত্ব দেননি। অথচ খালেদা জিয়া দেশে বসবাস করে এমন কাউকেই দায়িত্ব দিয়ে যাননি। তিনি এ সময় সাংবাদিকদের বিএনপির নেতাদের কাছে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করার আহ্বান জানান।