কলাম

চার বছরের উন্নয়ন অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ

মোতাহার হোসেন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের চতুর্থ বছর পূর্তি হলো ১২ জানুয়ারি। গত চার বছরকে বর্ণনা করা যায় আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সাফল্যের সময় হিসেবে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত ছিল সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শেখ হাসিনা সরকারের সাহসী ও দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী সিদ্ধান্তের কারণে এটিও আজ আলোর মুখ দেখছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে শেখ হাসিনার উদ্যোগে বাংলাদেশের মানবিক অবস্থান দেখেছে সারাবিশ্ব। সরকারের এই মেয়াদে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ।
কঠিন এবং বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতার চার বছর পূর্ণ করল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় এবং ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। সরকারের ধারাবাহিক দ্বিতীয় মেয়াদের এই সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন দেশের ভেতর-বাইরে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ পাওয়া বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিজ দেশের নাগরিক ছাড়াও বাস্তুচ্যুত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার আশ্রয়, খাদ্য, বস্ত্র এবং সুচিকিৎসার দায়িত্ব নিতে পারে বাংলাদেশ। বিশ্লেষকদের মতে, এ সবকিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ৯ বছরে দেশ অবকাঠামো এবং আর্থসামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্রে আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে। এ সময় মাথাপিছু আয়, রিজার্ভ, রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন সূচকে উন্নতি হয়েছে, মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহতভাবে এগিয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫.৫৭ থেকে ৭.২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় ৮৪৩ থেকে ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার, বিনিয়োগ ২৬.২৫ শতাংশ থেকে ৩০.২৭ শতাংশ, রপ্তানি ১৬.২৩ থেকে ৩৪.৮৫ বিলিয়ন ডলার, রেমিট্যান্স ১০.৯৯ থেকে ১২.৭৭ বিলিয়ন ডলার, রিজার্ভ ১০.৭৫ থেকে ৩৩.৪১ বিলিয়ন ডলার এবং এডিপি ২৮৫ বিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১০৭ বিলিয়ন টাকা।
দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তির কারণে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মার ওপর ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করার সাহস দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর বিশাল এ প্রকল্প হাতে নেয়ার ঘটনায় অনেক দেশ ও সংস্থা সন্দেহ ও বিস্ময় প্রকাশ করলেও সে স্বপ্ন এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। এ ছাড়া মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সেপ্রেসওয়েসহ আরও বেশকিছু বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। ফেনী জেলার মহিপালে দেশের প্রথম ৬ লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন হয়েছে।
১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও চলমান। রয়েছে মহাকাশ জয়ের লক্ষ্যও। দেশের প্রথম স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু-১’ আগামী ২৬ মার্চ মহাকাশে উৎক্ষেপণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ উপগ্রহ সফলভাবে মহাকাশে স্থাপিত হলে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হবে বাংলাদেশ। বছরে সাশ্রয় হবে ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কূটনৈতিক সাফল্যেও পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। কোনোরকম যুদ্ধ-সংঘাত বা বৈরিতা ছাড়াই দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্র বিজয় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল এলাকায় একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপান এলাকার প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া স্বাধীনতার পরপর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে স্থল সীমান্ত চুক্তি হয়েছিল তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করাও বাংলাদেশের বড় অর্জন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতেও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশ ও সংস্থা এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করে আমাদের পাশে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধি। মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক খালিজ টাইমস রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে ‘নিউ স্টার অব দ্য ইস্ট’ বা ‘পূর্বের নতুন তারকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
বৈশ্বিক রাজনীতি বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস’ বিশ্বের ৫ জন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানকে চিহ্নিত করেছে, যাদের দুর্নীতি স্পর্শ করেনি; বিদেশে কোনো ব্যাংক একাউন্ট নেই এবং উল্লেখ করার মতো কোনো সম্পদও নেই। বিশ্বের সবচেয়ে সৎ এই ৫ জন সরকার প্রধানের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের প্রভাবশালী ১০ নারী নেত্রীর একজন মনোনীত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে নানা পুরস্কারে ভূষিত করা হয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে। ২০১৪ সালে ইউনেস্কো তাকে ‘শান্তিবৃক্ষ’ ও ২০১৫ সালে ওমেন ইন পার্লামেন্টস গ্লোবাল ফোরাম নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাকে রিজিওনাল লিডারশিপ পুরস্কার এবং গ্লোবাল সাউথ সাউথ ডেভেলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কারে ভূষিত করে। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে অব্যাহত সমর্থন, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদানের জন্য আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৫ সালে তাকে সম্মাননা সনদ প্রদান করে। জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ-২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করে।
এ সরকারের মেয়াদকালে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার কাজে সফলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এই বিচার স্বাধীন বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় সাফল্য।
গত চার বছরে অনেক সফলতা এলেও এ যাত্রা মসৃণ ছিল না। এ সময়ে পিছু ছাড়েনি ষড়যন্ত্র। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার পরেও নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে জঙ্গিবাদ। তবে সব ষড়যন্ত্র আর চ্যালেঞ্জ প্রজ্ঞার সঙ্গে মোকাবিলা করেই পথ চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বছরপূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের উন্নয়নের সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন।
এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা। যে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট